আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কানাডার দাবানল এখন শুধু বনাঞ্চলের সংকট নয়। আগুনে পুড়ছে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রেলপথ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ধোঁয়ার দূরপাল্লার প্রভাব। ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর সামনে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের বীমা দাবি।
দাবানলপ্রবণ এলাকা থেকে শত শত কিলোমিটার দূরেও সম্পত্তি, স্বাস্থ্য ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কানাডার বীমা ও পুনর্বীমা খাতের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
অন্টারিওর দাবানলের ধোঁয়া টরন্টো ছাড়িয়ে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছেছে। এতে সীমান্তের ওপারেও বায়ুদূষণ বেড়েছে। ভবিষ্যতে এসব এলাকা থেকেও সম্পত্তি, স্বাস্থ্য ও ব্যবসায়িক ক্ষতির বীমা দাবি বাড়তে পারে।
কানাডা সরকারের ১৬ জুলাইয়ের হিসাবে, ২০২৬ সালে দেশটিতে ৩ হাজার ১৩৭টি দাবানল হয়েছে। এর মধ্যে ৭৯৬টি আগুন সক্রিয় ছিল। ৬০টি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পূর্ণমাত্রায় চেষ্টা চললেও সেগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। মোট পোড়া এলাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর।
২০২৫ সালের একই সময়ে দাবানলের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯১৩টি। তখন পুড়েছিল ৪৬ লাখ ১৪ হাজার ৭১৩ হেক্টর এলাকা। অর্থাৎ ২০২৬ সালে আগুনের সংখ্যা বেশি হলেও সরকারি ওই হিসাবের তারিখ পর্যন্ত পোড়া এলাকা আগের বছরের তুলনায় কম ছিল।
পরিস্থিতি অবশ্য দ্রুত বদলেছে। ২০ জুলাই অন্টারিওতে পোড়া এলাকার পরিমাণ বেড়ে ৭ লাখ ৩৫ হাজার হেক্টরে পৌঁছায়, যা প্রায় ১৮ লাখ একরের সমান। তখন প্রদেশটিতে ১৯০টি সক্রিয় আগুন ছিল এবং প্রায় ১ হাজার ৮০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত ছিলেন। অন্টারিওর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকা দুর্গম হওয়ায় বিমান ছাড়া সেখানে পৌঁছানো কঠিন। নামায়গুসিসাগাগুন ফার্স্ট নেশনের বসতি প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। দাবানল মোকাবিলায় অন্টারিও সরকার ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণাও দিয়েছে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, আলবার্টা ও সাসকাচোয়ান বহুদিন ধরেই উচ্চ দাবানলঝুঁকির অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। তবে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি অন্টারিও, ম্যানিটোবা ও সাসকাচোয়ানেও বড় চাপ দেখা যাচ্ছে। উচ্চ তাপমাত্রা, দীর্ঘ খরা, কম আর্দ্রতা, বজ্রপাত এবং শুকনো গাছপালা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিটি দাবানলের সরাসরি কারণ না হলেও এটি তাপমাত্রা বাড়িয়ে এবং শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘ করে দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০২৬ সালের দাবানলে মোট বীমাকৃত ক্ষতি, মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি কিংবা পুনর্বীমা ব্রোকার এওন-এর নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্ষয়ক্ষতির পূর্বাভাস এখনো প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি শুধু জানিয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ ‘শত শত মিলিয়ন ডলার’ হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট অঙ্ক প্রকাশ না হওয়ায় এটিকে চূড়ান্ত পূর্বাভাস হিসেবে ধরা যাচ্ছে না। একইভাবে আগুন ও ধোঁয়ার কারণে ক্ষতির শতকরা হার, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জাতীয় মোট সংখ্যা এবং আবাসিক, বাণিজ্যিক ও ব্যবসা বন্ধ থাকার ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত দাবির পৃথক পরিসংখ্যানও এখনো প্রকাশিত হয়নি।
তবে আগের বছরের তথ্য থেকেই ঝুঁকির আকার স্পষ্ট হয়। ২০২৪ সালে কানাডায় চরম আবহাওয়াজনিত বীমাকৃত ক্ষতি রেকর্ড ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারে পৌঁছায়। এর মধ্যে শুধু বাণিজ্যিক খাতের বীমাকৃত ক্ষতিই ছিল ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। জুলাই ও আগস্টের চারটি বড় দুর্যোগে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয় এবং ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি বীমা দাবি জমা পড়ে। ২০২৫ সালে ক্ষতি কমে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও সেটি দেশটির ইতিহাসে দশম ব্যয়বহুল বছর।
বীমা দাবির বড় অংশ সাধারণত বাড়ি, যানবাহন ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির ক্ষতি থেকে আসে। পাশাপাশি ব্যবসা বন্ধ থাকা, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, রেল চলাচল বন্ধ হওয়া কিংবা খনি কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার কারণেও ক্ষতিপূরণের দাবি বাড়ে।
ধোঁয়াজনিত ক্ষতির দাবি নিষ্পত্তি তুলনামূলকভাবে আরও জটিল। কারণ ধোঁয়া দেয়াল, আসবাব, পণ্য, বায়ু চলাচল ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রে কতটা স্থায়ী ক্ষতি করেছে, তা নির্ধারণ করা সহজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে আগের দূষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যয়, বীমা নীতির ব্যতিক্রমী শর্ত এবং আগুনের সঙ্গে ক্ষতির সরাসরি সম্পর্ক নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। ফলে এসব দাবি নিষ্পত্তিতে বেশি সময় লাগতে পারে।
পুনর্বীমার ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকের ওপরও পড়ে। বীমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম বাড়াতে পারে এবং গ্রাহককে নিজে বহন করতে হয় এমন ক্ষতির পরিমাণও বাড়ানো হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বীমার শর্ত আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কানাডায় ২০২৫ সালে গৃহবীমার প্রিমিয়াম গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছিল। সরকার প্রস্তাবিত ৩৯ লাখ নতুন বাড়ির মধ্যে ২ লাখের বেশি উচ্চ দাবানলঝুঁকির এলাকায় নির্মিত হতে পারে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যবহারও বাড়ছে। দুর্যোগ বন্ড বড় দুর্যোগের ঝুঁকি পুঁজিবাজারে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। অন্যদিকে প্যারামেট্রিক বীমায় নির্ধারিত তাপমাত্রা, পোড়া এলাকা বা ধোঁয়ার মাত্রা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়। তবে এগুলো প্রচলিত ক্ষতিপূরণভিত্তিক বীমার বিকল্প নয়; বরং অতিরিক্ত সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
দাবানলের ধোঁয়ার সূক্ষ্ম পিএম-২.৫ কণা হাঁপানি, হৃদ্রোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়াতে পারে। এতে হাসপাতাল ও জরুরি বিভাগে রোগীর চাপও বৃদ্ধি পেতে পারে। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তবে ২০২৬ সালের দাবানলজনিত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর পৃথক জাতীয় পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।