অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বীমা খাতের অবদান: বাংলাদেশ কোথায়?

নাদিরা ইসলাম, এমএএস: বীমা খাত বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করার পাশাপাশি এই খাত সঞ্চয় সংগ্রহ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, একটি কার্যকর ও শক্তিশালী বীমা ব্যবস্থা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হলেও বীমা খাতের জিডিপিতে অবদান এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক উন্নয়নশীল দেশে বীমা খাতের জিডিপিতে অবদান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে বীমা প্রবেশ হার দীর্ঘদিন ধরেই নিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। ২০২০ সালে এই হার ছিল জিডিপির প্রায় ০.৫ শতাংশ, যা ২০২২ সালে কমে প্রায় ০.৪ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৪ সালেও এটি ০.৩ থেকে ০.৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অর্থনীতির আকার ও জনগণের আয় বৃদ্ধি পেলেও বীমা খাতের সম্প্রসারণ সেই অনুপাতে ঘটেনি, যা দেশের আর্থিক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে।
অন্যদিকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বীমা খাতের বিকাশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মালয়েশিয়ায় ২০২৪ সালে বীমা প্রবেশ হার প্রায় ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে। শ্রীলঙ্কা ২০২০ সালের প্রায় ১.৩ শতাংশ থেকে উন্নীত হয়ে ২০২৪ সালে ১.৪ থেকে ১.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে ভারতে বীমা প্রবেশ হার ৩.২ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩.৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। চীনে এই হার ৪ শতাংশ থেকে ৪.৫ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। অন্যদিকে জাপান এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে, যেখানে বীমা প্রবেশ হার দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির ৮ থেকে ১০ শতাংশেরও বেশি।
বাংলাদেশের বীমা খাতে সম্ভাবনার অভাব নেই। বরং সঠিক নীতিগত সহায়তা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন এবং গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে এই খাত জাতীয় অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী এক দশকের মধ্যে যদি বাংলাদেশ বীমা প্রবেশ হার জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করতে পারে, তাহলে এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তহবিল সৃষ্টি হবে। যা অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সম্ভাবনাময় এই খাতের সামনে এখনও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, গ্রাহক আস্থার ঘাটতি, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং বীমা সম্পর্কে জনসচেতনতার সীমাবদ্ধতা খাতটির বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যদিও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের ফলে নিয়ন্ত্রক কাঠামো আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে, তবুও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জনের জন্য আরও কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বীমা খাত এখনও তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও এর সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বর্তমান সরকার বীমা খাতের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সুশাসন নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল বীমা সেবার সম্প্রসারণ এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে বীমা প্রবেশ হার বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে, এই খাত ভবিষ্যতে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
লেখক: সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব একচ্যুয়ারিয়াল ফাংশন, আকিজ তাকাফুল লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি।



