ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যানসহ ৫ পরিচালকের পদ শূন্য!

প্রকাশিত: ৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম

আবদুর রহমান আবির: ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকনসহ ৪ জন পরিচালক পরপর ৩টি বোর্ড সভায় অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত ছিলেন। কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এর ১০৮ ধারা অনুসারে কোনো পরিচালক পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া পরপর ৩টি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকলে তার পদ শূন্য হয়।

পর্ষদে এই ৩টি সভা হলো- ২৪৬, ২৪৭ ও ২৪৮তম সভা। সভাগুলো অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ১৪ আগস্ট এই চার মাসে।

সাঈদ খোকন ছাড়া অন্য ৪ পরিচালক হলেন- পরিচালক আয়েশা নিভ্রাস সাঈদ, ফাতিমা নওশিন মায়শা সাঈদ অরোরা ও রিফা নানজিবা সাঈদ। এই তিনজনই চেয়ারম্যান আলহাজ সাঈদ খোকনের মেয়ে। অপর একজন পরিচালক হলেন কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদের স্ত্রী মাহমুদা নাসিম।

অথচ ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ছাড়া বাকি ৪ পরিচালকের অনুপস্থিতির কোনো তথ্য আইডিআরএ’র নিজস্ব তদন্ত দলের প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হকের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসেনি। ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডির অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে আসে।

এই অনুসন্ধানে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের ২৪৬তম, ২৪৭তম ও ২৪৮তম সভার কার্যবিবরণী এবং হাজিরা শীটে পরিচালকদের প্রদত্ত স্বাক্ষর এবং আইডিআরএ’র তদন্ত প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক এন্ড কোং এর তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়।

সাঈদ খোকনের বোর্ড সভায় অনুপস্থিতি: আইডিআরএ’র তদন্তে অনুপস্থিত, মাহফেল হকের তদন্তে ছুটি নেয়ার প্রমাণ নেই

ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের বোর্ড সভা অনুষ্ঠানে কোনো অনিয়ম করা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে ২ সদস্যের তদন্ত দল গঠন করে আইডিআরএ। তদন্ত দল গঠন করা হয় ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট। তদন্ত দল প্রতিবেদন দাখিল করে ১৭ সেপ্টেম্বর। আইডিআরএ’র উপ-পরিচালক মো. সোলায়মানকে দল নেতা করে গঠিত ওই কমিটির অপর সদস্য হলেন আইডিআরএ’র কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান।

আইডিআরএ গঠিত ২ সদস্যের তদন্ত দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানির চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ওই তিনটি বোর্ড সভায় ব্যক্তিগত কারণে উপস্থিত হতে পারেননি। এর মধ্যে ২৪৬তম সভায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকায় সভাপতিত্ব করেন আলহাজ মো. ইসমাইল নবাব। ২৪৭ ও ২৪৮তম সভায় সভাপতিত্ব করেন ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ।

তবে সাঈদ খোকনের ব্যক্তিগত কারণে উপস্থিত না থাকার বিষয়টি বোর্ড অনুমোদন করেছে কিনা সে বিষয়ে কোনো মতামত দেয়নি আইডিআরএ’র তদন্ত দল।

আইডিআরএ’র তদন্তের পরে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক এন্ড কোং-কে নিয়োগ করে আইডিআরএ। মাহফেল হককে নিয়োগ করা হয় গত বছর অক্টোবরে। চলতি বছর ১৫ মার্চ মাহফেল হক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

মাহফেল হকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকন পরপর ৩টি বোর্ডসভায় অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত ছিলেন। এই ৩টি সভায় অনুপস্থিত থাকার জন্য তার ছুটি মঞ্জুর করা হয়নি। অর্থাৎ তার অনুপস্থিত থাকাকে অনুমোদন করেনি পর্ষদ।

কোম্পানির আইন ১৯৯৪ এর ধারা ১০৮ এর (১) (চ) এবং কোম্পানির আর্টিকেলস অব এসোসিয়েশন (এওএ)-এর অনুচ্ছেদ ৯০(৬) অনুযায়ী কোনো পরিচালক অনুমোদন ছাড়া পরপর ৩টি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকলে তার পদ শুন্য হয়। এই প্রেক্ষিতে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের পদ শূন্য হবে কি না- সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে কর্তৃপক্ষ।

পরিচালকের অনুপস্থিত থাকার কোনো তথ্য নেই আইডিআর মাহফেল হকের তদন্তে 

ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে দেখা যায়, চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের ৩ মেয়ে শেয়ারহোল্ডার পরিচালক আয়েশা নিভ্রাস সাঈদ ও ফাতিমা নশিন মায়শা সাঈদ অরোরা এবং রিফা নানজিবা সাঈদ কেউ ২৪৬ থেকে ২৪৮তম এই ৩টি সভায় উপস্থিত ছিলেন না।  

এছাড়া কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদের স্ত্রী মাহমুদা নাসিমও পরপর ৪টি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন।  তাদের অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের কোনো অনুমোদন ছিল না।

ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র এই অনুসন্ধানে পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী ও হাজিরা খাতার প্রদত্ত স্বাক্ষর পর্যালোচনা করা হয়।

অথচ এই চার পরিচালকের অনুপস্থিতির কোনো তথ্য উঠে আসেনি আইডিআরএ’র তদন্ত দল ও আইডিআরএ’র নিয়োগকৃত মাহফেল হকের তদন্ত প্রতিবেদনে।

ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডির অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২৪৬ ও ২৪৭তম সভর কার্যবিবরণী অনুসারে মাহমুদা নাসিম উপস্থিত ছিলেন। অথচ হাজিরা শীটে মাহমুদা নাসিমের নামে পাশে স্বাক্ষর করেছেন কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ।

আবার ২৪৮তম সভার হাজিরা শীটে মাহমুদা নাসিমের উপস্থিতি দেখানো হয়। অথচ হাজিরা খাতার স্বাক্ষরের সাথে মাহমুদা নাসিমের অন্যান্য সভার হাজিরা শীটে দেয়া স্বাক্ষরের কোনো মিল নেই। সবমিলিয়ে মাহমুদা নাসিমও পরপর ৩টি বোর্ড সভায় উপস্থিত ছিলেন তার সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই।

স্ত্রীর হাজিরায় স্বামীর স্বাক্ষর: আইডিআরএবলছে প্রক্সি, আইন বলছে জালিয়াতি

দন্ডবিধির ৪৬৮ ধারা অনুসারে একজনের স্বাক্ষর অন্যজন দেয়া জালিয়াতি। এমনকি পাওয়ার অব এটর্নি ছাড়া একজনের পক্ষে অপরজন স্বাক্ষর করাও জালিয়াতি।

অথচ ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের বোর্ড সভায় হাজিরায় পরিচালক মাহমুদা নাসিমের স্বাক্ষর দেন তার স্বামী ও কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ। এই জালিয়াতির স্বাক্ষরকে আইডিআরএ’র তদন্তে বলা হয় ‘প্রক্সি’।

অথচ “প্রক্সি স্বাক্ষর” বলে কোনো শব্দই নেই। এক জনের উপস্থিতির স্বাক্ষর অপরজন দিলে প্রচলিত আইনে তা জালিয়াতি বা প্রতারনার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি।

দন্ডবিধির ৪৬৮ ধারা অনুসারে, এ ধরণের অপরাধের জন্য ৭ বছরে কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

তাই মাহমুদা নাসিমের পরিবর্তে তার স্বামী নুর মোহাম্মদের স্বাক্ষর দেয়াকে “প্রক্সি স্বাক্ষর” হিসেবে উল্লেখ করে আইডিআরএ জালিয়াতির মত গুরুতর অপরাধ পাশকাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে কি না- সে প্রশ্ন উঠেছে।

উদ্যোক্তা পরিচালকের অভিযোগ আইডিআরএ’র তদন্ত  

ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদের গঠন ও পর্ষদ সভার অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ করেন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের সাবেক ৬ উদ্যোক্তা পরিচালক। এই অভিযোগ তারা করেন ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর।  বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করা এই অভিযোগে দাবি করা হয়-

২০১২ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকেই তিনি নানা অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা করে আসছেন। তিনি পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ছাড়াই ১৩ বছর যাবৎ চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। তিনি ৬ জন উদ্যোক্তা পরিচালককে কোনো কারণ ছাড়াই পর্ষদ থেকে বাদ দিয়ে তিনি নিজের স্ত্রী, দুই মেয়ে শালীকা ও নিজ মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানকে পরিচালক করেছেন।

অভিযোগপত্রে আরো দাবি করা হয়, আলহাজ সাঈদ খোকন আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকে পলাতক রয়েছেন। অথচ তিনি চেয়ারম্যান পদে বহাল এবং অজ্ঞাত স্থান থেকে কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মবহির্ভূতভাবে সভা করে যাচ্ছেন ও আর্থিক সুবিধাদি নিচ্ছেন।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।

আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে আইডিআরএ’কে হাইকোর্টের নির্দেশ

ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশের পরিচালকদের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে আইডিআরএ’কে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী ২৬ অক্টোবরের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

কোম্পানি আইনের ২৩৩ ধারা অনুযায়ী দায়ের করা এক আবেদনের (কোম্পানি ম্যাটার নং-৭১৮/২০২৬) শুনানি শেষে গত ৯ জুলাই বিচারপতি মো. তৌফিক ইনামের বেঞ্চ এ আদেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন।

এর আগে গত ৩০ জুন কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালক গাজী বেলায়েত হোসেনসহ পাঁচজন পরিচালক আইডিআরএ’র কাছে অন্যান্য পরিচালকদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও করপোরেট সুশাসন লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন এবং বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনেন।

বিচারাধীন থাকায় মতামত দিল না কোম্পানি, আইডিআরএ বলছে ‘কার্যক্রম চলমান’

ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশের পর্ষদ সভা ও পরিচালক পদ সংক্রান্ত বিষয়ে কোম্পানিটির বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি। এর প্রেক্ষিতে কোম্পানির সেক্রেটারি চৌধুরী এহসানুল হক স্বাক্ষরিত এক লিখিত চিঠিতে জানানো হয়- উল্লিখিত বিষয়সমূহ বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থায় তদন্তাধীন ও পুনর্তদন্তাধীন রয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলাও বিচারাধীন।

চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, বিষয়গুলো আদালত ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিষ্পত্তাধীন থাকায় এ মুহূর্তে এ বিষয়ে কোন মতামত প্রদান করা সমীচীন হবে না।

অন্যদিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশের পর্ষদ সভা ও পরিচালক পদ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ, যা এখনো চলমান রয়েছে।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।