এ কে এম এহসানুল হক, এফসিআইআই: প্রিমিয়াম আয় বাড়লেও বাংলাদেশে বীমা খাত এখনো গ্রাহকের কাঙ্ক্ষিত আস্থা অর্জন করতে পারেনি। দাবি পরিশোধে দেরি, কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং তদারকির সীমাবদ্ধতায় বাড়ছে খাতটির ঝুঁকি।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যা শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বীমা খাতের নিয়ম মেনে চলা, কোম্পানি পরিচালনা এবং গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে।
বাংলাদেশের বীমা খাত আন্তর্জাতিক তুলনায় এখনো ছোট। আন্তর্জাতিক বীমা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সুইস রি-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় বীমা প্রিমিয়ামের হার প্রায় ০.৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতির তুলনায় বীমা ব্যবসার আকার এখনো ছোট। আন্তর্জাতিকভাবে বীমা প্রিমিয়ামের এই হার প্রায় ৭ শতাংশের বেশি। বীমা সম্পর্কে মানুষের সীমিত ধারণা, কম ধরনের পলিসি এবং কোম্পানির সেবার মান নিয়ে আস্থার ঘাটতি এর অন্যতম কারণ।
বীমা খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো দাবি পরিশোধ। মানুষ ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দেন। কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে দ্রুত টাকা না পেলে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। দাবি যাচাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, কোম্পানির আর্থিক সমস্যা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে দাবি পরিশোধে দেরির অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসের তথ্য অনুযায়ী, বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ৯ হাজার ৬২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ দাবি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। তবে সব কোম্পানির পরিস্থিতি এক নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক ভালোভাবে দাবি পরিশোধ করলেও কিছু প্রতিষ্ঠানের সেবা ও দাবি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ রয়েছে।
একটি বীমা কোম্পানি ভবিষ্যতে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে পারবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করে তার আর্থিক অবস্থার ওপর। কোম্পানির হাতে পর্যাপ্ত অর্থ আছে কি না, বিনিয়োগ সঠিকভাবে হচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যতের দাবি পরিশোধের সক্ষমতা আছে কি না, এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে লাইফ বীমার মতো দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায় অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো কোম্পানি কতটা আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে, তা বোঝার জন্য মূলধনের পরিমাণ, বিনিয়োগের মান এবং ভবিষ্যতে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের সক্ষমতা দেখা হয়। কোম্পানির হাতে থাকা সম্পদ ও ভবিষ্যৎ দায়ের মধ্যে ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে ভবিষ্যতে গ্রাহকের টাকা পরিশোধে চাপ তৈরি হতে পারে।
বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। প্রতিষ্ঠানটির কাজ হলো কোম্পানিগুলো নিয়ম মেনে চলছে কি না তা দেখা, তাদের আর্থিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করা।
তবে খাত সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, কোনো কোম্পানিতে বড় সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা তা শনাক্ত করতে পারছে কি না। নিয়ম ভঙ্গের পর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেই চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
বীমা খাতে আস্থার সংকটের আরেকটি কারণ হলো পলিসি বিক্রির সময় পর্যাপ্ত তথ্য না দেয়া। অনেক গ্রাহক পলিসির শর্ত, সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি না বুঝেই সিদ্ধান্ত নেন। পরে পলিসির সুবিধা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলে কোম্পানি ও গ্রাহকের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।
বীমা আইন ২০১০ অনুযায়ী, কোম্পানিগুলোকে নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা, আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। পলিসি বিক্রির সময় গ্রাহককে সঠিক ও পরিষ্কার তথ্য দেয়া কোম্পানির দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা খাতের উন্নয়নে শুধু নতুন নিয়ম তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত চিহ্নিত করা, দাবি পরিশোধের মান বাড়ানো এবং তদারকি ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বীমা খাতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে শুধু প্রিমিয়াম আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিলে হবে না; গ্রাহকসেবা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কার্যকর তদারকি, দায়িত্বশীল কোম্পানি ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত দাবি পরিশোধের মাধ্যমেই বীমা খাত মানুষের নির্ভরযোগ্য আর্থিক সুরক্ষার মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।