নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘দাদু তুমি কান্না করিও না’- গ্রাহকের পাওনা টাকা নিয়ে মানুষের চাপ ও অপমানের মধ্যে নাতনির কাছ থেকে এমন সান্ত্বনা পেয়েছেন সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের মাঠকর্মী সালমা বেগম। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত তিনি। তার মাধ্যমে বীমা করা অনেক গ্রাহক টাকা না পাওয়ায় এখন তাদের ক্ষোভ ও অপমান সইতে হচ্ছে তাকে।
নিজের সেই কষ্টের কথা বলতে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন সালমা বেগম। তিনি একা নন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শতাধিক গ্রাহক ও মাঠকর্মী বীমার বকেয়া টাকা পরিশোধের দাবিতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন। কর্মসূচি শেষে তারা আইডিআরএ চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দেন।
মানববন্ধনে সালমা বেগম বলেন, পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনেক গ্রাহক টাকা না পাওয়ায় এখন তাকেই দায়ী করছেন।
‘আমাদের বাটপার, চিটার বলা হয়। আমরা হাটে-বাজারে কোথাও যেতে পারি না। যেখানে-সেখানে আমাদের অপমান-অপদস্ত করা হয়,’ বলেন সালমা।
পারিবারিক জীবনেও এর প্রভাব পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের চাপের মধ্যে একসময় তার নাতনি তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘দাদু তুমি কান্না করিও না দাদু।’

সালমার মতো কষ্টের কথা শোনান বরিশাল থেকে আসা মায়াও। তার দাবি, ২০২১ সালে তার বীমা পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনো পাওনা ৬ লাখ টাকা পাননি। স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানকে নিয়ে আর্থিক কষ্টে দিন কাটছে তার।
‘আমার স্বামী মারা গেছে। আমার একটা বাচ্চা,’ বলেন মায়া। পরিবারে আর কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই জানিয়ে তিনি বলেন, পাওনা টাকা পাওয়ার আশায় ভাড়া খরচ করে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছেন।
মানববন্ধনে অংশ নেয়া অন্য গ্রাহক ও মাঠকর্মীদেরও একই অভিযোগ। তাদের ভাষ্য, অনেক গ্রাহকের বীমা পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও টাকা দেয়া হচ্ছে না। কোম্পানির কাছে বারবার যোগাযোগ করেও শুধু নতুন তারিখ ও আশ্বাস পাচ্ছেন তারা।
নোয়াখালী থেকে আসা আতাউর রহমান সজীব বলেন, তার এলাকার বহু গ্রাহকের টাকা আটকে রয়েছে। গ্রাহকের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে নিজের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হওয়ারও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, সানলাইফের প্রধান কার্যালয়ে গ্রাহকদের পাওনা নিয়ে কথা বলার পর তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়।
এদিকে আইডিআরএ চেয়ারম্যানের কাছে দেয়া স্মারকলিপিতে গ্রাহক ও মাঠকর্মীরা দাবি করেছেন, সারা দেশে তাদের আনুমানিক ২০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এ ছাড়া গ্রাহকদের হাতে প্রায় ৬ কোটি টাকার মেয়াদ শেষ হওয়া চেক রয়েছে, যেগুলোর টাকা এখনো পাওয়া যায়নি।
স্মারকলিপিতে আরও অভিযোগ করা হয়, অনেক গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া তাদের পাওনা বীমার টাকা থেকে ৩০ শতাংশ বা ৫০ শতাংশ এফডিআর (ব্যাংকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাখা আমানত) হিসেবে কেটে রাখা হয়েছে। কিন্তু বাকি টাকার চেকও এখনো দেয়া হয়নি।
কোম্পানির অর্থ ও হিসাব বিভাগের দায়িত্বে থাকা রফিকুল ইসলামকে নিয়েও স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়। গ্রাহক ও কর্মীদের দাবি, তিনি টাকা পরিশোধের জন্য বিভিন্ন সময় তারিখ দিলেও সেই সময়ে টাকা দেয়া হয়নি। কোম্পানির মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত সমাধান হয়নি বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
স্মারকলিপিতে তিনটি দাবি জানিয়েছেন গ্রাহক ও মাঠকর্মীরা। এগুলো হলো- পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়া গ্রাহকদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ, এফডিআর হিসেবে টাকা কেটে রাখার পর বাকি টাকার চেক দ্রুত দেয়া এবং আগে দেয়া বীমা দাবির চেকগুলোর টাকা দ্রুত পরিশোধ।
মানববন্ধনকারীরা বলছেন, দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও টাকা না পাওয়ায় তারা আইডিআরএর'র হস্তক্ষেপ চান।
দাবি পূরণ না হলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগসহ আরও কর্মসূচি নেয়া হতে পারে বলেও জানান তারা।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।