তহবিল তছরূপ ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা

ফারইস্ট লাইফের আত্মসাতকৃত টাকা উদ্ধারে ব্যবস্থা নেয়নি কেউ, গ্রাহকের চাপ সামলাতে মানববন্ধন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের তহবিল থেকে ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এতে তহবিলে দাবি পরিশোধের পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় গ্রাহকদের টাকা দিতে পারছে না কোম্পানিটি। কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই টাকা উদ্ধারে আইন অনুসারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

অথচ বীমা আইন অনুসারে, আইন লঙ্ঘন করা বা অবৈধভাবে বীমা কোম্পানির টাকা দখলে রাখার কারণে লাইফ ফান্ডের টাকা হ্রাস পেলে বা কমে গেলে সেই টাকা উদ্ধারের জন্য বীমা আইনের ১৩৬ ধারা অনুসারে মামলার বিধান রাখা হয়েছে। এ মামলা করবেন আইনের ৯৫ ধারায় নিয়োগকৃত প্রশাসক অথবা কোম্পানির একজন পরিচালক বা সদস্য।

আইনে আরো বলা হয়েছে, গ্রাহক স্বার্থ ক্ষুন্ন করা হলে বা কোন কোম্পানি গ্রাহকের দায় পরিশোধে আর্থিক সক্ষমতা হারালে বীমা আইনের ৫০ ধারা অনুসারে পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা দায়ি ব্যক্তিদের সাসপেন্ড করতে পারে কর্তৃপক্ষ। বীমা আইনের ৯৫ ধারায় প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারে কর্তৃপক্ষ।

সূত্র মতে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা তহবিল তছরুপের প্রমাণ উঠে আসে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র তদন্তে। বীমা আইনের ৪৮ ধারা অনুসারে এই তদন্ত করা হয়।

তবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের আত্মসাতকৃত অর্থ উদ্ধার এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বীমা আইনের ৫০, ৯৫ ও ১৩৬ ধারায় কোন ব্যবস্থা নেয়ার বিধান থাকলেও এসব ধারায় কোন পদক্ষেপ নেয়নি আইডিআরএ। বরং আত্মসাতকৃত অর্থ উদ্ধারের এই দায়ভার এড়িয়ে যেতে কোম্পানিকে মামলা করার নির্দেশ দিয়েই দায় সেরেছে বীমা খাতের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এদিকে আত্মসাতকৃত অর্থ উদ্ধারে বীমা আইনে সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্বেও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। কোম্পানিটির মদদে গতকাল (২৩ মার্চ) মানববন্ধন করা হয়েছে। এই মানববন্ধনে দোষীদের শাস্তি দিতে দাবি তোলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই মানববন্ধন করা হয়েছে গ্রাহকের চাপ সামলাতে। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি ফারইস্ট ইসলামী লাইফের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। ফলে আত্মসাতকৃত অর্থ উদ্ধারে বীমা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিয়ে মানববন্ধন করা উদ্দেশ্য প্রণোদিত কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আইডিআরএ’র ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুসারে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফে গ্রাহকদের বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ ২ হাজার ৩১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা এ খাতের মোট বকেয়া বীমা দাবির ৬৮ শতাংশ। বীমা কোম্পানিটির আরেকটি হিসাব অনুসারে, ২০২৬ সাল নাগাদ ফারইস্ট ইসলামী লাইফকে ৫ হাজার ৪শ’ ৬৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বীমা দাবি পরিশোধ করতে হবে।

এদিকে প্রতিদিনই ফারইস্ট ইসলামী লাইফের প্রধান কার্যালয়সহ সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ব্রাঞ্চ অফিসগুলোতে পাওনা টাকা আদায়ে ভীর করছেন গ্রাহকরা। অনেক সময়ই গ্রাহকদের আক্রমনের শিকার হচ্ছেন মাঠকর্মীরা। কখনোবা হামলা করা হচ্ছে শাখা অফিসে, কখনোবা মাঠকর্মকর্তার বাড়িতে।

অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দফায় দফায় পর্ষদ গঠন:

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের তহবিল থেকে ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা দফায় দফায় পরিচালনা পর্ষদ গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়। ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ অপসারণ করে নতুন ১০ জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ।

এরপর ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এই পর্ষদ ভেঙ্গে দিয়ে সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের দু’টি কোম্পানি পরিচালক নিয়োগ করে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে বিএসইসি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পট পরিবর্তনের পর উদ্যোক্তা পরিচালক ফখরুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়েছে বীমা কোম্পানিটিতে।

যেসব মামলা করা হয়েছে অর্থ আত্মসাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে:

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের অর্থ আত্মসাকারীদের বিরুদ্ধে বীমা আইন অনুসারে মামলা করা হয়নি। প্রচলিত আইন অনুসারে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় ৪টি ফৌজদারি মামলা করা হয়। মামলার বাদি ছিলেন কোম্পানিটির আইন কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন। অপরদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে ৩টি মামলা করা হয়।

এসব মামলায় আসামি করা হয়, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক কে এম খালেদ, অডিট কমিটির চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খালেদ, পরিচালক এম এ খালেক, পরিচালক মো. মিজানুর রহমান, পরিচালক ফরিদউদ্দিন এফসিএ, পরিচালক আসাদ খান, কোম্পানি সেক্রেটারি সৈয়দ আবদুল আজিজ এবং অপসারিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহ।

এসব মামলায় কয়েক দফায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের দায়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও সাবেক পরিচালক এম এ খালেক কারাবন্দি হন। এর মধ্যে নজরুল ইসলাম জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। তবে দফায় দফায় কারাগারে গেলেও উদ্ধার হয়নি আত্মসাৎ করা একটি টাকাও।

বীমাকারীর সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে যা বলছে বীমা আইনের ১৩৬ ধারা:

লাইফ ফান্ডের টাকা তছরুপ হলে বা কোন ব্যক্তি তা অবৈধভাবে দখলে রাখলে অথবা অন্য কোন উপায়ে লাইফ ফান্ডের তহবিল ঘাটতি হলে সেই টাকা উদ্ধারে বিধান রাখা হয়েছে বীমা আইনের ১৩৬ ধারায়। এই আইনে মামলা দায়েরের বিধান রাখা হয়েছে উচ্চ আদালতে।

উচ্চ আদালত মামলা দায়েরের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে মনে করলেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে পারেন। সেই সাথে যত দিন অর্থ উদ্ধার না হচ্ছে তার ক্ষতিপূরণও নির্ধারণ করার এখতিয়ার দেয়া হয়েছে আদালতকে।

আইনে আরো বলা হয়েছে, যে সময়ে বা যে মেয়াদে লাইফ ফান্ডের তহবিল ঘাটতি হবে সেই মেয়াদে পরিচালনা পর্ষদে থাকা সকল ব্যক্তি এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে থাকা সকল ব্যক্তি তহবিল ঘাটতির দায়ে অভিযুক্ত হবেন। কোন ব্যক্তি নির্দোষ হলে তার নিজেকেই প্রমাণ করতে হবে- তহবিল ঘাটতির সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

যেভাবে আত্মসাৎ হয়েছে ফারইস্টের ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা:

ফারইস্ট ইসলামী লাইফে ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকার তহবিল তসরুফ হয়েছে। যার মধ্যে ২ হাজার ৩৬৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা তসরুফ করা হয়েছে বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে জমি ক্রয় ও উন্নয়ন দেখিয়ে, এমটিডিআর বন্ধক রেখে পরিচালক ও তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া এবং ক্ষতিকর বিনিয়োগ করে। বাকি ৪৩২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা তসরুফ করা হয়েছে পরিচালনাগত ত্রুটি ও অনিয়ম করে।

এ বিপুল পরিমাণ টাকা তসরুফের জন্য দায়ী করা হয়েছে বীমা কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামসহ সকল পরিচালক ও সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহকে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এই তদন্তের জন্য ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল তদন্তকারী হিসেবে চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস সিরাজ খান বসাক এন্ড কো. কে নিয়োগ করে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালের ১৮ মে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র কাছে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

আত্মসাতকৃত অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে যা বলছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কোম্পানি:

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক (নন-লাইফ) ও মুখপাত্র মো. সোলায়মান ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’কে বলেন, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের আত্মসাতকৃত টাকা উদ্ধারে বীমা আইনের ১৩৬ ধারায় মামলা করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কিনা বিষয়টি এই মুহুর্তে আমার জানা নেই; খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে।

তবে গত ১৭ মার্চ ফারইস্ট ইসলামী লাইফসহ ৬টি লাইফ বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সাথে বৈঠক করেছে কর্তৃপক্ষ। ওই বৈঠকে কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকের বকেয়া বীমা দাবি দ্রুত পরিশোধের জন্য ৩ মাসের একটি পরিকল্পনা জানাতে বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনা ১০ দিনের মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দাখিল করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুসারে ৬টি লাইফ বীমা কোম্পানি ৫ শতাংশের নিচে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ করেছে। কোম্পানিগুলো হলো- ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, বায়রা লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, সানলাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ ও পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি।

এসব বিষয় নিয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামের মতামত জানার চেষ্টা করে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি। তবে তাকে না পাওয়ায় এ বিষয়ে মতামত নেয়া সম্ভব হয়নি।