বাংলাদেশের বীমার ভবিষ্যৎ গড়ছেন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটরা

প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০২৬, ১১:১৫ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে বীমা খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু নতুন গ্রাহক বাড়ানো নয়, মানুষের আস্থা অর্জনও। আর সেই আস্থা গড়ে তুলতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন মাঠপর্যায়ের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটরা (এফএ)। তারা শুধু বীমা পলিসি বিক্রি করেন না।

মানুষের আর্থিক ঝুঁকি বুঝে উপযুক্ত বীমা পরিকল্পনা বেছে নিতে সহায়তা করেন। নিয়মিত পরামর্শ দেন। পলিসি চালু রাখতে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। প্রয়োজনের সময় দাবি (ক্লেইম) নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াতেও পাশে থাকেন। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ, সৎ ও প্রযুক্তি-সক্ষম ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটরাই হতে পারেন বাংলাদেশের বীমা খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রধান শক্তি।

এই চিত্র দেশের বীমা খাতের বর্তমান অবস্থাতেও স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বীমা প্রিমিয়াম জিডিপির প্রায় ০.৫ শতাংশ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এই হার কম। অর্থাৎ দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনও জীবন, স্বাস্থ্য ও সম্পদের বীমা সুরক্ষার বাইরে। তাই বীমার পরিধি বাড়ানো, মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং খাতটির প্রতি আস্থা তৈরি করতে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটদের ভূমিকা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের বীমা কোম্পানিগুলো ১৮ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে। ২০২৩ সালে এই অঙ্ক ছিল ১৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। এক বছরে প্রিমিয়াম বেড়েছে প্রায় ৭.৩ শতাংশ। তবে আগের কয়েক বছরের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি ধীর। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন পলিসি বিক্রি করলেই হবে না। পুরোনো গ্রাহকদের ধরে রাখা, নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করাও সমান জরুরি।

২০২৪ সালে মোট প্রিমিয়ামের ১২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা এসেছে লাইফ বীমা থেকে। আর ৬ হাজার ৫০২ কোটি টাকা এসেছে নন-লাইফ বীমা থেকে। অর্থাৎ মোট প্রিমিয়ামের প্রায় ৬৫ শতাংশ এসেছে লাইফ বীমা এবং ৩৫ শতাংশ এসেছে নন-লাইফ বীমা থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটরা নতুন গ্রাহক তৈরি করার পাশাপাশি পুরোনো গ্রাহকদের নিয়মিত সেবা দিতে পারলে এই খাত আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।

আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৮২টি বীমা কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি লাইফ বীমা এবং ৪৬টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বাড়লেও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি সক্রিয় গ্রাহকের সংখ্যা। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সক্রিয় লাইফ বীমা পলিসির সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৫ লাখ ৮৮ হাজার। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ। অর্থাৎ এক দশকের কিছু বেশি সময়ে ২৬ লাখের বেশি পলিসি তামাদি হয়েছে। এটি গ্রাহক ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, পলিসি তামাদির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অনেক গ্রাহক নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে পারেন না। আবার অনেকেই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পলিসি নির্বাচন করেন না। কোথাও বিক্রয়ের সময় পর্যাপ্ত তথ্য দেয়া হয় না। আবার বিক্রির পর গ্রাহকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রাখা হয় না। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে দেখা গেছে, বাংলাদেশের কিছু লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানে প্রথম বছরের পলিসি তামাদির হার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। তাই একজন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটের দায়িত্ব শুধু পলিসি বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রাহককে সঠিক তথ্য দেয়া, নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং পলিসি সচল রাখতে সহায়তা করাও তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

দাবি নিষ্পত্তির ধীরগতিও মানুষের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। আইডিআরএর তথ্য উদ্ধৃত করে একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৪ সালে লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো উত্থাপিত দাবির মাত্র ৩৪ শতাংশ নিষ্পত্তি করেছে। একই সময়ে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে বছরের প্রথম নয় মাসে দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। তাই একজন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটের দায়িত্ব শুধু পলিসি বিক্রি নয়। ক্লেইম দাখিল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণ পেতে গ্রাহককে সহায়তা করাও তার দায়িত্ব। এতে গ্রাহকের আস্থা বাড়ে এবং বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।

তবে এই পেশা সম্পর্কে এখনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয় না। দেশে মোট কতজন লাইসেন্সধারী ও সক্রিয় ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট আছেন, নারী-পুরুষের অনুপাত কী, একজন এফএ গড়ে কতটি পলিসি বিক্রি করেন বা মোট প্রিমিয়ামের কত অংশ তাদের মাধ্যমে আসে- এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশিত হয় না। ফলে এই পেশার প্রকৃত অবদান পরিসংখ্যানের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটদের দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নৈতিক বিক্রয়চর্চা, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের কর্মদক্ষতা ও অবদান সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও বাড়বে।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।