১২০ কোটি টাকার অস্তিত্বহীন সম্পদ রুপালী লাইফের, ঘাটতি ৯৮ কোটি

আবদুর রহমান আবির: ২০২৪ সালে রুপালী লাইফ সম্পদ দেখায় ৬১৮ কোটি টাকার। এর মধ্যে ১২০ কোটি টাকার সম্পদের অস্তিত্ব নেই। এই সম্পদকে লাইফ ফান্ড ধরে ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকা সারপ্লাস দেখানো হয়েছে। আবার ডিভিডেন্ডও দেয়া হয়েছে।

অথচ অস্তিত্বহীন ১২০ কোটি টাকার এই সম্পদকে লাইফ ফান্ড থেকে বাদ দেয়া হলে কোম্পানির ঘাটতি দাঁড়ায় ৯৮ কোটি টাকা। বীমা কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পাওয়া গেছে এমন তথ্য।

পর্যালোচনা অনুসারে, অস্তিত্বহীন এসব সম্পদ দেখানো হয়েছে- আউটস্ট্যান্ডিং প্রিমিয়াম, এজেন্ট ব্যালান্স, দেউলিয়া ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানিতে আটকে থাকা আমানত ও অন্যান্য কয়েকটি খাতে।

রূপালী লাইফের ২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে মোট লাইফ ফান্ড দেখানো হয়েছে ৪৯৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর বিপরীতে পলিসি গ্রাহকের দায় দেখানো হয়েছে ৪৭২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এই হিসাবের ভিত্তিতে কোম্পানিটি ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকা সারপ্লাস দেখিয়েছে।

আর যদি এই অস্তিত্বহীন ১২০ কোটি টাকার সম্পদকে লাইফ ফান্ড থেকে বাদ দেয়া হয় তাহলে প্রকৃত লাইফ ফান্ড দাঁড়ায় ৩৭৭ কোটি টাকা। পলিসি গ্রাহকদের দায়ের সাথে সমন্বয় করা হলে প্রকৃত ঘাটতি দাঁড়ায় ৯৮ কোটি টাকা।

হিসাববিদদের মতে, অস্তিত্বহীন সম্পদের হিসাব দিয়ে সারপ্লাস হিসাব করা বেআইনি। এই ধরনের কাল্পনিক সারপ্লাস শেয়ারহোল্ডার ও পলিসিগ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে। অপরদিকে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরুপন করা যায় না। ফলে কোম্পানির তহবিল আকষ্মিকভাবে শূন্য হয়ে পড়ে।

এজেন্টদের হাতে গ্রাহকের ২৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা

গ্রাহকরা প্রিমিয়াম দিয়েছে এজেন্টদের কাছে। কিন্তু এজেন্টরা সেই টাকা কোম্পানির তহবিলে জমা না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। অপরদিকে এজেন্টের হাতে থাকা এই টাকা রপালী লাইফ আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদর্শন করেছে “এজেন্ট ব্যালান্স’ হিসেবে। আবার এজেন্ট হাতে থাকা এই টাকা অর্থাৎ অনাদায়ী এই টাকা সম্পদ হিসেবে ধরে কোম্পানির সারপ্লাস হিসাব করে লভ্যাংশ নিয়েছে রুপালী লাইফের পরিচালকরা।

২০১৭ থেকে ২০২৪ এই ৭ বছরে “এজেন্ট ব্যালান্স” খাতে মোট দেখানো হয়েছে ২৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে- ২০১৭ সালে ৭ কোটি ৭২ লাখ, ২০১৮ সালে ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, ২০১৯ সালে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, ২০২০ সালে ৩ কোটি ৬৯ লাখ, ২০২১ সালে ৪ কোটি  ৮ লাখ টাকা।

ব্যাংক থেকে উধাও ৪৪ কোটি টাকা!

২০২৪ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে রূপালী লাইফ তাদের ব্যাংক জমা দেখিয়েছে ৯১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর মধ্যে এসটিডি হিসাবে ছিল ৬৯ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং চলতি হিসাবে ২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

তবে নিরীক্ষক দলের (অডিটর) বাস্তব অনুসন্ধানে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মিলেছে মাত্র ৪৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ফলে বাকি ৪৪ কোটি টাকার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বা বৈধ নথিপত্র খুঁজে পায়নি নিরীক্ষকেরা।

এই বিশাল আর্থিক গরমিল ও নথিপত্রের ঘাটতির বিষয়টি নিরীক্ষক দল তাদের 'কোয়ালিফাইড ওপিনিয়নে' আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছে। শুধু ২০২৪ সালই নয়, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়েও ব্যাংক জমার স্থিতি নিয়ে বারবার একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

ক্যাশ ইন হ্যান্ডে ১৬.৪৫ কোটি টাকার স্থিতি নিয়ে প্রশ্ন

রূপালী লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ক্যাশ ইন হ্যান্ড খাতে ২০১৬ সালে ছিল ৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর পর প্রতিবছরই তা বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে ক্যাশ ইন হ্যান্ডের পরিমান দাঁড়ায় ১৬.৪৫ কোটি টাকা। অথচ এই টাকা কার হাতে নগদ রয়েছে তার কোনো বিস্তারিত বিবরণ নেই আর্থিক প্রতিবেদনে। এমনকি কোনো ব্যাখ্যাও নেই।

হিসাববিদদের মতে, এই হিসাব কোনোভাবে স্বাভাবিক নয়। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ না করে হাতে নগদ হিসেবে দেখানোর যৌক্তিকতাও নেই। তাদের মতে, অন্য খাতে অর্থ সরিয়ে নিতে বা তহবিল থেকে এই টাকা আত্মাসাৎ করে  ক্যাশ ইন হ্যান্ড খাতে দেখানো হতে পারে।

১৪৪ কোটি টাকা নবায়ন প্রিমিয়ামের ৭৪ কোটি টাকাই বকেয়া

লাইফ বীমা কোম্পানি ১ জানুয়ারি মাসকে ব্যবসা শুরুর তারিখ ও ৩১ ডিসেম্বরকে ব্যবসা সমাপনীর তারিখ ধরে আর্থিক প্রতিবেদনে আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব প্রদর্শন করে। কিন্তু নবায়ন প্রিমিয়াম জমা নিতে পারে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। এর কারণ আইন অনুসারে একজন গ্রাহক তার নবায়ন প্রিমিয়াম জমার জন্য নির্ধারিত তারিখের পর আরো একমাস অনুগ্রহকাল পেয়ে থাকেন।

ফলে যেসব গ্রাহক অনুগ্রহকালের এই এক মাসে যে পরিমাণ নবায়ন প্রিমিয়াম জমা দিতে পারেন সেই পরিমাণ নবায়ন প্রিমিয়ামকে সম্ভাব্য আয় ধরে তা আর্থিক প্রতিবেদনে আউটস্ট্যান্ডিং প্রিমিয়াম হিসেবে প্রদর্শন করা হয় এবং তা পরবর্তীতে ডিসেম্বর মাসে সমাপনী হিসাবের সাথে সমন্বয় করা হয়।

রুপালী লাইফ ২০২৪ সালে মোট নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে ১৪৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। যার মধ্যে আউটস্ট্যান্ডিং প্রিমিয়াম ৭৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। যা মোট নবায়ন প্রিমিয়ামের ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ এই ৭৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা নবায়ন প্রিমিয়াম আসবে পুরো জানুয়ারি মাসে। এটা ছিল অস্বাভাবিক। আর এই অস্বাভাবিকতার প্রমাণ পাওয়া যায় বকেয়া থেকে কত টাকা আদায় হয়েছিল তার হিসাব থেকে।

রুপালী লাইফ যে পরিমাণ প্রিমিয়াম আউটস্ট্যান্ডিং দেখিয়েছে তা থেকে ওই বছরের আদায় হয়েছে ৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা বা ৬২ শতাংশ। বাকী ২৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা আদায় হয়নি। অথচ আদায় না হওয়া এই ২৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয় ধরেই লাইফ ফান্ড ও সারপ্লাস হিসাব করা হয়েছে।

পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রুপালী লাইফ ২০২৪ সালে লাইফ ফান্ড দেখিয়ে ৪৯৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আর গ্রাহকের দায় দেখিয়েছে ৪৭২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এই হিসেবে সারপ্লাস দেখিয়েছে ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

কিন্তু অনাদায়ী ২৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা নবায়ন প্রিমিয়াম আয় হিসেবে ধরা না হলে তার ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ কোটি টাকা। এই হিসাব করা হয়েছে গড়ে ১০ শতাংশ নবায়ন কমিশন বাদ দিয়ে।

অথচ প্রিমিয়াম আয়ের ভুয়া হিসাব দিয়ে ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকা সারপ্লাস দেখিয়ে ১০ শতাংশ ডিভিডেন্ড নিয়েছেন পরিচালকরা।

আইন লঙ্ঘন করে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাব: হিসাবে কম ৩২ কোটি টাকা

আইনে বলা হয়েছে, ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসাব করতে হলে কোম্পানির মূলধনজনিত ব্যয়ের যথার্থ অংশ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটি বলা হয়েছে বীমা আইন ২০১০ এর ৬২(২) ধারায়। কিন্তু রুপালী লাইফ ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসাব করেছে মূলধনজনিত ব্যয় বাদ দিয়ে। এই মূলধনজনিত ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে- অবচয়, ফেয়ার ভ্যালু, শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত লোকসান ইত্যাদি।

রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা খাতে মোট ব্যয় দেখিয়েছে ৭৭৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অথচ মূলধনায়িত ব্যয় ধরে ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসাব করা হলে রুপালী লাইফের মোট ব্যবস্থাপনা ব্যয় হবে ৮০৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এই হিসেবে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাবে ধরা হয়নি ৩২ কোটি টাকার মূলধনজনিত ব্যয়ের অংশ।

আর এভাবেই আইন লঙ্ঘণ করে হিসাব দিয়ে গোপন করা হয়েছে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের অনুমোদিত সীমার তথ্য।

আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ৩ কোটি ২২ লাখ টাকার মূলধনজনিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাবে ধরেনি। বেআইনিভাবে এই হিসাব দিয়ে ওই বছরে অনুমোদিত সীমার চেয়েও ৪৮ লাখ টাকা কম ব্যয় প্রদর্শন করেছে রুপালী লাইফ।

দেউলিয়াপ্রায় চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ .১৬ কোটি টাকা, করা হয়নি প্রভিশন

দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে থাকা এবং দেউলিয়াত্বের ঝুঁকিতে থাকা চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিনিয়াগ রয়েছে মোট ৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা।    

তথ্য অনুযায়ী, রূপালী লাইফের বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এন্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডে ৮৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, পিপলস লিজিং এন্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডে ১ কোটি ৭১ লাখ ২৯ হাজার টাকা, প্রিমিয়ার লিজিং এন্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডে ৫০ লাখ টাকা এবং ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডে ৩ কোটি ৫ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।

এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এন্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড এবং পিপলস লিজিং এন্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠান দুটিতে রূপালী লাইফের মোট বিনিয়োগ রয়েছে ২ কোটি ৬০ লাখ ২৪ হাজার টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটি চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে গেলে রূপালী লাইফ সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা ফেরত পেতে পারে। ফলে বাকি প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ অনাদায়ী থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়লে বা আদায়ের অনিশ্চয়তা দেখা দিলে তার বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু রূপালী লাইফ এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের বিপরীতে কোনো প্রভিশন রাখেনি। বরং এসব বিনিয়োগকে কার্যকর সম্পদ হিসেবে দেখিয়ে কোম্পানির আর্থিক অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বছরের পর বছর বকেয়া ২৮ লাখ টাকা, উদ্ধারে নেই কার্যকর ব্যবস্থা

আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী রূপালী লাইফের মাঠকর্মী ও কর্মকর্তাদের কাছে ২৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বা সমন্বয়হীন অবস্থায় রয়েছে। অগ্রিম বেতন ভাতা, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল ও মোবাইল ক্রয়ের জন্য এসব অর্থ অগ্রিম প্রদান করা হয়েছে। এই অগ্রিমের বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই। এই অগ্রিম আদৌ প্রদান করা হয়েছিল কিনা, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আটকে থাকা এসব টাকা উদ্ধারে প্রয়োজনীয় কার্যকর কোন উদ্যোগ নেয়নি রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এমনকি এসব টাকা আদায়ের সম্ভাবনা না থাকলেও এর বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়নি প্রয়োজনীয় প্রভিশন (সঞ্চিতি), যা আন্তর্জাতিক হিসাব মান- আইএএস ৯ এর লঙ্ঘন।

দুর্বল চার ব্যাংকে ৮.৫১ কোটি টাকার বিনিয়োগ, সম্পদ বেশি দেখাতে করা হয়নি প্রভিশন

দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট এবং দেউলিয়াত্বের ঝুঁকিতে থাকা চারটি ব্যাংকে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিনিয়াগ রয়েছে মোট ৮ কোটি ৫১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা এবং আটকে থাকা এসব অর্থ উদ্ধারের অনিশ্চয়তা নিয়ে বাজারে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও এসব অর্থের বিপরীতে কোনো প্রভিশন রাখেনি বীমা কোম্পানিটি।

বরং এসব অর্থকে কার্যকর বিনিয়োগ হিসেবে দেখিয়ে সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং কোম্পানির আর্থিক অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ২ কোটি ৪৭ লাখ ১১ হাজার টাকা; ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা; সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৫ কোটি ৬৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংকে ৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে রূপালী লাইফের।

নিয়ম অনুযায়ী আদায় অযোগ্য এই অর্থের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন (সঞ্চিতি) সংরক্ষণ না করে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স আন্তর্জাতিক হিসাব মান- আইএএস ৯ এর লঙ্ঘন করেছে।

ডরম্যান্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৬৫ লাখ টাকা, হদিস নেই ৩৫ লাখের

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান বসু ব্যানার্জি নাথ এন্ড কোং বলেছে, রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের একাধিক ব্যাংক হিসাব দীর্ঘদিন ধরে ডরম্যান্ট অবস্থায় রয়েছে। ওই ব্যাংক হিসাবগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো ধরনের লেনদেন (টাকা জমা দেয়া, তোলা বা স্থানান্তর) করা হয়নি।

কোম্পানিটির ২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে ডরম্যান্ট অবস্থায় থাকা একাউন্টগুলোতে ৬৪.৭৬ লাখ টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত পরিমাণ পাওয়া গেছে ২৯.৪৮ লাখ টাকা। বাকি ৩৫.১৮ লাখ টাকার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।  শুধু তাই নয়, এই অর্থ ব্যাংক জমা ও প্রিমিয়াম -এই উভয় খাতেই দেখানো হয়েছে।

রিনিউয়াল এক্সপেন্স রেশিওতে তথ্য গোপনের অভিযোগ

আর্থিক প্রতিবেদনে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ ব্যয়ের হার বাস্তবের তুলনায় কম দেখিয়েছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ বাবদ ব্যয়ের হার দেখিয়েছে সর্বনিম্ন ৬.০৮ থেকে সর্বোচ্চ ১০.২২ শতাংশ।

এক্ষেত্রে কোম্পানিটি নবায়ন খরচ দেখিয়েছে গড়ে ৭.০৪ শতাংশ।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নবায়ন প্রিমিয়ামের জন্য ব্যয়ের প্রকৃত হার ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গড়ে ১৪.৯০ শতাংশ। এরমধ্যে সর্বনিম্ন খরচ হয়েছে ২০১৬ সালে, ১১.৪৩ শতাংশ। আর সর্বোচ্চ নবায়ন খরচ হয়েছে ২০১৯ সালে, ১৯ শতাংশ।

নবায়ন প্রিমিয়ামের ওপর ব্যয়ের হার গড়ে ৭.৮৫ শতাংশ কম দেখিয়ে তথ্য গোপন করেছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

জমিতে অগ্রিম ৩.৭২ কোটি টাকা, ৮ বছর ধরে নেই কোন মুনাফা

রূপালী লাইফ হসপিটাল তৈরির জন্য জমি কিনতে ৩ কোটি ৭২ লাখ ৬০ হাজার টাকা অগ্রিম প্রদান করা হয়। রাজউক পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের এই জমির মূল্য ধরা হয় প্রতি কাঠা ১৫ লাখ টাকা। জমি কেনার কথা ছিল ৩ একর। এই জমি এখন পর্যন্ত রাজউক থেকে বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। আবার আইডিআরএ’র কোন অনুমোদন নেই। এই টাকা ফেরত নেয়া বা উদ্ধারের কোন উদ্যোগ নেয়নি কোম্পানিটি।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অগ্রিম প্রদান করা হয় ২০১৮ সালে। এই হিসাবে ৮ বছর ধরে বিনিয়োগ পড়ে আছে এই টাকা। তবে নেই কোন মুনাফা। 

বীমা আইন অনুসারে, গ্রাহকের জমাকৃত প্রিমিয়ামের টাকা লোকসান হবে এমন কোন খাতে বিনিয়োগ করা যাবে না।

লাইফ ফান্ড ক্রমাগত কমছে, বাড়ছে গ্রাহকের নিকট দায়

২০২২ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে লাইফ ফান্ড কমছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের। অথচ পলিসিহোল্ডারদের প্রতি দায় বেড়েই চলেছে বীমা কোম্পানিটির। বিষয়টি ভবিষ্যত পলিসি গ্রাহকদের স্বার্থের জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে কোম্পানিটির মোট লাইফ ফান্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৯৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যা ২০২২ সালে ছিল ৫০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড কমে যাওয়ার এই প্রভাব সরাসরি পড়েছে গ্রাহকদের পলিসি বোনাসের ওপর। এক সময় প্রতি হাজার টাকায় ৫৫ টাকা পলিসি বোনাস দেয়া হলেও ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ টাকায়।

কমছে বিনিয়োগ, নেই তদারকি: ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বীমা গ্রাহক

কোম্পানিটির সামগ্রিক বিনিয়োগ চিত্রেও শুরু হয়েছে নেতিবাচক ধারা। ২০২২ সালে কোম্পানির মোট বিনিয়োগ ছিল ৩০৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। তবে ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮৫ কোটি ৩ লাখ টাকায়। অর্থাৎ গত দুই বছরে কোম্পানিটির মোট বিনিয়োগ কমেছে ২৪ কোটি ৯ লাখ টাকা বা ৭.৭৯ শতাংশ।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রিমিয়াম ব্যাংক জমার যথাযথ তদারকি বা মনিটরিং না হওয়ার কারণেই এমনটা ঘটেছে। লাভজনক খাতে বিনিয়োগ না করে বিশাল অংকের অলস অর্থ ব্যাংকে ফেলে রাখায় বিনিয়োগের উন্নতির চেয়ে বরং অবনতি হয়েছে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ বীমা গ্রাহকদের।

শেয়ারবাজারে টানা ৮ বছর লোকসান, গোপন করতে অন্যান্য আয়ের সাথে সমন্বয়

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থেকে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একবারও লাভ করতে পারেনি কোম্পানি। বরং আট বছরে মোট ৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু বছর এই লোকসান সরাসরি দেখানো না হয়ে অন্যান্য আয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত চিত্র আড়াল থাকে।

২০১৭ এবং ২০১৮ সালে ক্ষতির অর্থ হিসাবে না দেখিয়ে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য ফান্ডের ডিভিডেন্ড প্রাপ্তি থেকে সমন্বয় করে দেখানো হয়েছে। যাতে প্রকৃতপক্ষে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের ক্ষতি দৃশ্যমানভাবে বুঝা না যায়। এটি বিনিয়োগকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের নিকট আর্থিক প্রতিবেদন প্রদর্শনের মূলনীতির পরিপন্থী।

যা বলছে রূপালী লাইফ:

রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) মিঠুন চন্দ্র পালইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডিকে কোম্পানির বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তিনি দাবি করেন, রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উত্থাপিত আপত্তির বিষয়গুলোও সমাধান হয়েছে।

আউটস্ট্যান্ডিং প্রিমিয়াম ও এজেন্ট ব্যালান্সের বিষয়ে তিনি বলেন, বকেয়া (আউটস্ট্যান্ডিং) প্রিমিয়াম থেকে ইতোমধ্যে ৪৬ কোটি টাকা আদায় হয়েছে এবং বাকি টাকাও দ্রুত আদায়ের প্রক্রিয়া চলছে। মাঠ পর্যায়ে এজেন্ট তৈরি ও ধরে রাখার জন্য পূর্বে তাদের বাড়তি সুবিধা দেয়া হতো, যা এখন বন্ধ করা হয়েছে এবং এজেন্ট ব্যালান্সের অর্থ উদ্ধারে ৪০টির বেশি মামলা করা হয়েছে।

এছাড়াও যেসব কর্মকর্তা-কর্মীকে বেতনসহ বিভিন্ন খাতে অগ্রিম দেয়া হয়েছে তা আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। অগ্রিম প্রদানকৃত অর্থ আদায় না হলে নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয় করা হবে। তবে এখনো এসব টাকা আদায়ের সম্ভাবনা আছে তাই প্রভিশন করা হয়নি।

বিনিয়োগ ও শেয়ার বাজারের বিষয়ে মিঠুন চন্দ্র পাল বলেন, দুর্বল ব্যাংক থেকে কিছু অর্থ উদ্ধার হয়েছে, বাকি টাকা আদায়ে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। ফার্স্ট ফাইন্যান্স স্কিমের বিনিয়োগ নিরাপদ আছে। ইন্টারন্যাশনালের বিনিয়োগ ২০২৫ সালে প্রভিশন করা হয়েছে। শেয়ার বাজারের লোকসান ২০২৪ সালের 'ফেয়ার ভ্যালু চেঞ্জ'-এ নিয়ম মেনেই সমন্বয় করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ব্যাংক হিসাবের সাময়িক অমিল কোনো জালিয়াতি নয়, এটি চেক নগদায়নের সময়ের ব্যবধান এবং নিয়মিত ব্যাংক রিকনসিলিয়েশনের মাধ্যমে সমাধান করা হয়। আইডিআরএর নিয়ম ও আইনি বাধ্যবাধকতা মেনেই ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও ক্যাশ ইন হ্যান্ড হিসাব করা হয়েছে। ২০২৫ সালে কোম্পানির সার্বিক ফান্ড ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রাহকদের বীমা দাবি যথাসময়ে পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা কোম্পানির রয়েছে।