এআই ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বদলে যাচ্ছে ক্রস-বর্ডার ইন্স্যুরেন্স খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এর সঙ্গে ইন্স্যুরেন্স খাতও বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্রস-বর্ডার ইন্স্যুরেন্স এখন আর ছোট বা আলাদা কোনো সেবা নয়। এটি এখন বৈশ্বিক ঝুঁকি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, কাজের জন্য দেশান্তর, শিক্ষা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে। ফলে এই সেবার চাহিদাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্ব ইন্স্যুরেন্স খাতে মোট প্রিমিয়াম আয় প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ইউরো এবং খাতটি বছরে ৮ শতাংশের বেশি হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বিশ্বে মানুষের চলাচল এখন অনেক বেশি গতিশীল। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটন ছিল প্রায় ১.৩ থেকে ১.৪ বিলিয়ন ট্রিপ। বাংলাদেশ থেকেও প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ বিদেশে যায়। শুধু কর্মসংস্থানের জন্যই যায় ১০ লাখের বেশি মানুষ। মোট প্রবাসী বাংলাদেশি এখন প্রায় ৮ থেকে ১০ মিলিয়নের মধ্যে। এই মানুষরা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা, দুর্ঘটনা, কাজের ঝুঁকি এবং ভিসা জটিলতার মতো অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। তাই তাদের জন্য ক্রস-বর্ডার ইন্স্যুরেন্সের প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্বের ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স খাতও দ্রুত বড় হচ্ছে। ২০২৪ সালে এর আকার ছিল প্রায় ২৩ থেকে ৩১ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এটি ৬০ থেকে ১৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে বিভিন্ন পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে। এই খাত প্রতি বছর ১০ থেকে ১৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। একই সঙ্গে মেডিকেল ট্যুরিজম খাতও বড়, যার আকার প্রায় ৪৫ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
আগে এই ইন্স্যুরেন্স মূলত ভ্রমণকেন্দ্রিক ছিল। এখন এটি আরও বিস্তৃত হয়েছে। এতে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বীমা, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কভারেজ, বিদেশে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের বীমা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঝুঁকি সুরক্ষা। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা জটিল হওয়ায় ঝুঁকির ধরনও বেড়েছে।
প্রযুক্তি এই খাতকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ইনশুরটেক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই অনলাইনে ইন্স্যুরেন্স কেনা যায় এবং পলিসি তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয় হয়। এই খাতে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশে ডিজিটাল ইন্স্যুরেন্স সেবা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্লেইম প্রসেসিংও অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে।
এখন সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো 'এমবেডেড ইন্স্যুরেন্স'। এতে ইন্স্যুরেন্স আলাদা করে কেনা লাগে না। এটি ফ্লাইট বুকিং, ট্রাভেল অ্যাপ, মোবাইল ওয়ালেট বা ফিনটেক সেবার সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে। ফলে ব্যবহারকারীর জন্য ঝুঁকি সুরক্ষা অনেক সহজ হয়ে গেছে এবং এটি ডিজিটাল অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে মোবাইলভিত্তিক ইন্স্যুরেন্স দ্রুত বাড়ছে। প্রচলিত ব্যাংক বা শাখা-ভিত্তিক সেবা সীমিত হলেও মোবাইল ব্যবহার অনেক বেশি। ফলে মানুষ এখন মোবাইল দিয়েই ইন্স্যুরেন্স নিতে পারছে। তবে এখনো সামগ্রিক গ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে কম, যা প্রায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে।
এই খাতে ব্যাংক, ফিনটেক কোম্পানি এবং রেমিট্যান্স সেবাদাতাদের অংশীদারিত্ব বাড়ছে। এর মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য একীভূত আর্থিক সেবা তৈরি হচ্ছে, যেখানে রেমিট্যান্স, সঞ্চয় এবং ঝুঁকি সুরক্ষা একসঙ্গে যুক্ত থাকে। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য আন্তর্জাতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চাহিদাও বাড়ছে, যা নতুন ধরনের ইন্স্যুরেন্স পণ্যের বাজার তৈরি করছে।
তবে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের নিয়ম-কানুন এক নয়। সীমান্ত পেরিয়ে ক্লেইম প্রসেসিং জটিল। মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকি রয়েছে। অনেক মানুষের মধ্যে ইন্স্যুরেন্স সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি আছে। ডিজিটাল সেবার ওপর আস্থাও এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। এসব কারণে খাতটি তার পূর্ণ গতিতে পৌঁছাতে পারছে না।
বাংলাদেশে কিছু নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এই সেবা দিচ্ছে, তবে এখনো আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ কাভারেজ সীমিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিদেশি ইন্স্যুরারদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সেবা দেয়া হয়, বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকির ক্ষেত্রে।
অন্যদিকে ভারত, ফিলিপাইন এবং শ্রীলঙ্কার মতো দেশে ইন্স্যুরেন্স গ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি। অনেক দেশে ভিসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক হওয়ায় সেখানে ডিজিটাল ইন্স্যুরেন্স ইকোসিস্টেম দ্রুত বিকশিত হয়েছে এবং খাত আরও সংগঠিত হয়েছে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স এই খাতকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করে তুলবে। ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং ক্লেইম প্রসেসিং আরও স্বয়ংক্রিয় হবে। ভবিষ্যতে একটি বৈশ্বিক ডিজিটাল ইন্স্যুরেন্স মার্কেটপ্লেস তৈরি হতে পারে, যেখানে ব্যবহারকারীরা এক জায়গা থেকে বিভিন্ন দেশের পলিসি তুলনা ও ক্রয় করতে পারবে। এতে ইন্স্যুরেন্স ধীরে ধীরে দেশভিত্তিক সেবা থেকে বৈশ্বিক, ডেটা-চালিত এবং রিয়েল-টাইম সুরক্ষা ব্যবস্থায় পরিণত হবে।



