নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বজুড়ে বীমা খাত যে অবস্থানে রয়েছে, বাংলাদেশের বীমা খাতকেও সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বীমা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পেশা। বাংলাদেশেও বীমা খাত ও এ খাতের পেশাজীবীদের সেই অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বীমা খাতের গুরুত্ব ব্যাংকিং খাতের চেয়ে কম নয়। তবে দীর্ঘদিন এ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় কাজ হয়নি। দায়িত্ব নেয়ার পর বীমা খাতে বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অনিয়ম দেখতে পেয়েছে সরকার।
ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, সেখানে যেভাবে অর্থ লুটপাট ও দুর্নীতি হয়েছে, বীমা খাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের মতো বীমা খাতেও ‘আরেকটি গর্ত’ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গ্রাহকের দাবি পরিশোধ না করাকে এই সংকটের অন্যতম বড় দিক হিসেবে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, মানুষ দুঃসময়ে আর্থিক নিরাপত্তার জন্য কষ্টের উপার্জনের একটি অংশ বীমায় জমা রাখে। অথচ বর্তমানে বীমা দাবির প্রায় ৫৭ শতাংশ অপরিশোধিত রয়েছে।
এসব দাবি পরিশোধে কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময় দেয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, নগদ অর্থের সংকট থাকলে প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
বীমা দাবি পরিশোধ সংশ্লিষ্ট কোম্পানির দায়িত্ব উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি আইডিআরএ চেয়ারম্যানের কাজ নয়। তবে কয়েকটি কোম্পানির পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে দাবি পরিশোধে তাদের বাধ্য করতে হচ্ছে।
যেসব কোম্পানি সম্পদ বিক্রি করেও গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে পারবে না, তাদের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
বীমা কোম্পানিগুলোর তদারকি শক্তিশালী করতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বা ‘রিস্ক বেসড সুপারভিশন’ চালুর কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিটি কোম্পানিকে অটোমেশন ও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। আর্থিক লেনদেন হবে অনলাইনে এবং নগদ লেনদেন বন্ধ করা হবে।
এই ব্যবস্থায় আইডিআরএ ও বীমা কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কিছু বীমা কোম্পানিতে দুটি সার্ভার ব্যবহারের তথ্য পাওয়ার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি প্রকৃত এবং অন্যটি ভুয়া সার্ভার হিসেবে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। কোম্পানিগুলোকে এ ধরনের ব্যবস্থা বন্ধ করতে সময় দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পর পরিদর্শনে দুটি সার্ভার পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আইডিআরএ’র নির্দেশনা না মানা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমস্যা সমাধান করতে হবে। যারা তা করতে পারবে না, তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বীমা খাতের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়ার কথাও জানান তিনি। দুর্বল কোম্পানির পুনর্গঠন ও আইনি জটিলতার বিষয়গুলোও নতুন আইনি কাঠামোয় বিবেচনায় থাকবে।
আইডিআরএ’র জনবল নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জনবলের সংখ্যা ও দক্ষতা- দুই ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। বীমা একটি বিশেষায়িত খাত হওয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থায় এ বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল প্রয়োজন।
এ জন্য আগামী কয়েক বছরে সরকারি প্রেষণে আসা কর্মকর্তার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আইডিআরএ’র নিজস্ব জনবল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আইডিআরএ বর্তমানে যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে বীমা খাতের নেতিবাচক ভাবমূর্তি দূর হবে এবং গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসবে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।