বীমার সাত মূলনীতি: বাংলাদেশে বাস্তবায়ন কতটা?

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: একটি দুর্ঘটনা, একটি অসুস্থতা কিংবা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। জীবনের কঠিন সময়ে মানুষ আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বীমার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু একটি কার্যকর বীমা ব্যবস্থার জন্য শুধু কোম্পানি ও পলিসি থাকলেই হয় না, প্রয়োজন সঠিক নীতি ও তার বাস্তব প্রয়োগ।

বাংলাদেশে বীমা খাতের আকার বাড়লেও বীমার মৌলিক নীতিগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দেশের অর্থনীতি ও জনসংখ্যার আকার বিবেচনায় বীমা খাতের সম্ভাবনা অনেক বড় হলেও মানুষের অংশগ্রহণ এখনো প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৮২টি বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ৩৬টি লাইফ বীমা এবং ৪৬টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি। দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। অর্থনীতির আকারও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তারপরও বীমা গ্রহণের হার এখনো অনেক কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে শুধু নতুন পলিসি বিক্রি বাড়ালেই হবে না; বরং বীমার মৌলিক নীতিগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত বীমার সাতটি মূলনীতি হলো- সর্বোচ্চ সততা, বীমাযোগ্য স্বার্থ, ক্ষতির প্রত্যক্ষ কারণ, ক্ষতিপূরণ, অধিকার হস্তান্তর, অবদান এবং ক্ষতি কমানোর নীতি। এসব নীতি শুধু বীমা চুক্তির আইনি ভিত্তি নয়, বরং একটি স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও কার্যকর বীমা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। নীতিগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে গ্রাহক সুরক্ষা বাড়বে এবং বীমা ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশের বীমা খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের অংশগ্রহণ কম থাকা। আইডিআরএ ও আন্তর্জাতিক বীমা বিশ্লেষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বীমা গ্রহণের হার দীর্ঘদিন ধরে ১ শতাংশের নিচে রয়েছে। ২০১৯ সালের হিসাবে বাংলাদেশের বীমা গ্রহণের হার ছিল প্রায় ০.৪৯ শতাংশ। একই সময়ে ভারতের হার ছিল ৩.৭৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ৪.৭২ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ২.২৪ শতাংশ। মাথাপিছু বীমা প্রিমিয়ামের দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। ২০১৯ সালে দেশের বীমা ঘনত্ব ছিল মাত্র ৯ মার্কিন ডলার। অথচ সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় এই হার ছিল অনেক বেশি। এসব পরিসংখ্যান দেখায়, দেশের বীমা খাতে সম্ভাবনা থাকলেও এর বিস্তারে বড় বাধা হলো সীমিত অংশগ্রহণ।

বীমার সাত মূলনীতির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো সর্বোচ্চ সততা। এই নীতির অর্থ হলো, গ্রাহক ও বীমা কোম্পানি উভয় পক্ষকেই প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো তথ্যের ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। অনেক গ্রাহক পলিসির সব শর্ত, সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা না বুঝেই বীমা করেন। কোন বিষয় বীমার আওতায় থাকবে এবং কোন পরিস্থিতিতে দাবি গ্রহণযোগ্য হবে না, এসব বিষয় অনেক সময় পরিষ্কারভাবে জানানো হয় না। ফলে দাবি করার সময় জটিলতা তৈরি হয়। সহজ ভাষায় পলিসির শর্ত ব্যাখ্যা করা, গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য প্রদান করলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বীমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো বীমাযোগ্য স্বার্থ। এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বীমা করছে, তার সেই সম্পদ বা বিষয়ের ওপর প্রকৃত আর্থিক স্বার্থ থাকতে হবে। বাংলাদেশে এই নীতি কার্যকর থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে ধারণা এখনো সীমিত। একইভাবে দাবি নিষ্পত্তির সময় ক্ষতির প্রত্যক্ষ কারণ নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ক্ষতি কী কারণে হয়েছে, সেটি যাচাই করেই বীমা কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এই বিষয়টি গ্রাহকদের কাছে পরিষ্কার না হওয়ায় অনেক সময় বিরোধ তৈরি হয়।

ক্ষতিপূরণ নীতির উদ্দেশ্য হলো ক্ষতির পর গ্রাহককে আগের আর্থিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। বীমার মাধ্যমে অতিরিক্ত লাভ করা এর উদ্দেশ্য নয়। তবে সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, ক্ষতির পরিমাণ যাচাই এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। একইভাবে অধিকার হস্তান্তর ও অবদান নীতির সঠিক প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একাধিক বীমা বা তৃতীয় পক্ষের ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে এসব নীতি দাবি নিষ্পত্তিকে আরও সুশৃঙ্খল করতে পারে।

বীমা খাতে মানুষের অংশগ্রহণ কম থাকার অন্যতম কারণ হলো দাবি নিষ্পত্তির ধীরগতি ও জটিলতা। একজন গ্রাহক বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দেন এই প্রত্যাশায় যে বিপদের সময়ে তিনি দ্রুত আর্থিক সহায়তা পাবেন। কিন্তু দাবি করার পর দীর্ঘ অপেক্ষা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতা কিংবা পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা না পাওয়ার কারণে অনেক গ্রাহকের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। ফলে দাবি নিষ্পত্তি এখন বাংলাদেশের বীমা খাতের কার্যকারিতা মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে।

আইডিআরএ-এর তথ্য অনুযায়ী, নন-লাইফ বীমা খাতে দাবি নিষ্পত্তির বিষয়টি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালে সাধারণ বীমা খাতে মোট দাবির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ দাবি তখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। অন্যদিকে লাইফ বীমা খাতেও অনিষ্পন্ন দাবি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে কিছু কোম্পানি তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। মেটলাইফ বাংলাদেশ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে তারা প্রায় ২ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তি করেছে। তাদের দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল প্রায় ৯৭.৭৯ শতাংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের বীমা খাত নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও অতিবৃষ্টির কারণে প্রতিবছর বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু বীমা, কৃষি বীমা এবং বন্যা বীমার প্রয়োজন বাড়ছে। বিশেষ করে কৃষকদের জন্য আবহাওয়া নির্ভর বীমা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে দুর্যোগের পর দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব হবে।

তবে জলবায়ু ঝুঁকি বীমা কোম্পানির জন্যও বড় পরীক্ষা। বড় ধরনের দুর্যোগ হলে একসঙ্গে অনেক দাবি তৈরি হয়। এতে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ পড়ে। তাই শক্তিশালী পুনর্বীমা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতি কমানোর নীতির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্যোগের আগে ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগও বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের বীমা খাতে ক্ষুদ্র বীমার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের অনেক মানুষ এখনো আনুষ্ঠানিক ঝুঁকি সুরক্ষার বাইরে রয়েছে। কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহজ ও কম খরচের বীমা চালু করা গেলে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বীমার আওতায় আনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, দুর্ঘটনা ও কৃষি বীমার মতো পণ্যগুলো সহজলভ্য করা গেলে বীমার ব্যবহার আরও বাড়তে পারে।

ডিজিটাল প্রযুক্তিও বাংলাদেশের বীমা খাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। দেশে ১৮ কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ রয়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রাম পর্যায়ে বীমা পৌঁছে দেয়া সম্ভব। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে জাল দাবি শনাক্ত করা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা এবং দ্রুত দাবি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ভবিষ্যতে বীমা ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে পারে।

আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে বাংলাদেশের বীমা খাতের অগ্রগতি নির্ভর করবে বীমার মৌলিক নীতিগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। শুধু নতুন পলিসি বিক্রি নয়, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, স্বচ্ছতা, গ্রাহক সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বীমার সাতটি মূলনীতি যদি বাস্তবে কার্যকর করা যায়, তাহলে এই খাত দেশের আর্থিক নিরাপত্তা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে নীতিগুলোর বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে বীমা খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারবে না।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।