বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ: স্বায়ত্তশাসন ও পেশাদারিত্বের সংকট
তনয় কুমার সাহা: ২০১০ সালের ১২ নং আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ (আইডিআরএ) গঠিত হয়েছিল একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে- বীমা শিল্পের টেকসই ও সুশৃঙ্খল বিকাশ নিশ্চিত করা, গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করা এবং একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। এই আইনের ধারা ১০-এ কর্তৃপক্ষের কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য ‘প্রয়োজনীয় সংখ্যক’ কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি তার নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ক্রমশ প্রেষণ-নির্ভর এক আমলাতান্ত্রিক দপ্তরে পরিণত হচ্ছে।
১. বিশেষজ্ঞতাহীন নেতৃত্ব:
বীমা একটি অত্যন্ত প্রযুক্তিগত (টেকনিক্যাল) এবং গাণিতিক খাত। এখানে ঝুঁকি মূল্যায়ন, একচ্যুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন এবং রি-ইন্স্যুরেন্সের মতো বিষয়গুলো বুঝতে গভীর বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন। অথচ কর্তৃপক্ষের উচ্চপদগুলোতে (নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালক) যারা প্রেষণে আসছেন, তাদের সিংহভাগেরই বীমা বিষয়ে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা কারিগরি জ্ঞান নেই। একজন বিশেষজ্ঞহীন ব্যক্তি যখন নীতিনির্ধারণী পদে বসেন, তখন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় এবং বীমা কোম্পানি গুলোকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা বা বীমা শিল্পে কোন কোন জায়গায় উন্নয়নের প্রয়োজন তা উপলব্ধি করাটা কঠিন হয়ে পরে ।
২. 'অতিথি' কর্মকর্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা
২০২১ সালের প্রবিধানমালা অনুযায়ী উচ্চপদগুলোতে ৫০% প্রেষণে নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। এই কর্মকর্তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্তৃপক্ষে আসেন এবং কাজ শেখার আগেই আবার বদলি হয়ে চলে যান। এর ফলে কয়েকটি মৌলিক সংকট তৈরি হচ্ছে:
• মালিকানা বোধের অভাব: তারা প্রতিষ্ঠানকে নিজের মনে করার সময় পান না।
• সম্পদের অপচয়: কর্তৃপক্ষের ফান্ড থেকে মোটা অংকের বেতন, দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার পর তারা যখন চলে যান, তখন সেই অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে আসে না।
• প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি বিলুপ্তি: স্থায়ী জনবল না থাকায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
৩. স্বায়ত্তশাসনের অন্তরায়
আইডিআরএ-কে একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সরকারের যুগ্মসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রেষণে পদায়নের ফলে এর চরিত্রটি আগের সেই 'বীমা অধিদপ্তর'-এর মতো আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতেই আটকে আছে। এতে সংস্থার স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং গতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি উপ-পরিচালক পদে প্রেষণের বিধান না থাকলেও সেখানে প্রেষণে নিয়োগের নজির দেখা যাচ্ছে, যা সরাসরি প্রবিধানের পরিপন্থী।
উত্তরণের পথ: যা করা জরুরি
বীমা শিল্পকে বাঁচাতে এবং গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে নিচের পরিবর্তনগুলো এখন সময়ের দাবি:
• প্রবিধান সংশোধন: উচ্চপদে প্রেষণের কোটা দ্রুত কমিয়ে নিজস্ব কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নিজস্ব ক্যাডার সার্ভিস শক্তিশালী হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়বদ্ধতা তৈরি হবে।
• অভিজ্ঞতার শর্ত আরোপ: উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম ১০-১৫ বছরের অভিজ্ঞতা বা বিশেষায়িত ডিগ্রি (যেমন: এসিআইআই, এফসিআইআই) বাধ্যতামূলক করতে হবে। বীমা জ্ঞানহীন ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রক পদে বসানোর চর্চা বন্ধ করতে হবে।
• ল্যাটারাল এন্ট্রি ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগ: যদি প্রেষণে নিতেই হয়, তবে সাধারণ প্রশাসনের পরিবর্তে বীমা বিশেষজ্ঞ, চার্টার্ড ইন্স্যুরেন্সার বা একচ্যুয়ারিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
• বন্ড ব্যবস্থা: কর্তৃপক্ষের অর্থে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের জন্য অন্তত ৫ বছর ওই সংস্থায় সেবা প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে।
২০১০ সালের আইনের মূল চেতনা ছিল একটি 'একনিষ্ঠ' ও 'পেশাদার' জনবল কাঠামো। প্রেষণ-সংস্কৃতি এবং অভিজ্ঞতা বর্জিত নেতৃত্ব এই আইনের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দিচ্ছে। বীমা শিল্পকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে হলে আইডিআরএ-কে 'অতিথি কর্মকর্তাদের' বিচরণ ক্ষেত্র থেকে বের করে একটি বিশেষজ্ঞ-নির্ভর শক্তিশালী সংস্থায় রূপান্তর করার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট



