আবদুর রহমান আবির: আত্মাসাৎ-কারসাজিতে প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিল থেকে উধাও হয়েছে ৮৪৮ কোটি টাকা। কোম্পানির তহবিল থেকে টাকা সরিয়ে নেয়ার এই কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে ২০১১ সাল থেকে। নানা সময়ে আত্মসাতের এই ঘটনা সামনে আসলেও আত্মাসাতকৃত অর্থ উদ্ধারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকেও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এর ফলে আর্থিকভাবে গ্রাহকের দায় পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়েছে কোম্পানিটি। ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে প্রাইম ইসলামী লাইফের আর্থিক অবস্থার এমন চিত্র উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অবৈধভাবে বিনিয়োগ দেখিয়ে প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিল থেকে সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে ৫শ’ ১০ কোটি ৬ লাখ টাকা, হিসাবের কারসাজিতে তহবিল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ১শ’ ৮৪ কোটি টাকা, জমির মূল্য বেশি দেখানোর কারণে তহবিল থেকে গেছে ১শ’ ৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
এই অনুসন্ধানে কোম্পানির বর্তমান সম্পদের সাথে আত্মসাৎ করা অর্থে গ্রাহকের দায়ের সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়। এক্ষেত্রে ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-পর্যালোচনা করা হয়েছে।
এই পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাইম ইসলামী লাইফের দায় রয়েছে ১৪শ’ ৫৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকের ১৩শ’ ৪৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আর অন্যান্য দায় ১০৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। দায় পরিশোধে কোম্পানির সম্পদ দেখানো হয়েছে ৮শ’ ৮৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সম্পদের হিসাব থেকে আত্মসাতের ৫শ’ ১০ কোটি ৬ লাখ টাকা বাদ দেয়া হলে সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩শ’ ৭৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। এই হিসেবে ঘাটতি দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
তবে ঘাটতির এই হিসাব এখানেই শেষ নয়! প্রাইম ইসলামী লাইফের ৮শ’ ৮৯ কোটি ১৭ লাখ টাকার সম্পদের মধ্যে জমি ও বিল্ডিংয়ে রয়েছে ২শ’ ৭৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এই হিসাবও সঠিক নয়। এখানে জমির মূল্য বেশি দেখানো হয়েছে ১শ’ ৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আবার কারসাজি করে তছরুপ করা হয়েছে ১শ’ ৮৪ কোটি টাকা।
ফলে কারসাজি ও জমির অতিরিক্ত মূল্য হিসাবে ধরা হলে সম্পদের পরিমাণ যেমন কমবে, দায় পরিশোধে ঘাটতির পরিমানও আরো বাড়বে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, যেসব খাতে সরাসারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে আত্মসাৎ ১শ’ ৪১ কোটি ৮২ লাখ ৮৬ হাজার ১শ’ ৪৯ টাকা; অপর প্রতিষ্ঠান পিএফআই সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের নামে অবৈধভাবে ঋণ দিয়ে আত্মসাৎ ১শ’ ৮৮ কোটি ১১ লাখ ১৩ হাজার ৬শ’ ৬২ টাকা; জমি ক্রয় ও সেই জমির উন্নয়নের নামে আত্মসাৎ ১শ’ ৫২ কোটি ৫২ লাখ টাকা; অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের নামে আত্মসাৎ ২৩ কোটি ৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা এবং সাবেক চেয়ারম্যান এম এ খালেক নিয়েছেন ৪ কোটি ৫৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, হিসাবের কারসাজি করে কোম্পানির লাইফ ফান্ড বাড়ানো হয়েছে ১শ’ ৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই টাকা তহবিল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হিসাবের এই কারসাজি করা হয়েছে- বকেয়া প্রিমিয়াম, তাবারুর তহবিল, কালেকশন ব্যালান্সের মত খাতে গোঁজামিল ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে। এছাড়া গোড়ান চটবাড়ি ও বাংলামোটরে বেশি মূল্যে জমি ক্রয় দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ: আত্মসাৎ ১শ’ ৪১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনসুারে, ২০১৫ সালে প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজকে ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ঋণ দেয় প্রাইম ইসলামী লাইফ। এরপর এই ঋণ প্রতিবছরই বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ১ কোটি ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করে প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজ। ২০২৫ সাল শেষে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজে মূলধন ছিল ১শ’ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রাইম ইসলামী লাইফের ছিল ৬৫ কোটি টাকা। সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল- এই ৬ বছরে লোকসান করে ৪৮ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার ১৬৯ টাকা।
আবার লোকসানে থাকার পরও পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডাররা ডিভিডেন্ড তুলে নেয় ১৫ কোটি ৫২ লাখ ৮৫ হাজার ৬শ’ টাকা। অর্থাৎ মূলধন থেকে লোকসান ও পরিচালকদের তুলে নেয়া ডিভিডেন্ডের টাকা বাদ দেয়া হলে প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজের প্রকৃত ইক্যুইটি দাঁড়ায় ৩৬ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার ২৩১ টাকা।
এই হিসাবে মূলধন থেকে প্রকৃত ইক্যুইটি বাদ দেয়া হলে প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজের ইক্যুইটি ঘাটতি দাঁড়ায় ৬৩ কোটি ৫৫ লাখ ২৫ হাজার ৭৬৯ টাকা বা ৬৩.৫৫%। ফলে ৬৫% শেয়ারে অংশিদার হিসেবে প্রাইম ইসলামী লাইফের লোকসান হয় ৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ৯১ হাজার ৭৫০ টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাইম ইসলামী লাইফ তাদের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজের বিনিয়োগ থেকে ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ডিভিডেন্ড বাবদ আয় দেখায় ১৯ কোটি ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আদায় হয় ২ কোটি ৪৫ লাখ ৫ হাজার ৬শ’ টাকা। বাকি ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৯৪ হাজার ৩৯৯ টাকা পায়নি প্রাইম ইসলামী লাইফ।

এ ছাড়াও প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটজের কাছে ঋণ বাবদ ৮৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা পায় প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ডিভিডেন্ড বাবদ পায় ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৯৪ হাজার ৩৯৯ টাকা। এসব টাকা এখানো পায়নি প্রাইম ইসলামী লাইফ। সবমিলিয়ে পাওনা দাঁড়ায় ১০০ কোটি ৫১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৯৯ টাকা। আর প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজ লোকসান করার ফলে প্রাইম ইসলামী লাইফের বিনিয়োগ থেকে লোকসান হয়েছে ৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ৯১ হাজার ৭৫০ টাকা। এই হিসেবে প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করার কারণে প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিল ঘাটতি হয়েছে ১৪১ কোটি ৮২ লাখ ৮৬ হাজার ১৪৯ টাকা।
অপরদিকে প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজে বর্তমানে ইক্যুইটি আছে ৩৬ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার ২৩১ টাকা। অর্থাৎ ইক্যুইটির সাথে প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিল ঘাটতির টাকা সমন্বয় করা হলেও ১০৬ কোটি ১ লাখ ১২ হাজার ১৪৯ টাকা ঘাটতি থেকে যাবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বিশেষ নিরীক্ষা অনুসারে, ১শ’ ১১ কোটি ৯২ লাখ টাকা ঋণ দেয় প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এই ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছিল না। এই ঋণ দেয়া হয় প্রাইম ইসলামী লাইফের এমটিডিআর বন্ধক রেখে। পরে প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংক প্রাইম ইসলামী লাইফের এমটিডিআর সমন্বয় করে ঋণ আদায় করে। পরে ২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ দেখিয়ে পিআইএসএলের সঙ্গে চুক্তি করে।
অপরদিকে প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ প্রাইম ইসলামী লাইফকে ৩২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পরিশোধ করে। কিন্তু অবশিষ্ট ৭৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ফেরত দেয়নি।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন প্রাইম ইসলামী লাইফে বিশেষ নিরীক্ষা করে ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সাল।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজে প্রাইম ইসলামী লাইফের শেয়ার ছিল ৫১%। বাকি শেয়ারের মধ্যে- তাসলিমা ইসলামের শেয়ার ৫%, ওয়াহিদ মোহাম্মদ ইউসুফের ১০%, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১০%, খন্দকার মোহাম্মদ মুনতাসিরের ১০ শতাংশ, ফারইস্ট লাইফ সিকিউরিটিজের ৪% এবং তারিখ ইকরামুল হকের ১০%।
তবে আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজে প্রাইম ইসলামী লাইফের বিনিয়োগ রয়েছে ৬৫ কোটি টাকা বা ৬৫%।
পিএফআই সিকিউরিটিজে ঋণ দিয়ে আত্মসাৎ ১শ’ ৮৮ কোটি ১১ লাখ টাকা
ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে প্রাইম ইসলামী লাইফের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৭ সালে পিএফআই সিকিউরিটিজকে ৩৫ কোটি ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫ টাকা ঋণ দেয় প্রাইম ইসলামী লাইফ। এর পরের বছর থেকেই এই ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালে এসে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১শ’ ৫৭ কোটি ৯১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৬ টাকা। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে এসে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১শ’ ৬৭ কোটি ৮০ লাখ ৪৫ হাজার ২০১ টাকা। আর এই টাকার ওপর সুদ বাবদ পাওনা দাঁড়ায় ৯ কোটি ৭৮ লাখ ৩৮ হাজার ৪ টাকা। অর্থাৎ ঋণ ও আসলসহ পিএফআই সিকিউরিটিজের কাছে প্রাইম ইসলামী লাইফ পায় ১শ’ ৭৭ কোটি ৫৮ লাখ ৮৩ হাজার ২শ’ ৫ টাকা।
এছাড়াও প্রাইম ইসলামী লাইফ শেয়ার ব্যবসার জন্য পিএফআই সিকিউরিটিজের বিও একাউন্টে দেয় আরো ১০ কোটি ৫২ লাখ ৩০ হাজার ৪শ’ ৪৮ টাকা।
ফলে সব মিলিয়ে পিএফআই সিকিউরিটিজের কাছে প্রাইম ইসলামী লাইফের পাওনা দাঁড়ায় ১শ’ ৮৮ কোটি ১১ লাখ ১৩ হাজার ৬৬২ টাকা। এসব টাকার মধ্যে একটি টাকাও ফেরত দেয়নি পিএফআই সিকিউরিটজ।
অর্থাৎ পিএফআই সিকিউরিটিজের ঋণের নামে অবৈধভাবে বিনিয়োগ করায় প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিল থেকে তছরুপ হয় ১শ’ ৮৮ কোটি ১১ লাখ ১৩ হাজার ৬শ’ ৬২ টাকা।

প্রাইম ইসলামী লাইফ এই টাকা আদায়ে উচ্চ আদালতে কোম্পানি ম্যাটার নং- ১০৯/২০২০ এবং ১৬৪/২০২০ দায়ের করে। অথচ অবৈধভাবে দখলে রাখা কোনো অর্থ বা সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য বীমা আইনে ১৩৬ ধারায় মামলার বিধান রাখা হয়েছে। এই মামলা হবে উচ্চ আদালতে।
অপরদিকে ২০২৪ সালে পিএফআই সিকিউরিটিজের লাইসেন্স নবায়ন স্থগিত করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন।
ফলে সব মিলিয়ে পিএফআই সিকিউরিটিজের কাছে প্রাইম ইসলামী লাইফের অনাদায়ী পাওনা দাঁড়ায় ১শ’ ৮৮ কোটি ১১ লাখ ১৩ হাজার ৬শ’ ৬২ টাকা। এসব টাকার মধ্যে একটি টাকাও আদায় করতে পারেনি প্রাইম ইসলামী লাইফ। অথচ এই টাকা আয় হিসাবে লাইফ ফান্ডে যোগ করে লাইফ ফান্ড বৃদ্ধি করা হয়েছে। আবার অবৈধভাবে লাইফ ফান্ড বৃদ্ধি করে ডিভিডেন্ডও নিয়েছে পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডাররা।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের উঠে আসে পিএফআই সিকিউরিটিজে ঋণ দিয়ে অর্থ আত্মসাতের তথ্য।
বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০১২ সালে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ১শ’ ২০ কোটি টাকা এমটিডিআর রাখে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এমটিডিআর’র এই টাকা জামানত রেখে ৩ ব্যাংক থেকে ১শ’ ১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ নেয় পিএফআই সিকিউরিটিজ। বিশেষ নিরীক্ষকের তথ্য অনুসারে, এই এমটিডিআর রাখাই হয়েছিল পিএফআই সিকিউরিটজকে ঋণ দেয়ার জন্য।
পিএফআই সিকিউরিটিজ এই ঋণ পরিশোধ করে নাই। ফলে ব্যাংকগুলো প্রাইম ইসলামী লাইফের এমটিডিআর থেকে ওই ঋণ সমন্বয় করে। ঋণ সমন্বয় করা হয় ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে। অপরদিকে প্রাইম ইসলামী লাইফকে টাকা ফেরত দেয়নি পিএফআই সিকিউরিটজ।
এমটিডিআর এর বিপরীতে সুদসহ পিএফআই সিকিউরিটিজের কাছে প্রাইম ইসলামী লাইফের পাওনা দাঁড়ায় ১শ’ ৬৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। যার মধ্যে দেখানো হয় ৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এছাড়াও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এমটিডিআর নগদায়ন করায় আরো ক্ষতি হয় ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ফলে পিএফআই সিকিউরিটিজে প্রাইম ইসলামী লাইফের মোট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ১শ’ ৬৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে এই টাকা প্রাইম ইসলামী লাইফ পিএফআই সিকিউরিটেজে স্বল্প মেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে দেখায়।
বিএসইসি’র বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, পিএফআই সিকিউরিটিজকে ঋণ দেয়া শুরু হয় ২০১১ সালে। কিন্তু ঋণের এই তথ্য গোপন করে আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয় না।
বিশেষ নিরীক্ষকের তথ্য অনুসারে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের জন্য পিএফআই সিকিউরিটিজে বিও হিসাব খোলে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৯ জুন ওই বিও হিসাবে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং স্থিতি দেখানো হয় ১৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এই টাকাও প্রাইম ইসলামী লাইফকে ফেরত দেয়নি পিএফআই সিকিউরিটিজ।
গোড়ান চটবাড়িতে জমি কিনে আত্মসাৎ ১৫২ কোটি ৫২ লাখ টাকা: ফারইস্ট লাইফ নিয়েছে ৭১ কোটি
গোড়ান চটবাড়িতে জমি ক্রয়ের নামে প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিল থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছে ১শ’ ৫২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। যার মধ্যে জমির উন্নয়ন ব্যয় দেখিয়ে- প্রাইম লাইফের নামে আত্মসাৎ ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ৭৯৪ টাকা, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নামে ৭১ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৩২ টাকা। আর জমি ক্রয়ের মূল্য বাবদ প্রাইম ইসলামী লাইফ এমপ্লয়ার সোসাইটির নামে নিয়ে গেছে ৪৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জমি ক্রয় করে তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাতের জন্য এমপ্লয়ীদের নামে গঠন করা হয় প্রাইম ইসলামী লাইফ কো-অপারেটিভ সোসাইটি। পরে এই সোসাইটিতে অবৈধভাবে ৫০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ দেয় প্রাইম ইসলামী লাইফ। ঋণের এই টাকা দিয়ে সোসাইটির নামে জমি কেনা হয় গোড়ান চটবাড়িতে। এই জমি কেনা হয় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাথে যৌথভাবে। ১৪ কোটি ৪৯ লাখ ৭শ’ ৫০ টাকায় জমি কেনা হয় ৭৬৩.৪৮২ শতাংশ। যার মধ্যে ৩৮১.৭৪১ শতাংশ জমির মালিক প্রাইম ইসলামী লাইফ কো-অপারেটিভ সোসাইটি। অর্ধেক জমির মূল্য হিসেবে প্রাইম ইসলামী লাইফ কো-অপারেটিভ সোসাইটি মূল্য পরিশোধ করে ৭ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার ৩৭৫ টাকা।

২০১৩ সালের মে, জুন, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এবং ২০১৪ সালের এপ্রিল, মে, ও জুলাই মাসে যৌথভাবে ২৬টি সাব-কবলা দলিলে ২টি সোসাইটির নামে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়।
জমি কেনার পর প্রাইম ইসলামী লাইফের আইন উপদেষ্টা ব্যারিষ্টার এ এস এম আব্দুর রাজ্জাক মতামত দেন, এমপ্লয়ীজ সোসাইটি খুলে তার নামে মূল কোম্পানি থেকে ঋণ দেয়ার আইনগত বৈধতা নেই। এই মতামতের ওপর ভিত্তি করে সোসাইটির কাছে ঋণের টাকা ফেরত চায় প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি।
সোসাইটি টাকা ফেরত না দিয়ে ঋণ পরিশোধের জন্য ৩৮১.৭৪১ শতাংশ জমি প্রাইম ইসলামী লাইফের নামে সাফ কবলা রেজিস্ট্রি দেয়। এবার এই ৩৮১.৭৪১ শতাংশ জমির দলিলে মূল্য ধরা হয় ৪ কোটি ৯৭ লক্ষ ৮১ হাজার টাকা। অর্থাৎ ৫০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করা হয় ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা মূল্যের জমি দিয়ে। বাকি ৪৫ কোটি ৪০ লাখ ৪২ হাজার ৪শ’ ৫০ টাকা ফেরত দেয়নি সোসাইটি। এই টাকার কোনো হিসাবও নেই প্রাইম ইসলামী লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনে।
আবার ওই জমিরই উন্নয়নের নামে ব্যয় করা হয় ২শ’ ১৪ কোটি ৫৫ লাখ ৪৫ হাজার ২শ’ ৫০ টাকা। যার অর্ধেক ১শ’ ৭ কোটি ১১ লাখ ৫৭ হাজার ১শ’ ২৫ টাকা ব্যয় করার কথা প্রাইম ইসলামী লাইফের। কিন্তু প্রাইম ইসলামী লাইফ ব্যয় করে ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ৭শ’ ৯৪ টাকা। জমির উন্নয়নে বাকী ৭১ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৩শ’ ৩২ টাকা ব্যয় করে বলে দাবি করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ।
পরবর্তীতে জমির উন্নয়নের নামে ব্যয় করা এই টাকা প্রাইম ইসলামী লাইফের কাছে ফেরত চায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। প্রাইম ইসলামী লাইফ টাকা ফেরত না দিয়ে গোড়ান চটবাড়ির ২৩৭.১৫৭ শতাংশ জমি ফারইস্ট লাইফের নামে রেজিস্ট্রি করে দেয়। প্রতি শতাংশ ৩০ লাখ টাকা মূল্য ধরে জমির উন্নয়নে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পাওনা বাবদ ৭১ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৩২ টাকা পরিশোধ করে প্রাইম ইসলামী লাইফ।
অর্থাৎ যে জমি কেনা হয় ৪ কোটি ৫০ লাখ ৯ হাজার ৮৭৩ টাকায়, (প্রতি শতাংশ ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭৮৯ টাকা) সেই জমি ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নামে রেজিস্ট্রি দেয়া হয় ৭১ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৩২ টাকা মূল্য ধরে (প্রতি শতাংশ ৩০ লাখ টাকা) ।
অথচ জমিতে কোনো উন্নয়ন করা হয়নি। এই উন্নয়ন দেখানো হয়েছে কাগজে কলমে। আবার ফারইস্ট ইসলামী লাইফ রেজিস্ট্রি করে দেয়া এই জমির হিসাব আর্থিক প্রতিবেদনে দেয়নি প্রাইম ইসলামী লাইফ। এমনকি জমির মূল্য বা উন্নয়ন ব্যয়ের নামে প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিলে কোনো টাকা জমা করে নাই ফারইস্ট ইসলামী লাইফ।
এই হিসেবে গোড়ান চটবাড়ির জমি ক্রয়ে প্রাইম লাইফের তহবিল থেকে আত্মসাৎ হয় ১শ’ ৫২ কোটি ৫১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৭৬ টাকা। যার মধ্যে জমি ক্রয়ের নামে কো-অপারেটিভ সোসাইটিকে ঋণ দিয়ে আত্মসাৎ ৪৫ কোটি ৪০ লাখ ৪২ হাজার ৪৫০ টাকা। জমির উন্নয়নের নামে ব্যয় করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ নেয় ৭১ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৩শ’ ৩২ টাকা, জমির উন্নয়নের নামে প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিল থেকে সরাসরি ব্যয় করা হয় ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ৭শ’ ৯৪ টাকা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ১শ’ ৫২ কোটি ৫১ লাখ ৯৫ হাজার ৫শ’ ৭৬ কোটি টাকা।
২৭৮ কোটি টাকার জমির মূল্য এখন ১২৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাইম ইসলামী লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে মোট জমি ও বিল্ডিংয়ের মূল্য দেখানো হয়েছে ২৭৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলামোটরের জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ১৯৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, রাজশাহীর জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ১২ কোটি ৭২ লাখ টাকা, সিলেটের জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। গোড়ান চটবাড়ির জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৬২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আর জমি ক্রয়ের অন্যান্য খরচ বাবদ দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
২০১৭ সালে বাংলামোটরের ১১২, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ে ২১.৮৯ কাঠা জমি ১৯৬ কোটি টাকায় ক্রয় করে প্রাইম ইসলামী লাইফ। ২০২২ সালে এই জমি ভ্যালুয়েশন করে প্রাইম ইসলামী লাইফ। ভ্যালুয়েশন রিপোর্টে বাংলামোটরের এই জমির মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ১০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ জমির মূল্য বেশি দেখানো হয়েছে ৯৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এই ভ্যালুয়েশন করা হয় ২০২২ সালের জুন মাসে।

আবার এই জমি বিক্রির জন্য ২০২৪ সালে এপ্রিলে দরপত্র আহবান করে আইডিআরএ। তবে জমি ক্রয়ের জন্য কেউ দরপত্র দাখিল করেনি। কোনো ক্রেতাও পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাইম ইসলামী লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনে গোড়ান চটবাড়ির ১৪৪ দশমিক ৫৯১ শতাংশ জমির মূল্য দেখিয়েছে ৬২ কোটি ৭৭ লাখ ৩৪ হাজার ৪শ’ ৭ টাকা। কিন্তু প্রতি শতাংশ ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭শ’ ৮৯ টাকা হারে এই জমির প্রকৃত ক্রয় মূল্য হয় ২ কোটি ৭৪ লাখ ২৬ হাজার ৪শ’ ৮ টাকা। এক্ষেত্রে জমির মূল্য বেশি দেখানো হয়েছে ৬০ কোটি ৩ লাখ টাকা।
এই হিসেবে বাংলামোটর ও গোড়ান চটবাড়ির জমির মূল্য বেশি দেখানো হয়েছে মোট ১৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এই টাকাও জমি ক্রয়ের নামে তহবিল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হিসাব অনুসারে বর্তমানে প্রাইম ইসলামী লাইফের জমি রয়েছে ১২৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকার।
আত্মসাৎ-কারসাজির বিষয়ে যা বলছে প্রাইম ইসলামী লাইফ
প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিল থেকে ৮৪৮ কোটি টাকা উধাও হওয়ার বিষয়ে বীমা কোম্পানিটির বর্তমান মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামছুল আলম ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’কে বলেন, এসব অনিয়মের ঘটনা অনেক আগের। তবে সবগুলোর ঘটনায় প্রয়োজনীয় তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আত্মসাতকৃত এসব অর্থ উদ্ধার করে গ্রাহকের সব পাওনা যথাযথভাবে পরিশোধের জন্য আমরা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।