বীমা প্রতারণার নতুন ঝুঁকি ডিপফেক

প্রকাশিত: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: বীমা খাতে প্রতারণার নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে ডিপফেক প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও ও নথি এখন এতটাই বাস্তব মনে হতে পারে যে আসল ও নকলের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য গ্রাহকের দেয়া তথ্য যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।

ডিপফেক হলো এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বাস্তবের মতো দেখতে ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও বা তথ্য তৈরি করা যায়। একইভাবে আসল ছবি, ভিডিও বা তথ্যের মধ্যেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বীমা খাতে ডিপফেকের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে ক্ষতিপূরণ দাবির ক্ষেত্রে। প্রতারকরা দুর্ঘটনার ভুয়া ছবি, সাজানো ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ, পরিবর্তিত পরিচয়পত্র, নকল চিকিৎসা প্রতিবেদন বা তৈরি করা ভিডিও ব্যবহার করে বীমার অর্থ নেয়ার চেষ্টা করতে পারে।

বর্তমানে বীমা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। গ্রাহকের তথ্য বিশ্লেষণ, পলিসি অনুমোদন, ঝুঁকি যাচাই, ক্ষতিপূরণের আবেদন পরীক্ষা, গ্রাহকসেবা এবং প্রতারণা শনাক্ত করতে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।

ইউরোপীয় বীমা ও পেনশন কর্তৃপক্ষের (ইআইওপিএ) ২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, ইউরোপের ৬৫ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আরও ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আগামী তিন বছরের মধ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া, খরচ কমানো এবং গ্রাহকদের দ্রুত ও উন্নত সেবা দেয়ার জন্য এআই ব্যবহার করছে। তবে এআইয়ের একটি সীমাবদ্ধতা হলো, এটি সব সময় কোনো তথ্য আসল নাকি ভুয়া তা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে না।

কারণ এআই সাধারণত আগের তথ্য ও কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল খুঁজে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কোনো ছবি সত্যিই দুর্ঘটনার সময় তোলা হয়েছে কি না, কোনো নথি আসল কি না বা কোনো ভিডিও পরিবর্তন করা হয়েছে কি না- এসব বিষয় আলাদা যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া কঠিন।

এই কারণে অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান এখন এআইয়ের পাশাপাশি মানুষের যাচাই ব্যবস্থাও ব্যবহার করছে। সাধারণ দাবির ক্ষেত্রে এআই দ্রুত কাজ করতে পারলেও বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি, সন্দেহজনক নথি বা জটিল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ থাকছে।

বিশ্বজুড়ে বীমা প্রতারণার কারণে প্রতিবছর বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বীমা প্রতারণা প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা কোয়ালিশন এগেইনস্ট ইন্স্যুরেন্স ফ্রড-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতিবছর প্রায় ৩০৮.৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। একই সঙ্গে এআই ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও ও নথির অপব্যবহার প্রতারণার নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

ডিপফেক ব্যবহার করে বীমা প্রতারণার সঠিক সংখ্যা জানা কঠিন, কারণ অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্প বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া দুর্ঘটনার ছবি, পরিবর্তিত নথি ও কৃত্রিম পরিচয় তৈরি করে প্রতারণার চেষ্টা বাড়ছে। বিশেষ করে গাড়ির বীমায় এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।

ডিপফেক শনাক্ত করতে বর্তমানে তথ্যের উৎস যাচাই, পরিবর্তিত ছবি বা নথি শনাক্ত করার প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো ছবি বা ভিডিও কোথা থেকে এসেছে এবং পরে এতে কোনো পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়।

ডিপফেক ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এআই ব্যবহারে নতুন নিয়ম তৈরি করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এআই আইন চালু করেছে, যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবস্থার জন্য বাড়তি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুর ও জাপানও এআই ব্যবহারে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও গ্রাহক সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশের বীমা খাতেও ধীরে ধীরে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। অনলাইন পলিসি ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল গ্রাহকসেবা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে দাবি যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু হলেও এআই ব্যবহার করে ডিপফেক শনাক্ত করার ব্যবস্থা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

দেশের বেশিরভাগ বীমা প্রতিষ্ঠানে এখনো উন্নত এআইভিত্তিক তথ্য যাচাই ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে চালু হয়নি। তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বীমা খাত আরও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিপফেক প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তাই বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উন্নত তথ্য যাচাই প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং মানুষের যাচাই ও তদারকি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

আগামী দিনের বীমা খাতে শুধু দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি করাই যথেষ্ট হবে না। বরং আসল ও ভুয়া তথ্য সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারাই হবে বীমা শিল্পের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।