এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামাজিক বীমার ভূমিকা: গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামাজিক বীমা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০০৯ সালে, এই অঞ্চলে সরকারি সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের ৫৯ শতাংশ ছিল সামাজিক বীমা খাতে, যা এই ব্যবস্থাকে প্রধান সামাজিক সুরক্ষা পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে, অঞ্চলটিতে সামাজিক বীমার সুফল থেকে অনেকেই বঞ্চিত, বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত জনগণ।
সামাজিক বীমা একটি অবদানমূলক সুরক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে কর্মীরা তাদের আয়ের একটি অংশ জমা দেন, যা পরে অসুস্থতা, অক্ষমতা, কাজের আঘাত, বেকারত্ব এবং বৃদ্ধাশ্রমের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যবহার করা হয়। এটি সরকারি খাতের অধীনে পরিচালিত হয় এবং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এশিয়ার অনেক দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষ সামাজিক বীমার সুবিধা পেতে পারেন না, কারণ তারা স্থায়ীভাবে চাকরিতে নিযুক্ত নয় এবং তাদের আয় অস্থায়ী। এসব কর্মীরা সামাজিক বীমা স্কিমে যোগ দিতে পারেন না, যার ফলে তাঁরা বীমার সুবিধা থেকে বাদ পড়েন। এটি সমাজে এক বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে এবং বীমার সুবিধার মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে।
পেনশন সামাজিক বীমার সবচেয়ে বড় অংশ, যা মোট সামাজিক বীমা ব্যয়ের ৬৫ শতাংশ গ্রহণ করে। তবে, প্রতিষ্ঠিত কর্মীরা এই সুবিধা পেয়ে থাকলেও, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরতরা এই সুবিধা থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশে প্রায় ১০-১৫ শতাংশ কর্মীই পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বাস্থ্য বীমা সামাজিক বীমার দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত, যা ১৩ শতাংশ ব্যয় করলেও ৩৫ শতাংশ জনগণকে সুরক্ষা প্রদান করে। এই বীমা ব্যবস্থাটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে এবং এর সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরও জনগণের জন্য সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব।
মাতৃত্ব ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড প্রত্যাহার এবং বিচ্ছেদ সুবিধা অন্যান্য সামাজিক বীমার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে, উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বেকারত্ব সুবিধার অভাব লক্ষণীয়। চীন, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনে প্রভিডেন্ট ফান্ডের মাধ্যমে কর্মীদের জন্য কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করেছে, যদিও এগুলো সীমিত।
নারীরা সামাজিক বীমার সুবিধা কম পান, যদিও কিছু সুবিধা যেমন মাতৃত্ব ছুটি সরাসরি তাদের জন্য পরিকল্পিত। তাদের জন্য সামাজিক বীমার অধিকার সীমিত কারণ অধিকাংশ নারী অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এবং তাই তাঁরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই বৈষম্য দূর করতে সরকারকে আরও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, এবং মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে সামাজিক বীমার ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি কার্যকর। জাপানে স্বাস্থ্য বীমা দেশের মোট ১২৭ মিলিয়ন জনগণকে কভার করে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং সফল স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থাও এরকম একটি সফল উদাহরণ।
২০০৯ সালে চীন নতুন গ্রামীণ পেনশন স্কিম চালু করে, যা বৃদ্ধদের জন্য একটি ন্যূনতম আয় সুরক্ষা প্রদান করে এবং সঞ্চয় উৎসাহিত করে। শহুরে কর্মীদের জন্য ২০১১ সালে সামাজিক পেনশন স্কিম চালু করা হয়, যা দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য নতুন এক সুযোগ সৃষ্টি করে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামাজিক বীমার ব্যবস্থা এখনও অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ এবং অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তবে, সরকারের পদক্ষেপ এবং নতুন উদ্যোগ এই ব্যবস্থাগুলিকে আরও কার্যকর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সহায়ক হচ্ছে। বিশেষ করে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত কর্মীদের জন্য সামাজিক বীমার সুবিধা নিশ্চিত করা এবং নারী কর্মীদের জন্য অধিক সুরক্ষা প্রদান করা জরুরি।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামাজিক বীমা ব্যবস্থা এই অঞ্চলের জনগণের জন্য একটি শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তবে, সামাজিক বীমার সুবিধার মধ্যে বৈষম্য এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের বঞ্চনার সমস্যা এখনও বিদ্যমান। সরকার এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার আরো উদ্যোগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে আরও সুরক্ষিত, সমতাভিত্তিক এবং কার্যকর করা সম্ভব হবে। (সংবাদ সূত্র: এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক)