আপেল মাহমুদের তাহলে কী হবে!
নিজস্ব প্রতিবেদক: আলফা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পরিচয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সদস্য হয়েছেন মো. আপেল মাহমুদ। কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যও হয়েছেন বিআইএ’র।
অথচ বীমাখাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডআরএ) আপেলের সিইও হিসেবে নিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদনই করেনি। সিইও হওয়ার যোগ্যতা না থাকায় এ নিয়োগ অনুমোদন পাচ্ছে না বলে আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে।
সিইও হিসেবে আপেল মাহমুদের আইডিআরএ থেকে অনুমোদন না পাওয়া, আবার সিইও পরিচয় দিয়ে বিআইএ’র সদস্য হওয়া নিয়ে আইডিআরএ, বিআইএ ও কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সাথে কথা বলে ইন্স্যুরেন্স নিউজবিডি ।
আইডিআরএ জানিয়েছে, আপেল মাহমুদ এখনো আইডিআরএ থেকে অনুমোদন পায়নি। তাই তিনি সিইও পরিচয়টি ব্যবহার করতে পারবেন না।
এ বিষয়ে বিআইএ বলছে, কেউ তথ্য গোপন করে সদস্য হলে সে বিষয়ে সদস্যদের মধ্য থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পেলে তাদের কিছু করা নেই।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই সিইও পরিচয়ে তথ্য গোপন করে দেশের বীমাখাতের মালিকদের প্রভাবশালী সংগঠনের সদস্য হওয়া আপেল মাহমুদের তা হলে কি হবে। বিআইএ থেকে তার সদস্য পদ বাতিল হবে নাকি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআইএ তার বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের দায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে বীমা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বীমা কোম্পানির সর্বোচ্চ নির্বাহী তথ্য গোপন শাস্তিমূলক অপরাধ। এ বিষয়ে আইডিআরএ ও বিআইএ উভয়ই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। না হলে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হবে।
বিআইএ’র সদস্য হওয়ার জন্য করা আবেদনে আলফা ইসলামী লাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) উল্লেখ করেছেন আপেল মাহমুদ। তবে আলফা ইসলামী লাইফ থেকে তাকে সিইও হিসেবে অনুমোদন চেয়ে আবেদন করলে তা অনুমোদন করেনি আইডিআরএ। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকার অভিযোগ ওঠায় আপেলের যোগ্যতার প্রমাণ চায় আইডিআরএ।
আলফা লাইফের সিইও পরিচয়ে বিআইএতে ভোটার হওয়ার আবেদন করেন আপেল। সেই আবেদন গ্রহণ করে তাকে ভোটার বানানো হয়। সেই সঙ্গে বিআইএ’র কর্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগও দেয়া হয়। অথচ যোগ্যতার প্রমাণ চাওয়ার পর প্রায় দুই মাস পার হয়ে গেলেও আইডিআরএ’র কাছে সিইও হওয়ার যোগ্যতার প্রমাণপত্র এখনো দিতে পারেননি আপেল।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে আলফা ইসলামী লাইফে নিয়মিত কোন সিইও নেই। এ সময়ে সিইও নিয়োগে কোন ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। প্রায় আড়াই বছর পর গত এপ্রিলে আলফা ইসলামী লাইফের সিইও পদে মো. আপেল মাহমুদের নাম প্রস্তাব করে আইডিআরএ’র অনুমোদন চাওয়া হয়।
এরপর পরই আইডিআরএ’তে একটি অভিযোগ পড়ে। ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়, বীমা কোম্পানির মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ সংক্রান্ত প্রবিধানমালা ২০১২ অনুসারে আপেল মাহমুদ মুখ্য নির্বাহীর অব্যবহিত পরের পদে ৩ বছর দায়িত্ব পালন করেননি।
এছাড়া আলফা ইসলামী লাইফে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, অবৈধ কমিশন, আইডিআরএ’র নির্দেশনা অমান্য করে অনৈতিকভাবে প্রিমিয়াম সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, আপেল মাহমুদ আলফা ইসলামী লাইফে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পান ২০১৫ সালের জুলাই মাসে। ওই বছরের অক্টোবর মাস থেকে তিনি কোম্পানিটির ভারপ্রাপ্ত মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এর আগে তিনি ফারইষ্ট ইসলামী লাইফে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও হেড অব সার্ভিসিং পদে কর্মরত ছিলেন। আপেল মাহমুদ ফারইষ্ট ইসলামী লাইফে চাকরি শুরু করেন ২০০৯ সালে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে। এরপর ২০১৩ সালে তিনি ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে পদোন্নতি পান। এর আগে তিনি হোমল্যান্ড লাইফে সহকারি ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চাকরি করেন।
এ অভিযোগের পর আপেল মাহমুদের যোগ্যতার প্রমাণ চেয়ে গত এপ্রিল মাসেই আইডিআরএ থেকে চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে আপেল মাহমুদ কোন কোন কোম্পানিতে কাজ করেছেন তার প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্যাডে অভিজ্ঞতার বর্ণনা চাওয়া হয়। সেই সঙ্গে বীমা কোম্পানিতে মূখ্য নির্বাহীর অব্যবহিত পরের পদে ৩ বছর দায়িত্ব পালনের প্রমাণও পাঠাতে বলা হয়েছে। তবে এরপর প্রায় দুই মাস পার হয়ে গেলেও আইডিআরএ’র কাছে সিইও হওয়ার যোগ্যতার প্রমাণপত্র দিতে পারেনি আপেল।
এ বিষয়ে আইডিআরএ’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা গোকুল চাঁদ দাস বলেন, আমরা আলফা লাইফের সিইও হিসেবে আপেল মাহমুদের নিয়োগ অনুমোদন করিনি। যদি তিনি কোথাও নিজেকে সিইও হিসেবে দেখান তাহলে তা অবৈধ হবে। যেহেতু আপেল মাহমুদকে আমরা অনুমোদন দেইনি, সেহেতু তিনি কোম্পানির সিইও’র দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। যদি কোম্পানি কোন ক্ষমতা বলে তাকে সিইও দায়িত্ব পালন করায় তবে ভবিষ্যতে কোম্পানি বিপদে পড়বে।
এদিকে বিআইএ সূত্রে জানা গেছে, আগে বিআইএ’র কার্যনির্বাহী কমিটি ছিল ১৫ সদস্য বিশিষ্ট। এরমধ্যে সাধারণ বীমা কোম্পানি থেকে ১০ জন এবং জীবন বীমা কোম্পানি থেকে ৫ জন থাকতেন। এবারের নির্বাচন (২০১৭-১৮) উপলক্ষ্যে বিআইএ’র গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সংখ্যা ২০ জন করা হয়েছে। এরমধ্যে ১০ জন সাধারণ বীমা এবং ১০ জন জীবন বীমা থেকে থাকবেন।
নতুন এই নিয়ম করার পাশাপাশি প্রথম দিকে সিইওরা যাতে বিআইএতে থাকতে না পারে সে বিষয়েও গঠনতন্ত্রে একটি পরিবর্তন আনা হয়। তবে পরবর্তীতে সেই পরিবর্তন থেকে সরে আসে বিআইএ। বিআইএতে সিইওদেরও থাকার সুযোগ করে দেয়া হয়। সেই সুযোগ নিয়ে কয়েকজন সিইও বিআইএ’র কার্যনির্বাহী কমিটিতেও স্থান করে নিয়েছেন। তবে আপেল মাহমুদ কোন কোম্পানির সিইও না হওয়ার পরও তাকে বিআইএ’র সদস্য করা হয়েছে এবং কার্যনির্বাহী কমিটিতে রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিআইএ’র প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেন বলেন, বীমা কোম্পানির পরিচালক ও সিইওরা বিআইএ’র সদস্য হতে পারবেন। সিইও’র নিচের পদের কোন ব্যক্তি বিআইএ’র সদস্য হতে পারবে না। তবে কেউ মিথ্য তথ্য দিয়ে সদস্য হলে আমাদের করার কিছু নেই। কারণ কোম্পানি থেকে যার নাম প্রস্তাব করা হয় আমরা তাকেই সদস্য করি। তিনি কোম্পানিতে আছেন কি নেই তা যাচাই করার সুযোগ আমাদের নেই।
তিনি বলেন, আপেল মাহমুদ যদি আলফা লাইফের সিইও না হয়ে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইডিআরএ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আইডিআরএ থেকে আমাদের চিঠি দিলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। অথবা বিআইএ’র বৈধ কোন সদস্য এ বিষয়ে তথ্য প্রমাণসহ অভিযোগ করলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে আলফা লাইফের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সিইও নিয়োগের বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে চাননি। ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেদেন। আর আপেল মাহমুদ দেশের বাহিরে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভাব হয়নি।