আবদুর রহমান আবির: সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের মালিকানা কিনেও প্রায় সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকা লোকসান করেছে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স। ২০২৩ সালে লাইফ বীমা কোম্পানিটির ৪৩ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স ও তার অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।
সানলাইফ কিনে নেয়ার সময় কোম্পানিতে সম্পদ থেকে দায় বাদ দিয়ে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৬৮ কোটি ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৪ টাকা। অপরদিকে কোম্পানিটির শেয়ার কিনতে ব্যয় করে ৭৭ কোটি ৯ লাখ ৬৫ হাজার ২৫০ টাকা। অর্থাৎ সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কিনতে সব মিলিয়ে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ঘাটতি ৩৪৫ কোটি ২৭ লাখ ৩০ হাজার ৭৮৪ টাকা।
এর আগে কারসাজি ও গোঁজামিল দিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখিয়ে নন-লাইফ খাতের এই কোম্পানির তহবিল থেকে সাড়ে ৮শ’ কোটি টাকা থেকে সরিয়ে নেয়ার তথ্য উঠে আসে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে।
তথ্য অনুসারে, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তাদের ১ কোটি ৫৪ লাখ ১৯ হাজার ৩০৫টি শেয়ার কিনে নেয় গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স। যা লাইফ বীমা কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৪৩ দশমিক ১২ শতাংশ। প্রতিটি শেয়ারে মূল্য ৫০ টাকা হারে মোট মূল্য ৭৭ কোটি ৯ লাখ ৬৫ হাজার ২৫০ টাকা।
গ্রীন ডেল্টার সাবসিডিয়ারি ৫ প্রতিষ্ঠান কিনে নেয় ৩৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। প্রতিষ্টানগুলোর মধ্যে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি নেয় ১০ শতাংশ, গ্রীন ডেল্টা ক্যাপিটাল লিমিটেড ৮ শতাংশ, জিডি এ্যাসিস্ট লিমিটেড ৬ শতাংশ, গ্রীন ডেল্টা সিকিউরিটিজ লিমিটেড ৬ শতাংশ, প্রফেশনাল এ্যাডভান্সমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড ৫.৬৬ শতাংশ।
অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ কিনে নেয় ফারজান চৌধরীসহ গ্রীন ডেল্টা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৮ জন কর্মকর্তা। এর হলেন- ফারজানা চৌধুরী ২.৩৩ শতাংশ, সৈয়দ মইনুদ্দিন আহমেদ ২.৩৩ শতাংশ, মো. রফিকুল ইসলাম ২.৩৩ শতাংশ, রুবাইয়াত আহমেদ ০.১১ শতাংশ, মো. তানভীর ইয়াজদানি ০.১১ শতাংশ, বেল্লাল হোসেন পাটোয়ারি ০.১১ শতাংশ, সুভাসিস বড়ুয়া ০.০২ শতাংশ এবং সৈয়দ আলিয়ুল আহবাব ০.১১ শতাংশ।
৪৬১ কোটি টাকার সম্পদ, যার বাস্তবে অস্তিস্ত নাই
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কেনার সময়ে যেসব সম্পদ দেখানো হয়, সেসব সম্পদ নগদায়নের সুযোগ নেই। অর্থাৎ কোম্পানির দায় আছে অথচ তহবিলে নগদ কোনো টাকা নেই।
শেয়ার ক্রয়কালে কোম্পানিতে সম্পদ দেখানো হয়েছিল ৪৬১ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৬৩ টাকা। এর মধ্যে- বকেয়া ল্যাপস পলিসির প্রিমিয়ামের টাকা ৩৩৮ কোটি ৪ লাখ ১১ হাজার ৯৯২ টাকা। বিটিএ টাওয়ারের ক্রয়কৃত ফ্লোরের পূনর্মূল্যায়ন বাবদ ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫২০ টাকা, সরকারি খাতে আয়কর বাবদ অগ্রিম প্রদান ৬ কোটি ৬০ লাখ ১ হাজার ৬৯৭ টাকা এবং পিপলস লিজিংয়ে ১ কোটি টাকা।
এসব সম্পদের মধ্যে বকেয়া প্রিমিয়াম আদায় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর কারণ ইতোমধ্যেই সকল পলিসি ল্যাপস হয়ে গেছে।
বিটিএ টাওয়ারের ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫২০ টাকা নগদায়নের সুযোগ নেই। বিটিএ টাওয়ার ক্রয় হয় ৯ কোটি ১৬ লাখ ১১ হাজার ৯৩৬ টাকা দিয়ে। ইতোমধ্যে প্রতি বছর ফ্লোরের অবচয় বাবদ ব্যয় দেখানোর ফলে ২০২৩ সালে এসে ফ্লোরটির মূল্য শুন্য হয়ে পড়েছে। নতুন করে আবারও এই ফ্লোরের মূল্য ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫২০ টাকা দেখানো হয়েছে। ফলে এই টাকা আদায়ের কোনো সুযোগ নেই।
অপরদিকে আয়কর বাবদ ৬ কোটি ৬০ লাখ ১ হাজার ৬৯৭ টাকা সরকারের কোষাগারে জমা করা হয়েছে; এই টাকাও আদায়ের সুযোগ নেই। পিপলস লিজিংয়ের ১ কোটি টাকাও আদায় হওয়ার সুযোগ নেই।
অর্থাৎ সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রকৃত সম্পদ ১০১ কোটি ৮২ লাখ ২০ হাজার ৩৫৪ টাকা।
অপরদিকে কোম্পানিটির দায়ের পরিমাণ ৩৬৯ কোটি ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮৮৮ টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকের পাওনা ৩০৯ কোটি ৩৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৭৯ টাকা। বাকি পাওনাদারে মধ্যে আছে- সরকারি ভ্যাট ট্যাক্স বাবদ পাওনা ৩১ কোটি ৬৪ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩৮ টাকা, কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পাওয়ান ৫ কোটি ৩২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৭৯ টাকা, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পাওনা ১ কোটি ৭৪ লাখ ২৫ হাজার ৩৩২ টাকা। অফিস ভাড়া বাবদ বকেয়া ২ কোটি ৬০ লাখ ১৭ হাজার ৫৪১ টাকা। এই সব মিলিয়ে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫৮ কোটি ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৪ টাকা।
এই হিসাবে প্রকৃত সম্পদ থেকে প্রকৃত দায় বাদ দিলে কোম্পানিটিতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬৮ কোটি ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৪ টাকা। অপরদিকে কোম্পানিটির শেয়ার কিনতে ব্যয় করে ৭৭ কোটি ৯ লাখ ৬৫ হাজার ২৫০ টাকা।
অর্থাৎ সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কিনতে সব মিলিয়ে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ঘাটতি ৩৪৫ কোটি ২৭ লাখ ৩০ হাজার ৭৮৪ টাকা।
গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে গ্রীন ডেল্টার চুক্তি লঙ্ঘন
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি পত্রে ক্লজ ১০ এবং ১০.৩ অনুযায়ী, মালিকানা হস্তান্তরের পূর্বে ইস্যুকৃত সকল বীমা পলিসির দায়ভার সম্পূর্ণভাবে বর্তমান কোম্পানির। এসব বকেয়া বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে কোম্পানির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ আইনত বাধ্য।
অথচ গ্রাহকদের বকেয়া বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স তথা সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বর্তমান পর্ষদ। এমনকি নতুন পরিচালকদের তথ্যও হালনাগাদ করা হয়নি কোম্পনিটির ওয়েবসাইটে। ফলে মালিকানা হস্তান্তরের পরেও কোম্পানির তৎকালীন পর্ষদের নামে একাধিক মামলা করেছেন গ্রাহকরা।
চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের এমন অভিযোগ করে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের সিইও ফারজানা চৌধুরীসহ সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিল কোম্পানিটির তৎকালীন চেয়ারপারসন অধ্যাপক রুবিনা হামিদের নেতৃত্বাধীন পর্ষদ। এই নোটিশ পাঠানো হয় ২০২৪ সালের ১০ মার্চ।
গ্রীন ডেল্টার তহবিল থেকে যেভাবে সাড়ে ৮শ’ কোটি টাকা উধাও
কারসাজি ও গোঁজামিল দিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখিয়ে গ্রীন ডেল্টার তহবিল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে সাড়ে ৮শ’ কোটি টাকা। কোম্পানিটির ২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন ও বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং অন্যান্য নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে এমন তথ্য উঠে এসেছে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কারসাজি করে ইক্যুইটি বৃদ্ধির হিসাব দিয়ে তহবিল থেকে উধাও করা হয়েছে ৩৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ইক্যুইটি বৃদ্ধির এই কারসাজিতে পুনর্মূল্যায়ন করে সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি করা হয় ১৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এই সম্পদ বিক্রি হওয়ার আগেই সম্পদ পুনর্মূল্যায়িত এই রিজার্ভ থেকে ৫৪ কোটি টাকা ডিভিডেন্ড তুলে নেয়া হয়।
বেআইনিভাবে অন্যান্য খাতে অগ্রিম বাবদ পরিশোধ দেখানো হয় ২২৫ কোটি টাকা। অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে ১৭১ কোটি টাকা। অপরদিকে মুনাফা থাকার পর ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয় ২৬৩ কোটি টাকা। হিসাবের গোঁজামিল দিয়ে কমানো হয় ইক্যুইটির ৫৪ কোটি টাকা ও ক্যাশ-ফ্লো’র ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
এছাড়াও গ্রাহকের জমা করা প্রিমিয়াম, ভ্যাট ও ট্যাক্সের টাকা গোপন করা, অবৈধ ব্যয়, অতিরিক্ত কমিশন প্রদান, বাকি ব্যবসা, প্রিমিয়াম হার লঙ্ঘন, পুনর্বীমা না করে ব্যবসা পরিচালনা করা ও মুখ্য নির্বাহীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে দেয়া হয়েছে আর্থিক সুবিধা। তবে প্রভাব খাটিয়ে বিশেষ নিরীক্ষকের কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়া এবং বিশেষ নিরীক্ষক ও তদন্ত দলকে তথ্য না দেয়ায় আড়ালেই থেকে গেছে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি’র অনিয়ম-দুর্নীতির এসব ঘটনা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি’র মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা চৌধুরীর মুঠোফোনে এবং হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বর্তমান কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।