রাজ কিরণ দাস: বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা কাজের জন্য দেশের বাইরে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু কেউ বিদেশে দুর্ঘটনায় পড়লে বা হঠাৎ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ কে বহন করবে? আবার দেশে থাকা পরিবারের জন্য নেয়া বীমা কি তখনও কার্যকর থাকবে?
এমন প্রশ্ন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ মানুষের চলাচলের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে বীমার চাহিদাও। এখন অনেকেই এমন পলিসি চান, যা শুধু নিজের দেশে নয়, বিদেশেও কার্যকর হবে।
এই পরিবর্তন শুধু গ্রাহকের চাহিদাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বদলে যাচ্ছে পুরো বীমা শিল্পের ব্যবসায়িক ধরনও। একসময় একটি দেশের বীমা কোম্পানি মূলত সেই দেশের গ্রাহকদেরই সেবা দিত। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান একাধিক দেশে ব্যবসা করছে, আর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও করছে বৈশ্বিক পরিসরে।
এর পেছনে রয়েছে বিশ্বায়নের প্রভাব। মানুষ, পুঁজি, প্রযুক্তি ও ব্যবসা যখন আগের চেয়ে অনেক সহজে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাচ্ছে, তখন বীমা শিল্পও আর একটি দেশের সীমানায় আটকে থাকছে না। মুক্তবাজার অর্থনীতি, বাণিজ্য উদারীকরণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার এই পরিবর্তনকে আরও গতি দিয়েছে।
এর প্রভাব বৈশ্বিক বীমা খাতেও স্পষ্ট। ২০২৪ সালে বিশ্বের বীমা শিল্পের মোট প্রিমিয়াম আয় প্রায় ৭.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ এসেছে লাইফ বীমা থেকে এবং ৫৭ শতাংশ এসেছে নন-লাইফ ও স্বাস্থ্যবীমা খাত থেকে। অর্থাৎ, বীমা এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর্থিক খাতগুলোর একটি। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছরগুলোতে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ আসবে এশিয়ার বীমা খাত থেকে।
তবে পরিবর্তন শুধু ব্যবসার পরিধি বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বদলে গেছে গ্রাহকের প্রত্যাশাও। এখন তারা দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, মোবাইল ফোনেই পলিসি পরিচালনা, বিদেশে ব্যবহারযোগ্য কভারেজ এবং সহজ ডিজিটাল সেবা চান।
এই চাহিদা পূরণে বীমা কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ব্লকচেইন, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় ক্লেইম প্রসেসিংয়ের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। এতে শুধু সেবার গতি বাড়ছে না, জালিয়াতি শনাক্ত করাও সহজ হচ্ছে।
তবে বিশ্বায়নের এই পরিবর্তনের সঙ্গে এসেছে নতুন প্রতিযোগিতাও। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিতে স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে প্রযুক্তি, তথ্য নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে বড় বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের আলাদা নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও আইন মেনে চলার কারণে পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য এই চাপ আরও বেশি।
অন্যদিকে ঝুঁকির ধরনও বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগই ছিল প্রধান উদ্বেগ, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবার হামলা, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নের মতো সীমান্ত-অতিক্রমী ঝুঁকি। ফলে সাইবার ইন্স্যুরেন্স, জলবায়ু-ঝুঁকি বীমা, প্যারামেট্রিক ইন্স্যুরেন্স এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যবীমার মতো নতুন পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। দেশে ধীরে ধীরে ডিজিটাল বীমা সেবার পরিধি বাড়ছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তথ্য নিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বায়ন বীমা শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনা, নতুন গ্রাহক এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এনেছে নতুন প্রতিযোগিতা ও নতুন ধরনের ঝুঁকি। ফলে আগামী দিনের লড়াই শুধু কোন প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বড়, তা নিয়ে হবে না; বরং কে সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের সাফল্য।
কয়েক বছর আগেও বীমা মানেই ছিল একটি কাগুজে পলিসি। এখন সেটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে বৈশ্বিক ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বায়নের এই বাস্তবতায় প্রশ্ন আর বীমা প্রয়োজন কি না- সেটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো, আগামী দিনের নতুন ঝুঁকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বীমা শিল্প কত দ্রুত নিজেকে বদলে নিতে পারবে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।