মাইনুল হক মিজি: বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রায় নন-লাইফ বীমা শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে বীমা খাতের সম্পর্ক নিবিড়। অথচ যথাযথ নীতিমালা, কার্যকর তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে এ খাতের বিপুল সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করলে দেশের নন-লাইফ বীমা শিল্পে প্রিমিয়াম আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
১) ব্যাংকের বন্ধকী সম্পত্তির বীমা নিশ্চিতকরণ:
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পত্তির উপযুক্ত বীমা কভারেজ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অগ্নিকাণ্ড, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ প্রাসঙ্গিক ঝুঁকির বিপরীতে পর্যাপ্ত বীমা থাকলে ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতা উভয় পক্ষের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়বে। এ ক্ষেত্রে সম্পত্তির প্রকৃতি, ঝুঁকি এবং ঋণের শর্ত অনুযায়ী কার্যকর বীমাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইডিআরএ সমন্বিত নির্দেশনা প্রণয়ন করতে পারে।
২) মোটর বীমা কার্যকরভাবে বাধ্যতামূলক করা:
সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের জীবন, যানবাহন ও সম্পত্তির ক্ষতি দেশের জন্য একটি বড় আর্থিক ঝুঁকি। উপযুক্ত মোটর বীমা, বিশেষ করে তৃতীয় পক্ষের দায়বদ্ধতা বীমা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মোটর বীমার কার্যকর বাস্তবায়ন, তদারকি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হলে বীমা সুরক্ষার আওতা সম্প্রসারিত হবে।
৩) আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বীমার ব্যবহার বৃদ্ধি:
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণের সঙ্গে মেরিন কার্গো বীমার গুরুত্বও বাড়ছে। আমদানি-রপ্তানির সময় পণ্য পরিবহনে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, চুরি এবং অন্যান্য বীমাযোগ্য ঝুঁকি থেকে আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় উপযুক্ত বীমা কভারেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযোজ্য আইন, ঋণপত্রের শর্ত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রীতিনীতি যথাযথভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের বীমা শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী হবে।
৪) Liability Insurance বাংলাদেশের নন-লাইফ বীমা শিল্পের এক বিশাল সম্ভাবনা:
বাংলাদেশে Liability Insurance বা দায়বদ্ধতা বীমার প্রচলন ও ব্যবহার এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় বিস্তৃত নয়। অথচ আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যে তৃতীয় পক্ষের ক্ষতি, পেশাগত ভুল, পণ্যজনিত দায়, কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন ধরনের আইনগত দায় থেকে আর্থিক সুরক্ষা পেতে এই বীমার গুরুত্ব অপরিসীম।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের Liability Insurance ব্যবসা ও পেশাগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব দেশে পণ্যের নিরাপত্তা, পেশাগত দায়বদ্ধতা, জনসাধারণের কাছে দায় এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনগত ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের দায়বদ্ধতা বীমা ব্যবহৃত হয়। এ বাজারের ব্যাপ্তি বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয়।
বাংলাদেশে Public Liability Insurance, Product Liability Insurance, Professional Indemnity Insurance, Directors and Officers (D&O) Liability Insurance, Commercial General Liability Insurance Employers’ Liability আরও অনেক ধরনের Liability Insurance Coverage -সংশ্লিষ্ট উপযুক্ত বীমা কভারেজের বাজার আরও বিকশিত করার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা, রপ্তানিকারক, পেশাজীবী এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী এসব পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্যের কারণে তৃতীয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে Product Liability Insurance প্রযোজ্য শর্ত অনুযায়ী আর্থিক সুরক্ষা দিতে পারে।
কোনো পেশাজীবীর পেশাগত ভুল বা অবহেলার অভিযোগ থেকে উদ্ভূত দায়ের ক্ষেত্রে Professional Indemnity Insurance গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কারণে তৃতীয় পক্ষের শারীরিক আঘাত বা সম্পত্তির ক্ষতির জন্য Public Liability Insurance প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
এই বীমাগুলোর প্রসারে বীমা কোম্পানিগুলোর পণ্য উন্নয়ন, দক্ষ আন্ডাররাইটার তৈরি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, পুনর্বীমা সুবিধা এবং গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতের আইনগত দায়, চুক্তির শর্ত এবং কভারেজের সীমা বিবেচনা করে উপযুক্ত বীমা পণ্য তৈরি করতে হবে। Liability Insurance-এর বাজার সম্প্রসারিত হলে নন-লাইফ বীমা শিল্পে নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকরভাবে আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অংশ নিতে পারবে।
বীমা শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি:
বন্ধকী সম্পত্তির বীমা, মোটর বীমা, মেরিন কার্গো বীমা এবং বিভিন্ন ধরনের Liability Insurance-এর ব্যবহার বাড়লে নন-লাইফ বীমা শিল্পের প্রিমিয়াম আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ সুরক্ষা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।
পাশাপাশি, প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী ভ্যাট, স্ট্যাম্প ডিউটি, করপোরেট কর এবং অন্যান্য সরকারি রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিও সম্প্রসারিত হতে পারে। তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি পেলে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। তবে এসব সুফল নির্ভর করবে বীমা কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মুনাফা, দাবি নিষ্পত্তি, পরিচালন ব্যয়, কর কাঠামো এবং প্রযোজ্য আইনগত বিধানের ওপর।
এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ:
নন-লাইফ বীমা শিল্পের সম্ভাবনা বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইডিআরএ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। এর আওতায় ব্যাংকের বন্ধকী সম্পত্তির বীমা, মোটর বীমার কার্যকর বাস্তবায়ন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে উপযুক্ত বীমা কভারেজ এবং Liability Insurance-এর বাজার সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
একই সঙ্গে বীমা দাবি দ্রুত ও ন্যায্যভাবে নিষ্পত্তি, সুশাসন, স্বচ্ছ আন্ডাররাইটিং, গ্রাহকসেবা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, বীমা শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু প্রিমিয়াম আয় বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; গ্রাহকের আস্থা অর্জন এবং প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ যথাযথভাবে প্রদান করাও এর অন্যতম প্রধান শর্ত।
বাংলাদেশের নন-লাইফ বীমা শিল্পকে অবহেলিত সম্ভাবনা থেকে অর্থনীতির একটি শক্তিশালী সহায়ক খাতে পরিণত করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সঠিক নীতিমালা, সমন্বিত তদারকি এবং Liability Insurance-সহ আধুনিক বীমা পণ্যের সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে এ খাত দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুরক্ষায় অধিকতর অবদান রাখার পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।
লেখক: মাইনুল হক মিজি, এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স পিএলসি।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।