মাউন্ট এভারেস্টে উঠলেই কি মেলে বীমা সুরক্ষা!

রাজ কিরণ দাস: পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই পর্বত শুধু বরফ, পাথর আর মেঘের রাজ্য নয়; এটি স্বপ্ন, সাহস, মৃত্যু এবং বিপুল আর্থিক ঝুঁকিরও আরেক নাম।

প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন নিয়ে নেপালে আসেন। কেউ নিজের সীমা অতিক্রম করতে চান, কেউ গড়তে চান নতুন রেকর্ড, আবার কারও কাছে এটি জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। কিন্তু এই স্বপ্নের পথে প্রতিটি পদক্ষেপেই লুকিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা। কেউ চূড়ায় পৌঁছে ইতিহাস লেখেন, কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে মাঝপথে ফিরে আসেন, আবার কেউ প্রাণ হারান।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের এভারেস্ট মৌসুমেই প্রায় ৫০০ বিদেশি পর্বতারোহী পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণের অনুমতি পেয়েছেন। গত মে মাসে একদিনেই নেপাল রুট দিয়ে রেকর্ড ২৭৪ জন পর্বতারোহী এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছেন। তবে এই সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। এভারেস্টে আরোহণ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩৪০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এভারেস্টের সবচেয়ে বড় শত্রু শুধু তুষারধস নয়। ৮ হাজার মিটারের ওপরে শুরু হয় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ‘ডেথ জোন’। সেখানে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ এত কম যে মানবদেহের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা দ্রুত কমতে শুরু করে। উচ্চতাজনিত অসুস্থতা, হাইপোক্সিয়া, মস্তিষ্কে পানি জমা, ফুসফুসে পানি জমা, ফ্রস্টবাইট, হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা একটি ছোট ভুল পদক্ষেপও কয়েক মিনিটের মধ্যে জীবন-মৃত্যুর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

এখানেই সামনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: এভারেস্টে ওঠা কি শুধু শারীরিক ঝুঁকির পরীক্ষা, নাকি এটি আর্থিক ঝুঁকিরও পরীক্ষা?

উত্তর হলো, দুই-ই।

এভারেস্ট অভিযানে অংশ নেয়া অধিকাংশ পর্বতারোহী কোনো না কোনো ধরনের বীমা নিয়ে থাকেন। তবে সবার বীমা এক নয়, কভারেজও এক নয়। নেপালের আইন অনুযায়ী, এভারেস্ট অভিযানে যুক্ত স্থানীয় শেরপা ও উচ্চতাপর্বত কর্মীদের জন্য দুর্ঘটনা বীমা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে তাদের জন্য ন্যূনতম ২০ লাখ নেপালি রুপির বীমা কভারেজ নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিদেশি পর্বতারোহীদের জন্য সব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বীমা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক না হলেও বাস্তবে এটি প্রায় অপরিহার্য। কারণ সাধারণ ভ্রমণ বীমা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এভারেস্টের মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের জন্য কার্যকর নয়। এ কারণে অনেক অভিযান আয়োজক প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত বীমা ছাড়া আরোহীদের গ্রহণ করে না। ফলে অধিকাংশ অভিযাত্রীকে এ ধরনের পর্বতারোহণের জন্য বিশেষায়িত বীমা নিতে হয়।

এই বিশেষায়িত বীমা সাধারণত দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু, স্থায়ী অক্ষমতা, জরুরি চিকিৎসা, আহত ব্যক্তিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার ব্যয় এবং হেলিকপ্টার উদ্ধার ব্যয় কভার করে।

তবে বীমা থাকলেই যে দুর্ঘটনার পর অর্থ পাওয়া যাবে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়।

কোনো পর্বতারোহী যদি বৈধ অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত রুটে অভিযান পরিচালনা করেন, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে প্রকাশ করেন এবং পলিসির শর্ত মেনে চলেন, তাহলে সাধারণত বীমা দাবি অনুমোদনের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে স্বাস্থ্য তথ্য গোপন করা, অনুমোদনহীন রুট ব্যবহার করা, নির্ধারিত উচ্চতার সীমা অতিক্রম করা কিংবা মাদক বা অ্যালকোহলের প্রভাবে অভিযান পরিচালনার মতো ঘটনায় বীমা কোম্পানি দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

এভারেস্টে বীমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো উদ্ধার ব্যয়। কারণ সেখানে দুর্ঘটনা মানেই প্রায় সব সময় ব্যয়বহুল উদ্ধার অভিযান। আহত একজন পর্বতারোহীকে উদ্ধার করতে অনেক সময় কয়েক হাজার থেকে ১০-১২ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। এরপর হাসপাতালের চিকিৎসা, নিবিড় পরিচর্যা এবং চিকিৎসা স্থানান্তরের খরচ যোগ হলে ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।

পর্যাপ্ত বীমা না থাকলে এই পুরো অর্থের বোঝা এসে পড়ে অভিযাত্রী বা তার পরিবারের ওপর। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা ছাড়া উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান হেলিকপ্টার পাঠাতেও অনাগ্রহ দেখায়।

এভারেস্টের আরেক নীরব নায়ক শেরপারা। বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয় তাদের কাজ। দড়ি স্থাপন, অক্সিজেন বহন, পথ তৈরি এবং বিপদে উদ্ধার- সবচেয়ে কঠিন দায়িত্বগুলো তারাই পালন করেন। অতীতে বহু শেরপার পরিবার বীমা সুবিধা পেয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, তাদের বর্তমান বীমা কভারেজ এখনো ঝুঁকির তুলনায় পর্যাপ্ত নয়।

অন্যদিকে এভারেস্টকে ঘিরে বীমা প্রতারণার ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি নেপালে প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলারের উদ্ধার-বীমা জালিয়াতির তথ্য সামনে আসে। অভিযোগ ছিল, কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় হেলিকপ্টার উদ্ধার দেখিয়ে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক বীমা শিল্পকে নতুন করে সতর্ক করেছে।

তবুও চরম ঝুঁকি সত্ত্বেও এভারেস্টের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমেনি।

চলতি বছরও এভারেস্টে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। নেপালি নারী পর্বতারোহী লাখপা শেরপা ১১তমবারের মতো চূড়ায় পৌঁছে নারীদের মধ্যে সর্বাধিকবার এভারেস্ট জয়ের নিজের রেকর্ড আরও বাড়িয়েছেন। একই মৌসুমে কিংবদন্তি পর্বতারোহী কামি রিতা শেরপা ৩২তমবার শীর্ষে উঠে নিজের গড়া বিশ্বরেকর্ড আরও এগিয়ে নিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত আবহাওয়া এবং অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের বিস্তারের কারণে বিশ্বজুড়ে বিশেষায়িত ঝুঁকি বীমার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বীমা কোম্পানিগুলোও এখন এ ধরনের অভিযানে আরও কঠোর আন্ডাররাইটিং ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে।

বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশে এখনও ট্রেকিং, পর্বতারোহণ বা অন্যান্য উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের জন্য বিশেষায়িত বীমা পণ্য খুব বেশি পরিচিত নয়। তবে বিদেশে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণে অংশ নেয়া বাংলাদেশির সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বীমা পণ্যের চাহিদা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

কারণ এভারেস্টের গল্প শেষ পর্যন্ত শুধু একটি পাহাড়ের গল্প নয়। এটি মানুষের স্বপ্ন, সীমা অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও গল্প। একই সঙ্গে এটি এমন এক বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে একটি দুর্ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যে একজন মানুষকে, এমনকি একটি পরিবারকেও গভীর আর্থিক সংকটে ফেলে দিতে পারে।

তাই প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে, মাউন্ট এভারেস্টে উঠলেই কি মেলে বীমা সুরক্ষা?

উত্তর হলো, বীমা পাওয়া যায়। তবে সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শুধু পাহাড় জয়ের প্রস্তুতি নিলেই হয় না; নিতে হয় ঝুঁকি, দায়িত্ব এবং আর্থিক নিরাপত্তারও পূর্ণ প্রস্তুতি।