চীনের বীমা খাতে নতুন গতি: প্রিমিয়াম আয় বাড়ছে, তবে বাড়ছে দাবি পরিশোধের চাপও

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বীমা ব্যবসা বাড়ছে চীনে, বাড়ছে মানুষের আস্থাও। নতুন পলিসি, নতুন গ্রাহক এবং বাড়তে থাকা প্রিমিয়াম আয়ে শক্ত অবস্থান দেখাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বড় এই বীমা খাত। তবে একই সঙ্গে বাড়ছে ক্ষতিপূরণ দেয়ার খরচ।

২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে চীনের বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় বেড়েছে ৬.২ শতাংশ, কিন্তু দাবি ও সুবিধা পরিশোধ বেড়েছে আরও বেশি, ৭.৫ শতাংশ। ফলে চীনের বীমা খাত এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণ নয়, বরং লাভজনকতা ধরে রাখা এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।

চীনের বীমা তদারকি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশটির বীমা কোম্পানিগুলো মোট ৩৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বীমা প্রিমিয়াম আয় করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় বেড়েছে ৬.২ শতাংশ। একই সময়ে নতুন ইস্যু করা বীমা পলিসির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২.১ বিলিয়ন, যা আগের বছরের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধি দেখায়, চীনের মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উভয়ের মধ্যে আর্থিক নিরাপত্তা এবং ঝুঁকি সুরক্ষার চাহিদা বাড়ছে।

চীনের বীমা শিল্প বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাত। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ২৫০টির বেশি বীমা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লাইফ বীমা কোম্পানি, নন-লাইফ বীমা কোম্পানি, স্বাস্থ্য বীমা প্রতিষ্ঠান, পুনর্বীমা কোম্পানি এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত বীমা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মালিকানার দিক থেকে এসব প্রতিষ্ঠান মূলত তিন ধরনের- রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, বেসরকারি এবং যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বড় গ্রাহকভিত্তি, শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি এবং দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কারণে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা এবং নতুন ধরনের বীমা পণ্যের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে।

চীনের বীমা খাত দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত, লাইফ বীমা এবং নন-লাইফ বীমা। লাইফ বীমার মধ্যে জীবন সুরক্ষা, সঞ্চয়ভিত্তিক বীমা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অবসরকালীন বীমা পণ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে নন-লাইফ বীমার মধ্যে রয়েছে গাড়ি বীমা, সম্পত্তি বীমা, কৃষি বীমা, দুর্ঘটনা বীমা এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকি সুরক্ষা। পাশাপাশি বড় ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য পুনর্বীমা এবং বিশেষায়িত বীমা প্রতিষ্ঠানও বীমা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

চীনের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪১ কোটি। এর মধ্যে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯০ কোটির বেশি। তবে দেশটির সবচেয়ে বড় জনসংখ্যাগত পরিবর্তন হলো বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি। বর্তমানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশের বেশি। এই পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য বীমা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সেবা এবং অবসরকালীন সুরক্ষা পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তবে একই সঙ্গে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

চীনের লাইফ বীমা খাত এখনো বীমা খাতের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে। সঞ্চয়ভিত্তিক লাইফ বীমা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অবসরকালীন বীমা পণ্য এই খাতের প্রধান চালিকা শক্তি। অন্যদিকে সাধারণ বীমার মধ্যে গাড়ি বীমা, সম্পত্তি বীমা, কৃষি বীমা এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকি সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নন-লাইফ বীমার চাহিদাও বাড়ছে।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে চীনের বীমা কোম্পানিগুলো ১৩৩.৪ বিলিয়ন ডলার দাবি ও সুবিধা পরিশোধ করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই ব্যয় বেড়েছে ৭.৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রিমিয়াম আয়ের তুলনায় দাবি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। স্বাস্থ্য বীমায় চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধি, গুরুতর রোগের চিকিৎসা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সম্পদ ক্ষতির কারণে দাবি ব্যয়ের চাপ বেড়েছে।

বীমা বিশ্লেষকদের মতে, দাবি ব্যয়ের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশেষ করে নন-লাইফ বীমা খাতে ক্ষতি অনুপাত এবং সম্মিলিত অনুপাতের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে কোম্পানিগুলোর মূল ব্যবসা থেকে পাওয়া আন্ডাররাইটিং মুনাফা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে শক্তিশালী বিনিয়োগ আয়, পর্যাপ্ত মূলধন এবং উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এই চাপ মোকাবিলায় সহায়তা করছে।

চীনের বড় ও সফল বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে চায়না লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পিং আন ইন্স্যুরেন্স, চায়না প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স এবং পিআইসিসি প্রপার্টি অ্যান্ড ক্যাজুয়ালটি।

চায়না লাইফ রাষ্ট্রীয় সমর্থন, বিশাল গ্রাহকভিত্তি এবং দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কারণে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে পিং আন ইন্স্যুরেন্স প্রযুক্তি ব্যবহারে চীনের অন্যতম এগিয়ে থাকা বীমা প্রতিষ্ঠান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল পলিসি বিক্রি এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। পিআইসিসি নন-লাইফ বীমা খাতে গাড়ি, সম্পত্তি, কৃষি ও দুর্ঘটনা বীমায় বড় ভূমিকা পালন করছে।

চীনের বীমা খাত নিয়ন্ত্রণ করে জাতীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রশাসন। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে পুরো বীমা শিল্পের সমন্বিত সক্ষমতা অনুপাত ছিল প্রায় ১৮১ শতাংশ এবং মূল সক্ষমতা অনুপাত ছিল ১৩১.৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান দেখায়, সামগ্রিকভাবে চীনের বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভিত্তি এখনো শক্তিশালী রয়েছে।

চীনের বীমা খাত দেশটির অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উৎপাদন, প্রযুক্তি, রপ্তানি, অবকাঠামো এবং পরিষেবা খাতনির্ভর অর্থনীতিতে বীমা কোম্পানিগুলো বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করছে। দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সরবরাহের মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করছে।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।