বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার খরচ বহনে নেই বীমা সুবিধা

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৫ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার খরচ বহনে বাংলাদেশে এখনো আলাদা কোনো বীমা সুবিধা চালু হয়নি। প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও খরচ, সামাজিক সংকোচ এবং চিকিৎসা পাওয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারছেন না।

বাংলাদেশের প্রচলিত স্বাস্থ্য বীমায় এখনো মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা ও পরামর্শ সেবার খরচ বহনের আলাদা সুবিধা নেই। বর্তমানে বেশিরভাগ স্বাস্থ্য বীমা হাসপাতালে ভর্তি, শারীরিক অসুস্থতা এবং চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়।

স্বাস্থ্য বীমা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নিয়মিত অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে অসুস্থতার সময় চিকিৎসার খরচের একটি অংশ বা পুরো খরচ পাওয়ার সুযোগ থাকে। এর মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়।

বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯ অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। এই জরিপের তথ্য এখনো দেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নগরজীবনের চাপ, কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এক বিলিয়নের বেশি মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। উদ্বেগ ও বিষণ্নতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এসব সমস্যার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিবছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের উৎপাদনশীলতা ক্ষতি হচ্ছে। এ কারণে অনেক দেশে স্বাস্থ্য বীমার ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধু শারীরিক রোগের চিকিৎসা নয়, মানসিক সুস্থতাকেও স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশে স্বাস্থ্য বীমার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও যুক্ত করা হচ্ছে। এসব বীমার আওতায় পরামর্শ সেবা, মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা এবং অনলাইন মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিগনা হেলথকেয়ার ও এইটনার মতো প্রতিষ্ঠান এসব সুবিধাকে স্বাস্থ্য পরিকল্পনার অংশ করেছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোও ধীরে ধীরে এ ধরনের সুবিধা চালুর দিকে এগোচ্ছে। ভারতে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় মানসিক রোগের চিকিৎসা যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুর ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সুস্থতার সুবিধাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে নতুন ধরনের স্বাস্থ্য বীমা চালুর ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বীমার ব্যবহার এখনো সীমিত হলেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে বীমার আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাতের কর্মী, শিক্ষার্থী এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি এ ধরনের সুবিধার সম্ভাব্য গ্রাহক হতে পারেন। কর্মীদের মানসিক চাপ কমানো এবং কাজের সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে এ ধরনের সুবিধায় আগ্রহী হতে পারে।

বীমা কোম্পানিগুলো প্রথম পর্যায়ে কর্মীদের জন্য দেয়া স্বাস্থ্য বীমার সঙ্গে মানসিক সুস্থতা সুবিধা যুক্ত করতে পারে। এতে নির্দিষ্ট সংখ্যক পরামর্শ সেবা, অনলাইনে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ এবং মানসিক চাপ কমানোর সহায়তা রাখা যেতে পারে। পরে সাধারণ মানুষের জন্য কম খরচের ব্যক্তিগত মানসিক স্বাস্থ্য বীমা চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এ ধরনের বীমা চালু করতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, চিকিৎসার খরচ নির্ধারণ, চিকিৎসার মান যাচাই এবং ভুল বা অতিরিক্ত বীমা দাবি নিয়ন্ত্রণ করা বড় বিষয়। শুরুতে নির্দিষ্ট খরচ সীমা, নির্দিষ্ট সংখ্যক চিকিৎসা সেবা এবং অনুমোদিত চিকিৎসকের মাধ্যমে সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বীমা কোম্পানিগুলোর একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। পরিষ্কার নিয়ম, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভালো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে এ ধরনের বীমা সুবিধা চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।