আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পশ্চিমা দেশগুলোর বীমা ও পুনর্বীমা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে ব্রিকস। তবে এখনই নতুন কোনো ব্রিকস বীমা কোম্পানি চালু হচ্ছে না। লক্ষ্য হলো, বড় কোনো প্রকল্প বা দুর্ঘটনায় বিপুল ক্ষতি হলে সদস্যদেশগুলো যেন পুরোপুরি বিদেশি বীমা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণায় সদস্যদেশগুলোর বাণিজ্য সহায়তায় আরও ‘স্বনির্ভর বীমা ব্যবস্থা’ গড়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পুনর্বীমা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
পুনর্বীমা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বীমা কোম্পানি বড় ঝুঁকির একটি অংশ অন্য বীমা বা পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। এতে বড় অঙ্কের ক্ষতি হলে একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর পুরো চাপ পড়ে না।
ব্রিকসের পরিকল্পনার একটি অংশ হলো প্রস্তাবিত ‘ব্রিকস রেজিলিয়েন্স সেন্টার’। এটি সরাসরি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বীমা করবে না। বরং কোথায় কী ধরনের ঝুঁকি আছে, সম্ভাব্য ক্ষতি কত হতে পারে এবং তা কীভাবে সামলানো যায়- এসব বিষয়ে সদস্যদেশগুলো তথ্য, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ভাগাভাগি করবে। ভারতের গুজরাটের গিফট সিটিতে ‘ব্রিকস ঝুঁকি গবেষণাগার’ স্থাপনের প্রস্তাবও রয়েছে।
এর বাইরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ব্রিকসের জন্য আলাদা একটি বীমা ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেলসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে বীমা পেতে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাব এসেছে। তবে অর্থ কোথা থেকে আসবে, কে ঝুঁকি নেবে এবং ব্যবস্থা কীভাবে চলবে- এসব স্পষ্ট নয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১০ বিলিয়ন ডলার মূলধনের যৌথ ব্রিকস পুনর্বীমা কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পের ঝুঁকি নিতে পারে। তবে কোন দেশ কত অর্থ দেবে, মালিকানা কীভাবে ভাগ হবে এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কার কত থাকবে- তা এখনো ঠিক হয়নি।
ব্রিকসের বাণিজ্যের কত অংশ পশ্চিমা বীমা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল, তার নির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই। তবে বিশ্ববাজারে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান শক্ত। আন্তর্জাতিক পিঅ্যান্ডআই ক্লাবগুলো বিশ্বের প্রায় ৮৭ শতাংশ সমুদ্রগামী জাহাজের দায়বীমা দেয়। আবার ২০২৪ সালে সমুদ্রভিত্তিক তেল-গ্যাস খাতের বীমা প্রিমিয়ামের প্রায় ৬৭ শতাংশ ছিল যুক্তরাজ্যের বাজারে।
এ কারণে লন্ডন বা ইউরোপের বীমা ও পুনর্বীমা ব্যবসার বড় অংশ দ্রুত ব্রিকসের দিকে সরে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম। শুরুতে নতুন উদ্যোগটি সদস্যদেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত বীমা ও পুনর্বীমা সুবিধা তৈরি করতে পারে।
বাস্তবায়নের পথেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সদস্যদেশগুলোর বীমা আইন, হিসাবের নিয়ম, বিদেশে অর্থ পাঠানোর বিধান এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মানার পদ্ধতি এক নয়। ভবিষ্যৎ পুনর্বীমা চুক্তি কোন দেশের আইনে চলবে, বিরোধ কোথায় মেটানো হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কীভাবে নিরাপদ রাখা হবে- এসবও ঠিক করা বাকি।
প্রিমিয়াম কোন মুদ্রায় নেয়া হবে এবং দাবির টাকা ডলার, স্থানীয় মুদ্রা নাকি একাধিক মুদ্রায় পরিশোধ হবে, তাও স্পষ্ট নয়। দ্রুত ও নিরাপদ আন্তঃসীমান্ত অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা না থাকলে বড় বীমা দাবি পরিশোধে সমস্যা হতে পারে।
এখন পর্যন্ত উদ্যোগটি চালুর নির্দিষ্ট সময়, পরিচালনার নিয়ম, বাস্তবায়নের ধাপ বা সদস্যদেশগুলোর যৌথ মূলধন দেয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা হয়নি। তাই এটিকে এখনই লন্ডন বা ইউরোপের পুনর্বীমা খাতের বিকল্প বলা যাচ্ছে না। বরং এটি ভবিষ্যতে ব্রিকসের নিজস্ব বীমা ও পুনর্বীমা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রাথমিক পদক্ষেপ।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।