মহাকাশ বর্জ্যের আর্থিক ঝুঁকিতে এবার বীমা কোম্পানিগুলো!

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় মহাকাশ বর্জ্য ছিল বিজ্ঞানীদের চিন্তার বিষয়। এখন সেটি বীমা কোম্পানিগুলোর বড় আর্থিক ঝুঁকি। পৃথিবীর কক্ষপথে স্যাটেলাইটের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অচল স্যাটেলাইট, রকেটের ভাঙা অংশ ও ক্ষুদ্র ধাতব কণা।

এসব বর্জ্যের একটি ছোট টুকরোও কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের স্যাটেলাইট ধ্বংস করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের বড় বীমা দাবির একটি অংশ তৈরি হতে পারে পৃথিবীর মাটিতে নয়, বরং পৃথিবীর বহু ওপরে মহাকাশে।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ২০২৫ সালের মহাকাশ পরিবেশ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নজরদারি নেটওয়ার্কগুলো বর্তমানে কক্ষপথে প্রায় ৪০ হাজার বস্তু অনুসরণ করছে। এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার সক্রিয় স্যাটেলাইট। তবে মহাকাশে থাকা সব বস্তু শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

সংস্থাটির হিসাবে, ১০ সেন্টিমিটারের বড় বস্তু রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি। ১ থেকে ১০ সেন্টিমিটার আকারের ধ্বংসাবশেষ প্রায় ১২ লাখ। আর ১ মিলিমিটার থেকে ১ সেন্টিমিটার আকারের কণার সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি। কক্ষপথে থাকা সব বস্তুর মোট ভর ১৬ হাজার ৬০০ টনেরও বেশি। এ পর্যন্ত বিস্ফোরণ, সংঘর্ষ বা ভেঙে যাওয়ার ৬৬০টির বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে। পৃথিবী থেকে দুই হাজার কিলোমিটারের নিচের এই অঞ্চলেই বেশির ভাগ নতুন স্যাটেলাইট পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগ ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দেয়।

বিশেষ করে ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার উচ্চতায় সক্রিয় স্যাটেলাইটের ঘনত্ব দ্রুত বেড়েছে। অন্যদিকে, ৮০০ থেকে ১ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় বহু পুরোনো ও অচল বস্তু বছরের পর বছর ঘুরছে। তাই ওই এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষের ঝুঁকি বেশি। ১০ সেন্টিমিটারের বড় শনাক্ত বর্জ্যের অর্ধেকেরও বেশি নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে রয়েছে।

মহাকাশ বর্জ্য এত বিপজ্জনক হওয়ার মূল কারণ এর গতি। নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে এসব বস্তু ঘণ্টায় প্রায় ২৮ হাজার কিলোমিটার বেগে চলতে পারে। ফলে কয়েক মিলিমিটার আকারের একটি কণাও স্যাটেলাইটের সৌর প্যানেল, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বড় কোনো বস্তু আঘাত করলে পুরো স্যাটেলাইটই অকেজো হয়ে যেতে পারে।

এই বাস্তবতায় স্যাটেলাইট বীমার আন্ডাররাইটিং পদ্ধতিও বদলে যাচ্ছে। আগে আন্ডাররাইটাররা মূলত উৎক্ষেপণযানের নির্ভরযোগ্যতা, স্যাটেলাইটের নকশা, নির্মাতার অভিজ্ঞতা এবং কক্ষপথে পৌঁছানোর সক্ষমতা মূল্যায়ন করতেন।

এখন আরও অনেক নতুন ঝুঁকি-সূচক বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কক্ষপথের উচ্চতা, ওই এলাকায় স্যাটেলাইট ও বর্জ্যের ঘনত্ব, সংঘর্ষ সতর্কতার সংখ্যা, কক্ষপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা, অবশিষ্ট জ্বালানি এবং স্বয়ংক্রিয় সংঘর্ষ-পরিহার ব্যবস্থা।

এর পাশাপাশি ভূমি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং স্যাটেলাইটের কার্যকাল শেষে সেটিকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনাও দেখা হচ্ছে। একটি স্যাটেলাইট কত দ্রুত সতর্কবার্তায় সাড়া দিতে পারে, অন্য অপারেটরের সঙ্গে কক্ষপথের তথ্য ভাগ করে কি না এবং নিয়ন্ত্রণ হারালে কত দিনে বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসবে- এসব বিষয়ও এখন গুরুত্বপূর্ণ।

অপারেটরের আগের দুর্ঘটনা, ব্যর্থতা ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির ইতিহাসও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই নক্ষত্রমণ্ডলের অনেক স্যাটেলাইট যদি একই সফটওয়্যার, যন্ত্রাংশ বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে, তাহলে একটি ত্রুটি একসঙ্গে অনেক স্যাটেলাইটে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে সাইবার হামলা, সফটওয়্যার ত্রুটি এবং একটি প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও নতুন ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে মেগা-স্যাটেলাইট নক্ষত্রমণ্ডল। স্পেসএক্সের স্টারলিংক, অ্যামাজনের প্রজেক্ট কুইপার এবং চীনের গুওওয়াং প্রকল্প হাজার হাজার স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলো ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার সংঘর্ষ-পরিহার কৌশল সম্পন্ন করে। জুন ২০২৫ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত এক বছরে এই সংখ্যা ৩ লাখ ৫৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

তবে প্রতিটি কক্ষপথ পরিবর্তন নিশ্চিত সংঘর্ষের ইঙ্গিত দেয় না। স্পেসএক্স তুলনামূলক কম ঝুঁকির সতর্কতাতেও স্যাটেলাইট সরিয়ে নেয়। তারপরও এই বিপুল সংখ্যা কক্ষপথে বাড়তে থাকা পরিচালন চাপকে স্পষ্ট করে।

বীমা শিল্পের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো কেসলার সিনড্রোম। একটি সংঘর্ষ থেকে হাজার হাজার নতুন ধ্বংসাবশেষ তৈরি হতে পারে। সেগুলো আবার অন্য স্যাটেলাইটে আঘাত করতে পারে। এভাবে একের পর এক সংঘর্ষের শৃঙ্খল তৈরি হলে নির্দিষ্ট কক্ষপথ দীর্ঘ সময়ের জন্য অনিরাপদ হয়ে পড়তে পারে।

একই সঙ্গে অনেক স্যাটেলাইট ক্ষতিগ্রস্ত হলে বীমা শিল্পে বড় ধরনের সম্মিলিত ক্ষতি তৈরি হবে। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো একাধিক পলিসিতে একসঙ্গে দাবি সৃষ্টি করতে পারে। তখন বীমা ও পুনর্বীমা খাতে বড় চাপ পড়বে।

মহাকাশ বীমা খাত তুলনামূলক ছোট। তাই বড় দাবির প্রভাবও বেশি। শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বৈশ্বিক মহাকাশ বীমা খাতে বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলার প্রিমিয়াম সংগৃহীত হয়।

২০২৩ সালে মহাকাশ বীমা খাতের প্রিমিয়াম আয় ছিল আনুমানিক ৫৫ কোটি ডলার। অথচ ওই বছর ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০ কোটি ডলার। শুধু বছরের দ্বিতীয়ার্ধেই প্রায় ৮২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের দাবি আসে। এর পর অনেক বীমাকারী সক্ষমতা কমায় বা খাত থেকে সরে যায়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বেশ কিছু ঝুঁকির প্রিমিয়ামও বাড়ে।

তবে সব ধরনের মহাকাশ ঝুঁকির প্রিমিয়াম একই হারে বদলায় না। তাই প্রিমিয়াম নির্ধারণে স্যাটেলাইটের মূল্য, উৎক্ষেপণযান, কক্ষপথ, কভারেজের মেয়াদ, প্রযুক্তির পরীক্ষিত ইতিহাস এবং বীমা ও পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাই মহাকাশ বর্জ্যের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রিমিয়াম নির্দিষ্ট ২০ বা ৫০ শতাংশ বেড়েছে, এমন একক হার দেয়া ঠিক নয়। ২০২৪ সালে বড় ক্ষতির পর আন্ডাররাইটাররা কঠোর শর্ত ও বেশি হার প্রয়োগ করেন। তবে ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ায় কিছু ভালো ঝুঁকির প্রিমিয়াম কিছুটা কমার লক্ষণও দেখা যায়।

বড় অঙ্কের স্যাটেলাইট ঝুঁকি সাধারণত কোনো একক বীমা কোম্পানি বহন করে না। কয়েকটি বীমা ও পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ঝুঁকি ভাগ করে নেয়। কিন্তু একটি বড় সংঘর্ষে একই কক্ষপথের অনেক স্যাটেলাইট ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিভিন্ন পলিসিতে একসঙ্গে দাবি আসতে পারে।

এ কারণে আন্ডাররাইটাররা এখন শুধু একটি স্যাটেলাইটের মূল্য হিসাব করছেন না। একই কক্ষপথ বা একই নক্ষত্রমণ্ডলে থাকা সব স্যাটেলাইট মিলিয়ে মোট কত আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে, সেটিও বিবেচনা করছেন।

আইনগত অনিশ্চয়তাও বড় চ্যালেঞ্জ। ১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি এবং ১৯৭২ সালের লায়াবিলিটি কনভেনশন মূলত রাষ্ট্রের দায় নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বর্তমান বাণিজ্যিক মহাকাশ অর্থনীতি অনেক বেশি জটিল।

দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইটের সংঘর্ষ হলে দায় কে নেবে, তথ্য গোপন করলে কী হবে, ভুল কক্ষপথ বা অবহেলার দায় কীভাবে ভাগ হবে- এসব প্রশ্নের স্পষ্ট আন্তর্জাতিক উত্তর এখনো নেই। ক্ষতিপূরণ আদায়, কোন দেশের আইন কার্যকর হবে এবং দায় কীভাবে প্রমাণ করা হবে- এসব অনিশ্চয়তা আন্ডাররাইটিংকে আরও কঠিন করে তুলছে।

তবে এই সংকট নতুন বীমা পণ্যের সুযোগও তৈরি করছে। প্রচলিত উৎক্ষেপণ ও কক্ষপথকালীন কভারেজের পাশাপাশি ভবিষ্যতে মহাকাশ যান চলাচল, ধ্বংসাবশেষজনিত দায়, সাইবার ঝুঁকি, সেবা বন্ধ থাকা, কক্ষপথে মেরামত এবং সক্রিয়ভাবে বর্জ্য সরানোর জন্য আলাদা কভারেজ তৈরি হতে পারে।

বর্তমান সর্বঝুঁকি স্যাটেলাইট সম্পদ বীমায় ধ্বংসাবশেষের আঘাত অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে তৃতীয় পক্ষের দায়, দীর্ঘ সময় সেবা বন্ধ থাকা এবং একই সঙ্গে বহু স্যাটেলাইট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে এখনো বড় সুরক্ষা-ঘাটতি রয়েছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ও ম্যাককিনসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতি ২০২৩ সালের ৬৩ হাজার কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৫ সালে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৯ শতাংশ।

এত বড় অর্থনীতির তুলনায় বর্তমান মহাকাশ বীমা খাত এখনো খুব ছোট। ফলে পর্যাপ্ত প্রিমিয়াম, পুনর্বীমা সক্ষমতা, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং সম্মিলিত ক্ষতির সঠিক মডেল তৈরি করা আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

মহাকাশ এখন যোগাযোগ, নেভিগেশন, আবহাওয়া পূর্বাভাস, আর্থিক লেনদেন, প্রতিরক্ষা ও জরুরি সেবার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই কক্ষপথকে নিরাপদ রাখা শুধু প্রযুক্তিগত দায়িত্ব নয়। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও জরুরি।

মহাকাশ বর্জ্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে, আগামী দিনের বড় বীমা ঝুঁকিগুলোর একটি পৃথিবীর মাটিতে নয়, বরং পৃথিবীর ওপরে কক্ষপথে ঘুরছে। যে বীমা ও পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান এই ঝুঁকি দ্রুত বুঝতে, মাপতে এবং মূল্য নির্ধারণ করতে পারবে, ভবিষ্যতের মহাকাশ অর্থনীতিতে তারাই এগিয়ে থাকবে।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।