তুরস্কের নন-লাইফ বীমায় ২৮% প্রবৃদ্ধি, আয় বেড়েছে ৫১ বিলিয়ন লিরা

আন্তর্জাতিক প্রতিবেদক: ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে তুরস্কের নন-লাইফ বা সাধারণ বীমা খাতে প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ২৩১ বিলিয়ন তুর্কি লিরা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ২৮ শতাংশ বেশি। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে খাতটির প্রিমিয়াম আয় বেড়েছে প্রায় ৫১ বিলিয়ন তুর্কি লিরা।

এই প্রবৃদ্ধি তুরস্কের সাধারণ বীমা খাতের শক্তিশালী অবস্থানকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, মোটর, সম্পত্তি, অগ্নি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বীমার চাহিদা বাড়ায় দেশটির নন-লাইফ বীমা বাজার আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

একই সময়ে শীর্ষ পাঁচ নন-লাইফ বীমা কোম্পানি মিলে ১১৯ বিলিয়ন লিরা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে। এর মাধ্যমে তারা মোট নন-লাইফ বীমা বাজারের ৫২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০২৫ সালে শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির বাজার অংশীদারিত্ব ছিল ৪৮ শতাংশ। ফলে ২০২৬ সালের শুরুতে বড় কোম্পানিগুলোর বাজার-প্রভাব আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০২৫ সালেও তুরস্কের নন-লাইফ বীমা খাত উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। ওই বছর খাতটির মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ১.০৪৪ ট্রিলিয়ন লিরা, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি।

তুরস্কের নন-লাইফ বীমা বাজারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি তুর্কিয়ে সিগোর্তা। ২০২৫ সালে কোম্পানিটি ১৪৭.১ বিলিয়ন লিরা প্রিমিয়াম আয় করে। আগের বছরের তুলনায় এ আয় ৪৫ শতাংশ বেশি।

২০২৫ সালে তুর্কিয়ে সিগোর্তার বাজার অংশীদারিত্ব ছিল ১৪ শতাংশ। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে তা বেড়ে প্রায় ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানা, বিস্তৃত গ্রাহকভিত্তি এবং নন-লাইফ বীমার বিভিন্ন শাখায় শক্ত উপস্থিতি কোম্পানিটিকে বাজারে এগিয়ে রেখেছে।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আলিয়ানজ সিগোর্তা। তুরস্কের স্বাস্থ্য বীমা খাতে কোম্পানিটির অবস্থান বিশেষভাবে শক্তিশালী।

২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে স্বাস্থ্য বীমা তুরস্কের নন-লাইফ বাজারের সবচেয়ে বড় শাখা হিসেবে উঠে এসেছে। এ খাতের বাজার অংশীদারিত্ব দাঁড়িয়েছে ২৮ শতাংশে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং উন্নত চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণের প্রবণতা স্বাস্থ্য বীমার চাহিদা বাড়াচ্ছে। এই পরিবর্তনের বড় সুবিধাভোগীদের মধ্যে আলিয়ানজ সিগোর্তা অন্যতম।

তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আনাদোলু সিগোর্তা। ইশব্যাংক-সমর্থিত এই কোম্পানি তুরস্কের সাধারণ বীমা বাজারে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে।

মোটর, স্বাস্থ্য, অগ্নি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বীমাসহ বিভিন্ন পণ্যে কোম্পানিটির শক্ত উপস্থিতি রয়েছে। ২০২৫ সালে আনাদোলু সিগোর্তার বাজার অংশীদারিত্ব ছিল ৯ শতাংশ। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেও কোম্পানিটি প্রায় একই অবস্থান ধরে রেখেছে। এটি কোম্পানিটির স্থিতিশীল গ্রাহকভিত্তি ও বাজারে ধারাবাহিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে এক্সা সিগোর্তা। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, স্বাস্থ্য, সম্পত্তি ও বাণিজ্যিক বীমা পণ্যে উপস্থিতির কারণে কোম্পানিটি তুরস্কের নন-লাইফ বীমা বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে এক্সা সিগোর্তার বাজার অংশীদারিত্ব ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। তুরস্কের মতো বড় ও বৈচিত্র্যময় অর্থনীতিতে করপোরেট, বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত বীমা পণ্যের চাহিদা বাড়ায় এক্সার মতো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোম্পানির জন্য বাজারে আরও সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

পঞ্চম স্থানে রয়েছে এইচডিআই সিগোর্তা। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে কোম্পানিটির বাজার অংশীদারিত্ব দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ শতাংশে।

মোটর থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি এবং মোটর ওন ড্যামেজ বীমাসহ নন-লাইফ বীমার গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে এইচডিআই সিগোর্তা সক্রিয় অবস্থান ধরে রেখেছে। তুরস্কে যানবাহন ব্যবহার, নগরায়ণ এবং বাধ্যতামূলক মোটর বীমার প্রয়োজনীয়তা মোটর বীমা খাতকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

২০২৬ সালের শুরুতে তুরস্কের নন-লাইফ বীমা বাজারে স্বাস্থ্য বীমা সবচেয়ে বড় শাখা হিসেবে উঠে এসেছে। প্রথম দুই মাসে এই খাতের প্রিমিয়াম ছিল প্রায় ৬৬ বিলিয়ন লিরা।

স্বাস্থ্য বীমার পর বড় অবস্থানে রয়েছে মোটর থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি, জেনারেল লসেস, অগ্নি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মোটর ওন ড্যামেজ বীমা। এসব খাত তুরস্কের অর্থনীতি, নাগরিক জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব বীমা পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে।

তুরস্কে নন-লাইফ বীমা খাতে বহু কোম্পানি সক্রিয় থাকলেও প্রিমিয়াম আয়ের বড় অংশ এখন শীর্ষ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দখলে। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির ৫২ শতাংশ বাজার অংশীদারিত্ব এ খাতে বাজার-কেন্দ্রীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে এটি একই সঙ্গে বড় কোম্পানিগুলোর পণ্য বৈচিত্র্য, বিতরণ নেটওয়ার্ক, গ্রাহকসেবা ও ব্র্যান্ড বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলনও। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোর জন্য পণ্য উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা এবং দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বীমা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও মোটর বীমার চাহিদা এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ তুরস্কের নন-লাইফ বীমা বাজারকে আরও বড় করছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ায় গ্রাহকদের জন্য বীমা পণ্য কেনা, নবায়ন করা এবং দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উভয়ই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন হচ্ছে। এর ফলে নন-লাইফ বীমা খাতের গ্রাহকভিত্তি বিস্তৃত হচ্ছে।

মিডল ইস্ট ইন্স্যুরেন্স রিভিউয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সাল তুরস্কের বীমা খাতের জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং টেকসই বীমা উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বছর হতে পারে।

তুরস্কের অর্থনীতি মূলত সেবা ও শিল্প খাতনির্ভর। এসব খাতে ব্যবসা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, সম্পত্তি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন বেশি। এ কারণে নন-লাইফ বীমা দেশটির অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

অর্থনীতি যত বড় ও বৈচিত্র্যময় হচ্ছে, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ঝুঁকি সুরক্ষার প্রয়োজনও তত বাড়ছে। এই বাস্তবতা তুরস্কের সাধারণ বীমা বাজারের প্রবৃদ্ধিকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।

২০২৬ সালের শুরুতে তুরস্কের নন-লাইফ বীমা বাজারের ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি খাতটির শক্তিশালী সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। স্বাস্থ্য বীমার দ্রুত উত্থান, মোটর বীমার স্থায়ী চাহিদা, বড় কোম্পানির বাজার-প্রভাব এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ বাজারকে আরও গতিশীল করতে পারে।

তবে বড় কোম্পানিগুলোর বাজার অংশীদারিত্ব বাড়তে থাকলে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে গ্রাহকসেবা, দাবি নিষ্পত্তির গতি, ডিজিটাল সুবিধা, পণ্যের দাম এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ভবিষ্যতে কোম্পানিগুলোর অবস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

তুরস্কের নন-লাইফ বীমা খাত ২০২৬ সালের শুরুতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে। খাতের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে স্বাস্থ্য, মোটর ও সম্পত্তি বীমা খাতকে কেন্দ্র করে দেশটির সাধারণ বীমা বাজারে আরও সম্প্রসারণ ও প্রতিযোগিতা দেখা যেতে পারে।

(লেখক: ইলায়দা এদা গুর, মার্কেটিং কনসালট্যান্ট; সাবেক শিক্ষার্থী, ইস্তানবুল বিলগি ইউনিভার্সিটি)