আবদুর রহমান আবির: আত্মাসাৎ-কারসাজিতে প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিল থেকে উধাও হয়েছে ৮৪৮ কোটি টাকা। কোম্পানির তহবিল থেকে টাকা সরিয়ে নেয়ার এই কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে ২০১১ সাল থেকে। নানা সময়ে আত্মসাতের এই ঘটনা সামনে আসলেও আত্মাসাতকৃত অর্থ উদ্ধারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকেও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এর ফলে আর্থিকভাবে গ্রাহকের দায় পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়েছে কোম্পানিটি। ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে প্রাইম ইসলামী লাইফের আর্থিক অবস্থার এমন চিত্র উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অবৈধভাবে বিনিয়োগ দেখিয়ে প্রাইম ইসলামী লাইফের তহবিল থেকে সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে ৫শ’ ১০ কোটি ৬ লাখ টাকা, হিসাবের কারসাজিতে তহবিল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ১শ’ ৮৪ কোটি টাকা, জমির মূল্য বেশি দেখানোর কারণে তহবিল থেকে গেছে ১শ’ ৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
এই অনুসন্ধানে কোম্পানির বর্তমান সম্পদের সাথে আত্মসাৎ করা অর্থে গ্রাহকের দায়ের সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়। এই অনুসন্ধানে ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-পর্যালোচনা করা হয়েছে।
এই পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাইম ইসলামী লাইফের দায় রয়েছে ১৪শ’ ৫৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকের ১৩শ’ ৪৬ কোটি ৯১ লাখ। আর অন্যান্য দায় ১০৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। দায় পরিশোধে কোম্পানির সম্পদ দেখানো হয়েছে ৮শ’ ৮৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সম্পদের হিসাব থেকে আত্মসাতের ৫শ’ ১০ কোটি ৬ লাখ টাকা বাদ দেয়া হলে সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩শ’ ৭৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। এই হিসেবে ঘাটতি দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
তবে ঘাটতির এই হিসাব এখানেই শেষ নয়! প্রাইম ইসলামী লাইফের ৮শ’ ৮৯ কোটি ১৭ লাখ টাকার সম্পদের মধ্যে জমি ও বিল্ডিংয়ে রয়েছে ২শ’ ৭৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এই হিসাবও সঠিক নয়। এখানে জমির মূল্য বেশি দেখানো হয়েছে ১শ’ ৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আবার কারসাজি করে তছরুপ করা হয়েছে ১শ’ ৮৪ কোটি টাকা।
ফলে কারসাজি ও জমির অতিরিক্ত মূল্য হিসাবে ধরা হলে সম্পদের পরিমাণ যেমন কমবে, দায় পরিশোধে ঘাটতির পরিমানও আরো বাড়বে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, যেসব খাতে সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান প্রাইম ইসলামী লাইফ সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে আত্মসাৎ ১শ’ ৪১ কোটি ৮২ লাখ ৮৬ হাজার ১শ’ ৪৯ টাকা; অপর প্রতিষ্ঠান পিএফআই সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের নামে অবৈধভাবে ঋণ দিয়ে আত্মসাৎ ১শ’ ৮৮ কোটি ১১ লাখ ১৩ হাজার ৬শ’ ৬২ টাকা; জমি ক্রয় ও সেই জমির উন্নয়নের নামে আত্মসাৎ ১শ’ ৫২ কোটি ৫২ লাখ টাকা; অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের নামে আত্মসাৎ ২৩ কোটি ৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা এবং সাবেক চেয়ারম্যান এম এ খালেক নিয়েছেন ৪ কোটি ৫৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, হিসাবের কারসাজি করে কোম্পানির লাইফ ফান্ড বাড়ানো হয়েছে ১শ’ ৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই টাকা তহবিল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হিসাবের এই কারসাজি করা হয়েছে- বকেয়া প্রিমিয়াম, তাবারুর তহবিল, কালেকশন ব্যালান্সের মত খাতে গোঁজামিল ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে। এছাড়া গোড়ান চটবাড়ি ও বাংলামোটরে বেশি মূল্যে জমি ক্রয় দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
হিসাবের কারসাজিতে ১৮৪ কোটি টাকার কাগুজে লাইফ ফান্ড
হিসাব নীতিমালা অনুসারে যেসব টাকা আদায় হয়নি অথবা যেসব টাকা আদায় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই সেসব টাকা লাইফ ফান্ড হিসাবে দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। অথচ হিসাব নীতিমালার এই আইন লঙ্ঘন করে অনাদায়ী ও আদায়যোগ্য নয় এমন ১৮৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা লাইফ ফান্ডে যোগ করে লাইফ ফান্ড বাড়িয়েছে প্রাইম ইসলামী লাইফ। অনাদায়ী ও আদায়যোগ্য নয়- এই টাকার মধ্যে রয়েছে, শেয়ার বাজারে লোকসানের টাকাসহ বকেয়া প্রিমিয়ামের টাকাও। এমনকি কালেকশন ব্যালান্স নামে অপ্রচলিত শিরোনামে আয়ের হিসাব দিয়েও বাড়ানো হয়েছে লাইফ ফান্ড। কারসাজি করে লাইফ ফান্ড বাড়ানোর এই কাজটি প্রাইম ইসলামী লাইফ করে আসছে বছরের পর বছর ধরে।

২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল এই ১১ বছরের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা করে যেসব খাতে কারসাজি করে টাকা তহবিল তছরুপ করা হয়েছে তা নিয়ে সাজানো হয়েছে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানি প্রতিবেদন।
বকেয়া প্রিমিয়ামের ৫৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা: আদায় নিয়ে প্রশ্ন
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রাইম ইসলামী লাইফ বকেয়া প্রিমিয়াম দেখিয়েছে ৫৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। যা মোট প্রিমিয়ামের ২২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
বকেয়া প্রিমিয়ামের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রাইম ইসলামী লাইফ বকেয়া প্রিমিয়ামের যে হিসাব দিয়েছে তা খুবই অস্বাভাবিক। আবার এই বকেয়া প্রিমিয়াম আদৌ আদায় হয়েছে কি না তার কোনো তথ্য নেই।
বকেয়া প্রিমিয়াম হিসাব পর্যালোচন করে দেখা যায়, প্রাইম ইসলামী লাইফ ২০২৪ সালে ১১ মাসে নবায়ন প্রিমিয়াম আয় করেছে ২৪৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে নবায়ন সংগ্রহ ১৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অথচ ডিসেম্বরের এক মাসে নবায়ন প্রিমিয়াম আয় করেছে ৫৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
এই টাকা আদৌ আয় হয়েছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। অথচ বকেয়া প্রিমিয়ামের সব টাকাই লাইফ ফান্ডে যোগ করে লাইফ ফান্ড বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ আদায় নিয়ে সন্দেহজনক বকেয়া প্রিমিয়ামে ৫৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকাই লাইফ ফান্ডে যোগ করে লাইফ ফান্ড বাড়ানো হয়েছে।
গ্রাহকের বীমা দাবির ৩৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা অবৈধভাবে কেটে রেখে তাবারুর তহবিল গঠন
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে বীমা দাবির টাকা থেকে ১৮ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ৮শ’ ৭৪ টাকা কেটে রেখে তাবারুর তহবিল গঠন করে প্রাইম ইসলামী লাইফ। অথচ নিয়ম অনুসারে তাবারুর তহবিল গঠন করা হয় প্রিমিয়াম থেকে একটি অংশ কেটে রেখে।
আবার বীমা দাবি বাবদ পরিশোধ করা সব টাকাই লাইফ রেভিনিউ একাউন্টে ব্যয় হিসেবে বাদ দিয়ে লাইফ ফান্ড হিসাব করা হয়। অথচ প্রাইম ইসলামী লাইফ বীমা দাবি থেকে কেটে রাখা তাবারুর ফান্ডের টাকা লাইফ রেভিনিউ একাউন্ট থেকে ব্যয় হিসেবে বাদ দেয়নি।
ফলে প্রিমিয়াম থেকে তাবারুর ফান্ড গঠন না করায় প্রিমিয়াম আয় বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে তাবারুর ফান্ডের সমপরিমাণ টাকা বীমা দাবি পরিশোধ না করায় বীমা দাবি কম পরিশোধ হয়। এতে লাইফ ফান্ড তাবারুর তহবিলের দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এভাবে হিসাবের এই কারসাজি করে লাইফ ফান্ড বাড়ানো হয়েছে ৩৬ কোটি ৯৮ লাখ ৮১ হাজার ৭শ’ ৪৮ টাকা।
‘কালেকশন ব্যালান্স’ ৩৩ কোটি ১১ লাখ টাকাও লাইফ ফান্ডে
লাইফ বীমা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে ‘কালেকশন ব্যালান্স’ নামে কোনো খাত নেই। অথচ প্রাইম ইসলামী লাইফ তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে কালেকশন ব্যালান্স নামে একটি খাত তৈরি করে। এই খাতে বছরের পর বছর ধরে দেখানো হচ্ছে- কোটি কোটি টাকা। অথচ এই টাকা কিসের টাকা, তার কোনে বর্ণনা নেই আর্থিক প্রতিবেদনে। তবে প্রাইম ইসলামী লাইফে বিশেষ নিরীক্ষা করে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এস এফ আহমেদ এন্ড কোং-কে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, কালেকশন ব্যালান্স খাতে যে টাকা দেখানো হয়েছে তা ১ম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের টাকা। অথচ আইন অনুসারে ১ম বর্ষ প্রিমিয়ামের টাকা বকেয়া রাখার কোনো সুযোগ নেই।
বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুসারে, ২০১৭ সালে কালেকশন ব্যালান্স দেখানো হয়েছে ৪০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এই ৪০ কোটি ২৪ লাখ টাকাই ১ম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের টাকা। ১ম বর্ষের এই প্রিমিয়াম প্রাইম ইসলামী লাইফ আয় করেছে পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত। অথচ আইন অনুসারে ১ম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহ শেষ করতে হবে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে।
প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে, অন্যান্য বছরে কালেকশন ব্যালান্সে পরের বছরের ১ম বর্ষ প্রিমিয়াম কি পরিমাণ রয়েছে তা নিরীক্ষা করতে পারেনি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কালেকশন ব্যালান্স সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র প্রাইম ইসলামী লাইফ না দেয়ায় তারা এ নিরীক্ষা করতে পারেনি।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে কালেকশন ব্যালান্স দেখানো হয়েছে ৩৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, যা ওই বছরের ১ম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের ২৫.৬২%। আর ২০১৪ সালে কালেকশন ব্যালান্স দেখানো হয় ৩৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা ১ম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের ৬৭.৭৪%।
২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বছরে ১ম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের ২৫.৬২% থেকে ৭০.৩৮% পর্যন্ত এই কালেকশন ব্যালেন্স হিসাবে দেখানো হয়েছে।
হিসাববিদদের মতে, পরের বছরের প্রিমিয়াম আয় আগের বছর দেখানো হিসাবের কারসাজি। এর কোনো আইনগত বৈধতা নেই। অপরদিকে এই কারসাজি করে প্রিমিয়াম আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি লাইফ ফান্ডও বাড়ানো বেআইনি। অথচ কালেকশন ব্যালেন্সের সব টাকাই (৩৩ কোটি ১১ লাখ) লাইফ ফান্ডে যোগ করে লাইফ ফান্ড বাড়ানো হয়েছে।
শেয়ার বাজারে লোকসান ১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকাও লাইফ ফান্ডে
২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, প্রাইম ইসলামী লাইফ শেয়ার ব্যবসায় বিনিয়োগ করে ৩৫ কোটি ৮১ লাখ ৬৫ হাজার ৯শ’ ১৯ টাকা। যার বর্তমান বাজার মূল্য ১৭ কোটি ১৬ লাখ ৫৪ হাজার ৪শ’ ৮২ টাকা। অর্থাৎ শেয়ার মার্কেটে ব্যবসা করে কোম্পানির লোকসান হয় (অনুপার্জিত ক্ষতি) ১৮ কোটি ৬৫ লাখ ১১ হাজার ৪শ’ ৩৭ টাকা। এই টাকা লাইফ ফান্ড থেকে বাদ না দিয়ে লাইফ ফান্ড বাড়িয়েছে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
ভ্যাট ফাঁকি ৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, বকেয়া ১০ কোটি ১ লাখ
প্রাইম ইসলামী লাইফ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাট নিয়েছে ১১ কোটি ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৮শ’ ৩২ টাকা। অথচ সরকারের তহবিলে জমা দিয়েছে ৫ কোটি ৪ লাখ ১৬ হাজার ৬শ’ ৩৬ টাকা। বাকি ৬ কোটি ৫ লাখ ৪৩ হাজার ১শ’ ৯৬ টাকা সরকারি তহবিলে জমা দেয়নি।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে রিটার্ন দাখিলের সময় প্রাইম ইসলামী লাইফ এজেন্টদের কমিশন বাবদ পরিশোধ দেখিয়েছে ৬ কেটি ৯৭ লাখ ১ হাজার ৩শ’ টাকা। অথচ কমিশন দিয়েছে ৩৬ কোটি ৮৫ লাখ ৩৯ হাজার ১শ’ ২৫ টাকা।
অর্থাৎ এজেন্ট কমিশন পরিশোধ কম দেখানো হয়েছে ২৯ কোটি ৮৮ লাখ ৩৭ হাজার ৮শ’ ২৫ টাকা। এই টাকার উপর ৫ শতাংশ হারে আয়কর হিসাব করলে উৎস কর দাঁড়ায় ১ কোটি ৪৯ লাখ ৪১ হাজার ৮শ’ ৯১ টাকা। এই টাকাও সরকারকে পরিশোধ করেনি প্রাইম ইসলামী লাইফ।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আরো দেখা যায়, ২০১৫ সালে ট্যাক্স ও ভ্যাট বাবদ বকেয়া ছিল ১ কোটি ১৪ কোটি টাকা। এরপর প্রতিবছরই তা বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ১ লাখ টাকা। ভ্যাট ট্যাক্সের এই টাকাও প্রাইম ইসলামী লাইফ কেটে রাখে কিন্তু তা সরকারের কোষাগারে জমা করেনি।
সবমিলিয়ে প্রাইম ইসলামী লাইফ ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। আর ভ্যাট ট্যাক্স মিলিয়ে পরিশোধ করেনি ১০ কোটি ১ লাখ টাকা। আর এই সব টাকাই তহবিলে রেখে লাইফ ফান্ড বৃদ্ধি করেছে প্রাইম ইসলামী লাইফ।
অনাদায়ি এমটিডিআর’র ৫ কোটি ৭২ লাখ টাকাও লাইফ ফান্ডে
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৭টি এমটিডিআর এর বিপরীতে ৫ কোটি ৭২ লাখ ২৬ হাজার ৯শ’ ৫৩ টাকা টাকা বিনিয়োগ করে প্রাইম ইসলামী লাইফ। এর বিপরীতে সুদ বাবদ আয় দেখানো হয় ১৫ লাখ ৩৬ হজার ৯শ’ ৫৩ টাকা।
এই ৭টি এমটিডিআর’র মধ্যে- ৪টি ২০২১ সালের, বাকি ৩টি ২০২৪ সালের। অথচ ব্যাংকটি ২০২৩ সাল থেকেই লোকসানে রয়েছে। ফলে ব্যাংকে থেকে কোনো টাকা আদায় করতে পারেনি প্রাইম ইসলামী লাইফ। আদায় হওয়াও অনিশ্চিত।
অথচ প্রতিবছরই এমটিডিআরগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন করে যাচ্ছে প্রাইম ইসলামী লাইফ। আবার এই টাকা আয় হিসেবে লাইফ ফান্ডে যোগ করা হচ্ছে। আবার বিনিয়োগ দেখিয়েও সম্পদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অপরদিকে লোকসানি একটি ব্যাংকে কেন নতুন করে বিনিয়োগ করা হলো তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আদায় হয়নি পলিসি ঋণ ও মুনাফার ১৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে গ্রাহকদের ঋণ দিয়েছে ৪১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। যার মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ২৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। বাকি ১২ কোটি ১৭ লাখ টাকা আদায় হয়নি। যা মোট ঋণের ২৯.২৩%। অথচ লাইফ বীমা কোম্পানি পলিসির বিপরীতে গ্রাহকদের ঋণ দিতে পারে মাত্র এক বছরের জন্য।
অপরদিকে এই ঋণের টাকা আদায় না হলে ঋণের উপর মুনাফা হয়েছে দাবি করে আর্থিক প্রতিবেদনে হিসাব দেয়া হচ্ছে। এই মুনাফাও প্রতিবছরই বাড়ছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পলিসি ঋণ থেকে মুনাফা দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এই টাকা আদায় হবে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এই টাকাও লাইফ ফান্ডে যোগ করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে লাইফ ফান্ড। সবমিলিয়ে লাইফ ফান্ডে যোগ করা হয়েছে ১৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
অগ্রীম বেতন পরিশোধ দেখিয়ে লাইফ ফান্ড বৃদ্ধি ১৬ লাখ টাকা
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এস এফ আহমেদ এন্ড কোং এর বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ৭ জন কর্মকর্তার নামে ১৬ লাখ ৫ হাজার ৩শ’ ৮৮ টাকা অগ্রীম দেখানো হয়েছে। অগ্রীম এই বেতন পরিশোধ দেখানো হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। অথচ এই কর্মকর্তারা এখন আর কোম্পানির চাকরিতে নেই। আবার এই টাকা প্রাক্তন কর্মকর্তাদের কাছে পায় তার কোনো ব্যাখা নেই আর্থিক প্রতিবেদনে। অথচ এই টাকাও লাইফ ফান্ডে যোগ করা হয়েছে।
আদায় হয়নি ৬ প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা ৬৭ লাখ টাকা
২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের হিসাব দেয়া হয়েছে, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজের কাছে ২০ হাজার ৪শ’ ৮৬ টাকা, ফারইস্ট ইসলামী সিকিউরিটিজের কাছে ৫ হাজার ৭শ’ ১৬ টাকা, বিজিটিবি প্রিমিয়াম বাবদ ২৪ লাখ ৬৮ হাজার ৫শ’ ৮৭ টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৬ লাখ টাকা এবং শিরোনাম বিহীন (অন্যান্য খাতে) ৩৫ লাখ ৫৬ হাজার ১শ’ ৯ টাকা পাবে।
সব মিলিয়ে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পাওনা টাকার পরিমাণ ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ৯শ’ ৬৮ টাকা।
কিন্তু এই টাকাগুলো আদৌ আদায় হবে কি না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অথচ হিসাব নীতিমালা অনুসারে এই বকেয়া টাকা সম্পদ হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। অথচ প্রাইম ইসলামী লাইফে এই টাকা সম্পদ হিসেবে দেখিয়ে লাইফ ফান্ড বাড়ানো হয়েছে।
বেতন-ভাতা ছাড়াই ৬ খাতে ব্যয় ২১১ কোটি টাকা: চা খাওয়াতে ৬ কোটি ৪৩ লাখ
বেতন-ভাতা ছাড়াই ৮টি খাতে প্রাইম ইসলামী লাইফ ব্যয় করেছে ২১১ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু চা খেতেই খরচ করছে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এই ব্যয় করা হয়েছে গত ১১ বছরে। এই হিসেবে গড়ে প্রতি বছর ব্যয় হয়েছে ১৯ কোটি ২২ লাখ টাকা।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, প্রাইম ইসলামী লাইফের কর্মকর্তা কর্মচারি রয়েছে ১ হাজার ২৫ জন। আর সারাদেশে অফিস রয়েছে ১১৮টি। কোম্পানিতে গাড়ি রয়েছে ৬১টি।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনসুারে, ট্রাভেলিং ও কনভেন্স খাতে মোট ১১৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা অর্থাৎ বছরে গড়ে ১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বা প্রতি মাসে ৮৭ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।

কোম্পানিটি উন্নয়ন সভা ও কনফারেন্স করতে ব্যয় করেছে ১৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। যা প্রতি বছর গড়ে ১ কোটি ৪৯ কোটি টাকা।
গাড়ির জ্বালানী ও মেরামত বাবদ ব্যয় করেছে ৪৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরে গড়ে ৪ কোটি ৪ লাখ টাকা, যা প্রতি মাসে ৩৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
এছাড়াও ইলেকট্রিসিটি ও টেলিফোন ব্যয় মোট ২৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরে ২ কোটি ৯ লাখ টাকা ও মাসে ১৭ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
অফিস আপ্যায়ন ও চা খেতে ব্যয় করেছে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। প্রতি মাসে খরচ করা হয়েছে ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।
এ ছাড়াও অফিসের অন্যান্য সাধারণ ব্যয় ৫ কোটি ৪ লাখ টাকা। এ খাতে বছরে ৪৬ লাখ টাকা বা মাসিক ৪ লাখ টাকা খরচ করেছে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
গোঁজামিলের হিসাব: ১৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকার ব্যয় গোপন
আইন অনুসারে লাইফ বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনার ব্যয়ের হিসাব করা হয় দাবি পরিশোধ বাবদ ব্যয় ও মূলধনজনিত ব্যয় বাদ দিয়ে; বাকি সকল ধরনের ব্যয়কেই হিসাবে ধরে। অথচ প্রাইম ইসলামী লাইফ ৯টি খাতের ব্যয়কে ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসেবে না ধরে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাব করেছে। এসব খাতের মধ্যে রয়েছে- রেটস এন্ড ট্যাক্সেস, সুদ বাবদ ব্যয়, স্থায়ী সম্পদের অবচয়, ইউএমপি খরচ, জাতীয় বীমা দিবসের খরচ, অনাদায়ী দেনা, শেয়ার বিক্রয়ে ক্ষতি বাবদ ব্যয়।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ১১ বছরে (২০১৫-২০২৫) এই ৯টি খাতে ব্যয় হয়েছে ৩৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এই টাকা ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাবে ধরেনি প্রাইম ইসলামী লাইফ। এই ৯টি খাতের ব্যয় হিসাবে না ধরে আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে প্রাইম ইসলামী লাইফ।
আর্থিক প্রতিবেদনে ১০ বছরে প্রাইম ইসলামী লাইফ ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়েছে ১ হাজার ৪শ’ ১৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আর ৯টি খাতের ব্যয় বাবদ ৩৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে প্রকৃত ব্যবস্থাপনা ব্যয় হবে ১ হাজার ৪শ’ ৫৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
তবে প্রাইম ইসলামী লাইফের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের অনুমোদন ছিল ১ হাজার ৪শ’ ৩৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অথচ প্রাইম ইসলামী লাইফ হিসাব দিয়েছে ২৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যবস্থাপনা ব্যয় কম হয়েছে।

লাইসেন্সবিহীন ৭২ এজেন্টকে প্রদান ৯৮ লাখ টাকা
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এস এফ আহমেদ এন্ড কোং এর বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে লাইসেন্স ছাড়াই ৭২ জন এজেন্টকে কমিশন দেয়া হয় ৯৮ লাখ ১৪ হাজার ২শ’ ৩৪ টাকা। অথচ আইন অনুসারে লাইসেন্স ছাড়া কোনো এজেন্টকে কমিশন দেয়া বেআইনি।
লভ্যাংশের নামে আত্মসাৎ ৯৯ লাখ টাকা
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২১ সালের ভ্যালুয়েশন রিপোর্টে বলা হয়েছে- প্রাইম ইসলামী লাইফের ঘাটতি ছিল ৬৭৬ কোটি ৯৯ লাখ ৮৪ হাজার ৯শ’ ৯০ টাকা। অথচ এই ঘাটতি থাকার পরও ২০২৩ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারা ডিভিডেন্ড নিয়েছেন।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পরিচালক ও শেয়ার হোল্ডাররা ২০২৩ সালে ২% অর্থাৎ ৬১ লাখ ৪ হাজার ৪৬ টাকা ও ২০২৪ সালে ১% অর্থাৎ ৩০ লাখ ৫২ হাজার ২৩ টাকা এবং ২০২৪ সালে ০.২৫% হারে অর্থাৎ ৭ লাখ ৬৩ হাজার ৬ টাকা লভ্যাংশ নিয়েছেন।
অর্থাৎ তিন বছরে সবমিলিয়ে ডিভিডেন্ড নিয়েছে ৯৯ লাখ ১৯ হাজার ৭৫ টাকা। আইনে এই টাকা ফেরত দেয়ার বিধান রয়েছে।
প্রিমিয়ামের পুরো টাকা ব্যাংকে জমা হয় না, খরচ করা হয় নগদে
প্রিমিয়ামের পুরো টাকাই জমা করতে হয় ব্যাংকে। অপরদিকে নগদে খরচের কোনো নিয়ম নেই। অথচ প্রাইম ইসলামী লাইফ প্রিমিয়ামের টাকা থেকে খরচের টাকা কেটে রেখে প্রিমিয়ামের বাকি টাকা ব্যাংকে জমা করেছে। আবার এজেন্টদের খরচ দিয়েছে নগদে। এমনকি লাইসেন্স নাই এমন এজেন্টদেরকেও কমিশন দিয়েছে প্রাইম ইসলামী লাইফ।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিটি সার্ভিস সেন্টার কর্তৃক ২০২২ থেকে ২০২৪ সালে ৩ কোটি ৮৭ হাজার ১শ’ ৪৫ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে। এই প্রিমিয়াম আয়ে ব্যয় হয়েছে ৮৮ লাখ ১২ হাজার ২শ’ ৬৬ টাকা। ব্যয় বাবদ টাকা কেটে রেখে বাকি টাকা ব্যাংকে জমা করেছে প্রাইম ইসলামী লাইফ।
এছাড়াও প্রাইম ইসলামী লাইফের সিটি সার্ভিস সেন্টার প্রিমিয়াম থেকে কমিশন, বেতন ভাতা, এসবি, মেয়াদোত্তীর্ন দাবি, যাতায়াত খরচ, মোবাইল বিল, ইনসেনটিভ ইত্যাদি খাতে ২০২২ সালে ৩৪ লাখ ৩১ হাজার ৬০ টাকা, ২০২৩ সালে ৫০ লাখ ১৯ হাজার ৮শ’ ৯৮ টাকা এবং ২০২৩ সালে ১ কোটি ৬৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯শ’ ৪৮ টাকা নগদে ব্যয় করেছে।
যা বলছে প্রাইম ইসলামী লাইফ
ব্যয় গোপনসহ হিসাবে কারসাজিতে লাইফ ফান্ড বৃদ্ধির বিষয়ে প্রাইম ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামছুল আলম ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’কে বলেন, এখানে যেসব অভিযোগ এসেছে সেগুলোর প্রায় সবই অনেক আগের। তাছাড়া লাইফ বীমার ক্ষেত্রে বছরের শেষে প্রিমিয়াম আয় বেশি হয়, আর এ কারণেই আউটস্ট্যান্ডিং বেশি মনে হচ্ছে। তবে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেশি হলেও মোট ব্যবস্থাপনা ব্যয় আমাদের কম হয়েছে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।