বাংলাদেশে এখনো অপরিচিত অপহরণ ও মুক্তিপণ বীমা

প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২১ পিএম

রাজ কিরণ দাস: বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে কাজ করা বড় কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য অপহরণ ও মুক্তিপণ বীমা গ্রহণ করে। তবে বাংলাদেশে এখনো এই ধরনের বীমা সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত নয়। আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বড় প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি মোকাবিলায় এর ব্যবহার থাকলেও দেশের বীমা খাতে এর পরিধি সীমিত।

অপহরণ বা জিম্মি পরিস্থিতিতে শুধু অর্থের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় দ্রুত সিদ্ধান্ত, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং নিরাপদ উদ্ধারের ব্যবস্থা। অপহরণের পর অনেক সময় অপহরণকারীরা টাকা দাবি করে, যাকে মুক্তিপণ বলা হয়। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয় অপহরণ ও মুক্তিপণ বীমা। এর আওতায় অপহরণ, জোরপূর্বক আটক, উদ্ধার কার্যক্রম এবং সংকট মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত খরচের সুরক্ষা দেয়া হয়।

তবে এই বীমা প্রচলিত লাইফ বা সম্পদ বীমার মতো নয়। এখানে শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় না। এর সঙ্গে থাকে বিশেষজ্ঞ সংকট মোকাবিলা দলের সহায়তা, অপহরণকারীদের সঙ্গে আলোচনা, আইনি সহযোগিতা, চিকিৎসা সহায়তা এবং উদ্ধারের পরিকল্পনা। এ কারণে এই বীমাকে শুধু অর্থের সুরক্ষা নয়, বরং বড় ঝুঁকির সময়ে সংকট মোকাবিলার একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়।

বিশ্বের যেসব অঞ্চলে অপহরণের ঝুঁকি বেশি, সেখানে এই বীমার ব্যবহারও বেশি। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং সংঘাতপ্রবণ কিছু এশীয় অঞ্চলে কাজ করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের নিরাপত্তায় এই বীমা গ্রহণ করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাস, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার বিস্তারের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ৫০০টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা হিসেবে পরিচিত ফরচুন ৫০০-এর অনেক প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করা কর্মীদের জন্য এই সুরক্ষা নেয়।

এই বীমার খরচ বা প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয় ঝুঁকি বিবেচনা করে। কোন দেশে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে, অপহরণের সম্ভাবনা কতটা, কর্মীর সংখ্যা, যাতায়াতের ধরন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন- এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে বীমা কোম্পানি প্রিমিয়াম ঠিক করে। ঝুঁকি যত বেশি হয়, প্রিমিয়ামের পরিমাণও তত বাড়ে।

অপহরণের ঘটনা ঘটলে বীমা কোম্পানি সাধারণত সরাসরি মুক্তিপণের অর্থ প্রদান করে না। বরং তারা বিশেষজ্ঞ দল যুক্ত করে, যারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিরাপদ উদ্ধারে সহায়তা করে। এই বিশেষজ্ঞ সহায়তাই অপহরণ ও মুক্তিপণ বীমাকে সাধারণ বীমা পণ্য থেকে আলাদা করে।

বাংলাদেশেও অপহরণ একটি আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ১ হাজার ১০১টি অপহরণ মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৪২টি। এক বছরের ব্যবধানে নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ।

তবে এসব তথ্য থানায় দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা। শিশু, নারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী বা পেশাভিত্তিক ভুক্তভোগীর আলাদা পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয় না। ফলে অপহরণের প্রকৃত ঝুঁকির চিত্র নির্ধারণে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে শিশু, নারী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অপহরণের ঘটনা সামনে এসেছে। তবে অপহরণ ও মুক্তিপণ বীমা সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি কোনো সাধারণ বীমা পণ্য নয়। এটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে এই বীমা সাধারণ গ্রাহকের জন্য স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কোনো পণ্য নয়। দেশের অধিকাংশ বীমা কোম্পানি এই ধরনের পলিসি নিয়মিতভাবে বাজারজাত করে না। তবে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা বহুজাতিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় তাদের মূল প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক বীমা ব্যবস্থার আওতায় এই সুরক্ষা পেয়ে থাকে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষায়িত বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এই ধরনের সুরক্ষা দেয়া হয়। এএক্সএ এক্সএল, এআইজি এবং লয়েডসের মতো আন্তর্জাতিক বীমা প্রতিষ্ঠান অপহরণ, মুক্তিপণ, জিম্মি পরিস্থিতি এবং সংকট ব্যবস্থাপনার মতো ঝুঁকির জন্য বীমা কাভারেজ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত আন্তর্জাতিক বীমা মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান (ব্রোকার) বা তাদের বৈশ্বিক বীমা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সুবিধা পায়।

বাংলাদেশে এই বীমার চাহিদা কম থাকার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বীমা সম্পর্কে ধারণা সীমিত। পাশাপাশি স্থানীয় বীমা কোম্পানিগুলোর এই ধরনের আন্তর্জাতিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও এখনো সীমিত। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞ সহায়তা, বড় ঝুঁকি সামলাতে আন্তর্জাতিক বীমা সহযোগিতা এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণের প্রয়োজন হওয়ায় এই পণ্যের জন্য আলাদা সক্ষমতা প্রয়োজন।

আরেকটি বিষয় হলো, সাধারণ গ্রাহক ও অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো অপহরণকে বীমার আওতায় আনার মতো ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে না। ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ক্ষেত্রে এই ধরনের বীমার খরচ এবং প্রয়োজনীয়তাও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বাংলাদেশে এখনো এই বীমার ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়নি।

তবে দেশের আন্তর্জাতিক ব্যবসা, বিদেশি বিনিয়োগ ও বহুজাতিক কার্যক্রম বাড়লে ভবিষ্যতে বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই বীমার প্রয়োজনীয়তাও বাড়তে পারে।

এই বীমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গোপনীয়তা। কারণ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এমন বীমা রয়েছে- এই তথ্য প্রকাশ হলে তারা অপরাধীদের সম্ভাব্য লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। তাই অপহরণ ও মুক্তিপণ বীমা আতঙ্ক তৈরির কোনো পণ্য নয়; বরং বড় ঝুঁকির সময়ে নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা এবং পেশাদার সহায়তা পাওয়ার একটি ব্যবস্থা।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।