জেন-জিকে আকৃষ্ট করতে পারছে না বীমা কোম্পানি, ভবিষ্যতে গ্রাহক হারানোর আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বের বীমা খাতে গ্রাহকদের প্রত্যাশা ও কোম্পানিগুলোর ধারণার মধ্যে বড় ধরনের ফারাক দেখা যাচ্ছে। ট্রান্সইউনিয়নের ২০২৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ বীমা কোম্পানি মনে করে তারা গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী ভালো সেবা দিচ্ছে। কিন্তু এ কথা মানছেন মাত্র ৪৩ শতাংশ গ্রাহক। জেন-জি বা তরুণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও বেশি। তাদের মাত্র ৩২ শতাংশ মনে করে বীমা কোম্পানিগুলো তাদের প্রয়োজন বুঝে সেবা দিচ্ছে। অন্যদিকে ৬৮ শতাংশ জেন-জির ধারণা, বীমা কোম্পানিগুলো এখনো তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।

এই ব্যবধান বীমা খাতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। কারণ জেন-জি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যখন তারা আয় শুরু করছে, সম্পদ গড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করছে। ফলে এই প্রজন্মের আস্থা অর্জন করতে না পারলে বীমা কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতের বড় একটি গ্রাহকগোষ্ঠী হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

বাংলাদেশেও তরুণ জনগোষ্ঠী বড় শক্তি। ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৫৯ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ। ফলে আগামী দিনের বীমা খাতে এই প্রজন্মের গুরুত্ব আরও বাড়বে।

বাংলাদেশের বীমা খাত এখনো সম্ভাবনার তুলনায় ছোট। বিভিন্ন শিল্প বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের বীমা পেনিট্রেশন হার প্রায় ০.৪০ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির আকারের তুলনায় বীমা ব্যবহারের হার এখনও খুব কম। দেশে বর্তমানে ৮২টি বীমা কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি লাইফ বীমা এবং ৪৬টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি।

তরুণদের কাছে বীমা এখনো অগ্রাধিকার নয়। কারণ অনেকের কাছে বীমা জটিল, দীর্ঘমেয়াদি এবং প্রয়োজনের সময় প্রকৃত সুবিধা পাওয়া যাবে কি না-এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। আস্থার এই সংকট আরও স্পষ্ট হয় দাবি নিষ্পত্তির আলোচনায়।

খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, দাবি নিষ্পত্তির গতি ও হার এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালে লাইফ বীমায় দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল ৩৪ শতাংশ, আর নন-লাইফ বীমায় বছরের প্রথম নয় মাসে তা নেমে আসে প্রায় ১০ শতাংশে।

আরও সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে বীমা খাতের গড় দাবি নিষ্পত্তি হার ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে লাইফ বীমায় এ হার ছিল ৩৫.১৮ শতাংশ এবং নন-লাইফ বীমায় ৭.৫৫ শতাংশ। দাবি নিষ্পত্তির এমন চিত্র নতুন গ্রাহক আকর্ষণ এবং আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে বীমা পলিসির সংখ্যাও কমেছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালে মোট পলিসির সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ, যা ২০২৩ সালে কমে দাঁড়ায় ৮৫.৮৮ লাখে। একই সময়ে ২৬ লাখের বেশি পলিসি ল্যাপস করেছে। এটি গ্রাহক ধরে রাখার ক্ষেত্রে বীমা খাতের দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ডিজিটাল সেবায় দ্রুত অভ্যস্ত হচ্ছে। ২০২৩ সালে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব ব্যক্তিদের ৫১.৭ শতাংশের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে অ্যাকাউন্ট ছিল। একই সময়ে প্রায় ৪৭.৮ শতাংশ মানুষের এমএফএস অ্যাকাউন্ট ছিল।

বাংলাদেশের এমএফএস খাতের ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশে মোট এমএফএস অ্যাকাউন্ট ছিল ২৩.৯৩ কোটি, যা এক বছর আগে ছিল ২১.৯১ কোটি। একই সময়ে সক্রিয় এমএফএস অ্যাকাউন্ট ছিল প্রায় ৮.৯৪ কোটি। এই প্রবণতা দেখায়, তরুণরা ক্রমেই ডিজিটাল আর্থিক সেবার দিকে ঝুঁকছে।

তরুণদের এই ডিজিটাল অভ্যাস বীমা খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তারা মোবাইল অ্যাপ, তাৎক্ষণিক সেবা, সহজ পেমেন্ট, অনলাইন ট্র্যাকিং এবং পরিষ্কার তথ্য চায়। কিন্তু অনেক বীমা প্রতিষ্ঠানের সেবা এখনও পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্রাহকের তথ্য সমন্বিতভাবে ব্যবহার, দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনভিত্তিক সেবা বা অফার তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গিগ ইকোনমি ও ফ্রিল্যান্সিং নতুন ধরনের বীমা চাহিদা তৈরি করছে। রাইডশেয়ার চালক, ফুড ডেলিভারি কর্মী, ফ্রিল্যান্সার এবং স্টার্টআপ কর্মীদের অনেকেই প্রচলিত করপোরেট স্বাস্থ্য সুবিধা বা কর্মী সুরক্ষার আওতায় থাকেন না। তাই আয় সুরক্ষা বীমা, দুর্ঘটনা বীমা, স্বল্পমেয়াদি স্বাস্থ্য বীমা এবং ব্যবহারভিত্তিক বীমার চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বীমা খাতে এখনও এ ধরনের পণ্যের বিস্তার খুব বেশি হয়নি।

বীমা কোম্পানিগুলো প্রায়ই গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার কথা বলে। কিন্তু অনেক গ্রাহক মনে করেন, বাস্তবে সেই সেবাগুলো তাদের চাহিদা ও পরিস্থিতির সঙ্গে ততটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সমস্যাটি মূলত তিনটি জায়গায় বেশি দেখা যায়-পণ্য, যোগাযোগ এবং সেবায়।

অনেক পলিসি এখনও বড় গ্রুপের জন্য তৈরি করা হয়। ব্যক্তিগত জীবনধারা বা আচরণের ভিত্তিতে কাস্টমাইজেশনের সুযোগ সীমিত। আবার অনেক গ্রাহক একই ধরনের এসএমএস, ই-মেইল বা প্রচারণামূলক বার্তা পান, যা তাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। পাশাপাশি গ্রাহকের পূর্বের আচরণ, দাবি ইতিহাস বা প্রয়োজন বিবেচনা করে আগাম পরামর্শ দেওয়ার সংস্কৃতিও এখনও দুর্বল।

ফলে কোম্পানিগুলো মনে করছে তারা গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিচ্ছে, কিন্তু গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় সমস্যা শুধু সেবার ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে আস্থার প্রশ্নও জড়িত। বহু বছর ধরে গ্রাহকদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে দাবি নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা, পলিসির শর্ত সম্পর্কে অস্পষ্টতা, অতিরঞ্জিত বিক্রয় প্রতিশ্রুতি এবং গ্রাহকসেবার দুর্বলতা। ফলে অনেক মানুষের কাছে বীমা এখনও পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।

একজন তরুণ গ্রাহক যদি প্রথম দাবি নিষ্পত্তির সময় খারাপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তাহলে তিনি শুধু নিজে নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সেই অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন। ডিজিটাল যুগে এর প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

ডিজিটাল রূপান্তরও এখন বীমা খাতের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়। বিশ্বের অনেক দেশে মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন পলিসি ক্রয়, ডিজিটাল কেওয়াইসি, তাৎক্ষণিক কোটেশন এবং ভিডিওভিত্তিক দাবি মূল্যায়ন সাধারণ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে ডিজিটাল বীমা সেবার ব্যবহার বাড়ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রিমিয়াম পরিশোধ, পলিসির তথ্য দেখা এবং অনলাইনে গ্রাহকসেবা দেয়ার ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনও পুরো শিল্পজুড়ে বিস্তৃত হয়নি। ফলে অনেক গ্রাহককে এখনও প্রচলিত কাগজপত্র ও শাখাভিত্তিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়।

এআই বীমা খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করে ঝুঁকি মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ, দাবি প্রক্রিয়াকরণ এবং গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তাব তৈরি করছে। তবে ট্রান্সইউনিয়নের গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৪৬ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা গ্রাহকের প্রয়োজনভিত্তিক উন্নত সেবা ও এআই-এ বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

তবে প্রযুক্তির সঙ্গে ডেটা গোপনীয়তার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। জেন জেড উন্নত সেবার জন্য তথ্য দিতে রাজি হতে পারে, কিন্তু তারা জানতে চায় সেই তথ্য কীভাবে ব্যবহার হবে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ কতটুকু থাকবে। ফলে বীমা কোম্পানিগুলোকে শুধু প্রযুক্তিতে নয়, স্বচ্ছ ডেটা নীতি, স্পষ্ট সম্মতি ব্যবস্থা এবং তথ্য সুরক্ষাতেও বিনিয়োগ করতে হবে।

ইনশুরটেক প্রতিষ্ঠানগুলো এই জায়গাতেই এগিয়ে যাচ্ছে। তারা মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সেবা, তাৎক্ষণিক কোটেশন, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, সহজ ইন্টারফেস এবং ডেটা-ভিত্তিক অফারের মাধ্যমে তরুণদের আকৃষ্ট করছে। ফলে প্রতিযোগিতা এখন শুধু প্রিমিয়ামের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সেবার গতি, স্বচ্ছতা এবং ব্যবহার-সহজতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের বীমা খাতের সীমাবদ্ধতাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেখানে বাংলাদেশের বীমা পেনিট্রেশন প্রায় ০.৪০ শতাংশ, সেখানে ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশে বীমা খাত অর্থনীতিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশের সামনে প্রবৃদ্ধির সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি সংস্কার ও উদ্ভাবনের প্রয়োজনও স্পষ্ট।

জেন-জি হারানো মানে শুধু একটি প্রজন্ম হারানো নয়। এর মানে দীর্ঘমেয়াদি প্রিমিয়াম আয়, ভবিষ্যৎ ক্রস-সেলিং, স্বাস্থ্য, জীবন, সম্পদ ও ভ্রমণ বীমার সম্ভাব্য গ্রাহক হারানো। একজন তরুণ গ্রাহক আজ যদি একটি বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন, তাহলে তিনি আগামী কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ধরনের বীমা পণ্যের সম্ভাব্য ক্রেতা হতে পারেন।

সামনের পথ তাই স্পষ্ট। বীমা কোম্পানিগুলোকে দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, সহজ ভাষায় পলিসি ব্যাখ্যা, মোবাইলভিত্তিক সেবা, স্বচ্ছ ডেটা ব্যবহার, এআই-ভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং গ্রাহককেন্দ্রিক পণ্য উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।

আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কে বেশি পলিসি বিক্রি করছে, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। বরং কে তরুণ গ্রাহকের প্রয়োজন, আচরণ ও প্রত্যাশা সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করবে বীমা শিল্পের ভবিষ্যৎ। জেন-জিদের আস্থা অর্জন করতে পারা প্রতিষ্ঠানগুলোই আগামী দশকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।