৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য গোপন রূপালী লাইফের

গাযী আনোয়ার: রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই ১১ বছরে প্রায় সাড়ে ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য গোপন করে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। অপর দিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কতৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে অতিরিক্ত ব্যয় পুনঃভরণ বা সমন্বয়ের প্রতিজ্ঞা না রাখার পাশাপাশি মিথ্যা তথ্যও দাখিল করেছে কোম্পানিটি।

আইডিআরএ’র অফিসার মো. শামসুল আলম খান স্বাক্ষরিত ২০১৬ সালের ৬ এপ্রিলের এক পত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই সময়ে নির্ধারিত সীমার চেয়ে ব্যবস্থাপনায় কোম্পানিটির অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা পরবর্তী ৫ বছরে খরচ কমিয়ে ব্যয় পুনঃভরণের নির্দেশনা দেয়া হয়। এই তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংস্থায় সরবরাহ করা হয়।

রূপালী লাইফ আইন লঙ্ঘন করে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাব কালে অতিরিক্ত ব্যয়ের তথ্য গোপন করে পুনঃভরণ বিষয়ক আইডিআরএ ও দুদকের নির্দেশ লঙ্ঘন, মিথ্যা তথ্য প্রদান করে বীমা আইনের লঙ্ঘন করেছে। ফলে কোম্পানিটি পলিসি ও শেয়ার হোল্ডাররা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ মোটা অংকের রাজস্ব আয় থেকেও বঞ্চিত হয়েছে সরকার।

কোম্পানিটির বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়। মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন ও আইন অমান্য করে আর্থিক বিবরনী তৈরি করে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কম প্রদর্শনসহ তথ্য জালিয়াতির এই চিত্র উঠে এসেছে ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি’র অনুসন্ধানে।

কিভাবে কোম্পাটি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাবকালে তথ্য গোপন করে অতিরিক্ত ব্যয় গোপন করেছে, অতিরিক্ত ব্যয় থেকে কি পরিমাণ অর্থ পরবর্তী বছরের পুনঃভরণ বিষয়ক তথ্য গোপন করে তা বেশি দেখিয়েছে তা তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে আইন মেনে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাব না করে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থাপনা ব্যয় কম দেখিয়েছে। ফলে নির্ধারিত সীমার চেয়ে ব্যয় কমে তা অতিরিক্ত ব্যয় থেকে সমন্বয় হয়ে পুনঃভরণ হয়েছে।

নির্ধারিত সীমার চেয়ে ব্যয় কমিয়ে তা অতিরিক্ত ব্যয়ের সাথে পুনঃভরণ করা নির্দেশ দিয়েছিল আইডিআরএ। এ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ২০১৬ সালে। কিন্তু কোম্পানিটি নির্ধারিত সীমার চেয়ে ব্যয় কমানো দূরের কথা, অতিরিক্ত ব্যয়ই কমাতে পারেনি বরং পুনঃভরণ না করেই পুনঃভরণের মিথ্যা তথ্য দিয়ে আসছে।

হিসাব বিবরণীতে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানোর জন্য আইন লঙ্ঘনসহ মিথ্যা তথ্য প্রদানের অবৈধ এ কর্মকাণ্ড কোম্পানিটি করে আসছে বছরের পর বছর ধরে। তবে তা নজরে আসেনি বীমা খাত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) । আইনে হিসাব বিবরণীতে মিথ্যা তথ্য প্রদানের জন্য ৩ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

১১ বছরে (২০০৯-২০১৯) ৪৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য গোপন:

বীমা আইন- ২০১০ এর ৬২(২) ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘ব্যবস্থাপনা ব্যয়’ অর্থ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ব্যয়িত সমুদয় ব্যয় এবং ইহাতে নিম্নলিখিত ব্যয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত হইবে⎯ (ক) সকল প্রকার কমিশন পরিশোধ; (খ) মূলধনায়িত ব্যয়ের যথার্থ অংশ---”

আইনের এই নির্দেশনা অনুসারে, আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদর্শিত ‘স্থায়ী সম্পদের অবচয়’ ও ‘অন্যান্য ব্যয়’ খাতে ব্যয় ব্যবস্থাপনা ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোম্পানিটি এই হিসাব অন্তর্ভূক্ত না করেই বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে।

আইনের এ নির্দেশনা অনুসারে হিসাব করলে কোম্পানিটির ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল এই ১১ বছরে প্রকৃত ব্যবস্থাপনা ব্যয় দাঁড়ায় ৯২৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। কিন্তু কোম্পানিটি আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদর্শন করেছে ৮৮১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এই হিসাবে কোম্পানিটি ব্যয়ের তথ্য গোপন করেছে ৪৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

আবার একই সময়ে অনুমোদনযোগ্য ব্যয় সীমা হিসাব করা হলে তাতে দেখা যায়, এই সময়ে কোম্পানিটির অনুমোদনযোগ্য ব্যয় সীমা ছিল ৮৫৯ কোটি টাকা। সেই হিসাবে কোম্পানিটির অতিরিক্ত ব্যয় হয় ৬৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অথচ কোম্পানিটি আর্থিক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে তাদের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ২২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ আইন অনুসারে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাব না করায় ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল ১১ বছরে কোম্পানিটি ব্যয়ের তথ্য গোপন করেছে ৪৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

অতিরিক্ত ব্যয়ে মিথ্যা তথ্য:

২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল এই ৭ বছরে মধ্যে ২০১৫ সাল শেষে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৪.৪০ কোটি টাকা। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এই হিসাবটি করে রূপালী লাইফের দাখিল করা ফিনান্সিয়াল ইনডিকেটর ও ২০১৫ সালের ব্যবসা সমাপনী প্রতিবেদনে প্রদর্শিত আয় ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের এই ৪৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে পুনঃভরণের জন্য নির্দেশনাও প্রদান করে সংস্থাটি। 

তবে বাস্তব চিত্র হচ্ছে ভিন্ন। অতিরিক্ত ব্যয় থেকে কত টাকা পুনঃভরণ হয়েছে তা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে কোম্পানিটি।

রূপালী লাইফ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কাছে দাখিল করা ফিনান্সিয়াল ইনডিকেটর ও ২০১৫ সালের সমাপনী হিসাবে দেখিয়েছে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল এই ৭ বছরে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ৫০ কোটি ২৩ লাখ টাকা। নির্ধারিত সীমার চেয়ে ব্যয় কম করেছে ৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। যা অতিরিক্ত ব্যয়ের সাথে পুনঃভরণ করা হয়েছে। ফলে ২০১৫ সাল শেষে এসে পুনঃভরণেরপর অতিরিক্ত ব্যয়ের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যয় ৫০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে পুনঃভরণ হয়েছে ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০১৫ সালে এসে পুনঃভরণেরপর অতিরিক্ত ব্যয়ের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ আর্থিক প্রতিবেদনের হিসাব অনুসারে কোম্পানিটি অতিরিক্ত ব্যয় কম দেখিয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে কোম্পানিটি ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল এই ৭ বছরের মধ্যে নির্ধারিত সীমার চেয়ে ২০০৯ সালে ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা, ২০১০ সালে ৫ লাখ, ২০১৪ সালে ৯২ লাখ ২০ হাজার ও ২০১৫ সালে ৪৬ লাখ টাকা কম ব্যয় করেছে।

অথচ ফিনান্সিয়াল ইনডিকেটরস ও ২০১৫ সালে সমাপনী হিসাবে দেখিয়েছে আলোচ্য সময়ে নির্ধারিত সীমার চেয়ে কম ব্যয় করেছে ৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা । মধ্যে রয়েছে- ২০০৯ সালে ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা ২০১০ সালে ৫ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা ও ২০১৫ সালে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে কম ব্যয় করেছে। অর্থাৎ ২০১৪ সালে ১ কোটি টাকা ও ২০১৫ সালে ৭০ লাখ টাকা পুনঃভরণ বেশি দেখিয়েছে।

তবে ফিনান্সিয়াল ইনডিকেটর ও সমাপনী হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় ৪৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা উল্লেখ করা হলেও মজার বিষয় হচ্ছে পুনঃভরণ করার নির্দেশ সংক্রান্ত অপর এক পত্রে অতিরিক্ত ব্যয় উল্লেখ করা হয়েছে ৪৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এখানে হিসাবের গড়মিল ৭১ লাখ টাকার। অর্থাৎ কোম্পানিটি অতিরিক্ত ব্যয় কম পুনঃভরণের তথ্য গোপন করতে কোম্পানিটি আইন লঙ্ঘন করে আর্থিক প্রতিবেদনে হিসাব তৈরি করেছে। অপর দিকে হিসাব দাখিল সংক্রান্ত কাগজপত্রে একেক জায়গায় একেক রকম বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করেছে।

আইন অনুসারে, আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদর্শিত ‘স্থায়ী সম্পদের অবচয়’ ও ‘অন্যান্য ব্যয়’ খাতে ব্যয় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হলে কোম্পানিটির অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় ৭৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। যার মধ্যে শুধু ২০০৯ সালে ৯৫ লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারিত সীমার চেয়ে কম ব্যয় করেছে।

এই হিসেবে ২০১৫ সালের শেষে এসে কোম্পানিটির অতিরিক্ত ব্যয়ের স্থিতি দাঁড়ায় ৭৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অথচ তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দাখিল করা কাগজপত্রে তা দেখিয়েছে ৪৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটি আলোচ্য ৭ বছরে অতিরিক্ত ব্যয়ের তথ্য গোপন করেছে ৩১ কোটি ২২ লাখ টাকার।

আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদর্শিত ‘স্থায়ী সম্পদের অবচয়’ ও ‘অন্যান্য ব্যয়’ খাতে ব্যয় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত করে হিসাব করে দেখা যায়, কোম্পানিটি ২০১০ সালে ৪ কোটি ৫৮ লাখ ২০ হাজার টাকা, ২০১১ সালে ৩৫ কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, ২০১২ সালে ২৬ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ২০১৩ সালে ৮ কোটি ৯২ লাখ ২০ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে ৭৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা ও ২০১৫ সালে ১ কোটি ২০ লাখ ৮০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে।

পুনঃভরণের নামেও তথ্য গোপন:

কোম্পানিটির দাখিলকৃত তথ্যের সঠিকতা যাচাই বাছাই না করেই রূপালী লাইফের অতিরিক্ত ব্যয় ৪৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা হিসাবে ধরে নিয়ে তা পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে পুনঃভরণের নির্দেশ দেয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) । এই নির্দেশনায় বিষয়ে আইডিআরএ দেশের শীর্ষ স্থানীয় গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।  

বিগত ২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশন অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আইডিআরএ’কে নির্দেশ দেয়া হয়। দুদক সচিব ড. মো. শামসুল আরেফিন স্বাক্ষরিত ওই পত্রে বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে কমিশনকে অবহিত করার অনুরোধ করা হয়।

ওই পত্রের প্রেক্ষিতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ২০১৯ সালে ১ জানুয়ারি অতিরিক্ত ব্যয়ের এই ৪৪ কোটি ৪০ লাখ পুনঃভরণের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে নির্দেশ প্রদান করে।

এ উত্তরে রূপালী লাইফ ওই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি আইডিআরএ’কে লেখা পত্রে উল্লেখ করে কোম্পানিটি ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল এই ৩ বছরে ১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা পুনঃভরণ করেছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ৮ কোটি ১ লাখ, ২০১৭ সালে ৩ কোটি ৪৪ লাখ ও ২০১৮ সালে অনিরিক্ষত হিসাব অনুসারে ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর ফলে আলোচ্য সময়ে (২০০৯-২০১৮) ২০১৮ সালের শেষে এসে অতিরিক্ত ব্যয়ের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

অথচ আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদত্ত তথ্য অনুসারে, আলোচ্য (২০১৬-২০১৮) সময়ে কোম্পানিটি অতিরিক্ত ব্যয় কমিয়েছে ১২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ৮ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার, ২০১৭ সালে ৩ কোটি ৪৩ লাখ ও ২০১৮ সালে ৪৭ লাখ ২০ হাজার। অর্থাৎ আর্থিক প্রতিবেদনের হিসাব অনুসারেও কোম্পানিটি ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকার অতিরিক্ত ব্যয় কম করার হিসাব বেশি দেখিয়েছে।

আবার আইন অনুসারে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাব করা হলে ২০১৬ থেকে ২০১৮ এই ৩ বছরে কোম্পানিটি ব্যয় করেছে ২৮০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এ সময়ে ব্যয়ের অনুমোদনযোগ্য সীমা ছিল ২৮১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত সীমার চেয়ে ব্যয় কম করেছে মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই হিসেবে অতিরিক্ত ব্যয় কমেছে বলে বেশি দেখিয়েছে ১১ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. গোলাম কিবরিয়াকে ফোন করা হলে তিনি মোবাইলে মতামত দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

অপরদিকে রূপালী লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যয়ের তথ্য গোপন নিয়ে আইনের প্রয়োগ বিষয়ে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র আইন কর্মকর্তা দলিল উদ্দিন এর মতামত জানার জন্য ৮ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেলে ফোন করা হলে তিনি পরবর্তী রোববার যোগাযোগ করতে বলেন।

তবে ১১ জুলাই রোববার বিকেলে ফোন করা হলে তিনি অফিস চলাকালীন সময়ে যোগাযোগ করতে বলে ফোনের লাইন কেটে দেন। যদিও সরকার করোনার সংক্রমণ এড়াতে লকডাউন চলাকালে সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও বেসরকারি অফিসিয়াল কার্যক্রম যথাসম্ভব ভার্চুয়াল মাধ্যমে সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছে।

ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল বাংলাদেশ (এফআরসি) এর ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট মনিটরিং বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মাদ মহিউদ্দিন আহমেদ এফসিএ রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যয়, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও পুনঃভরণের মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন বিষয়ে ইন্স্যুরেন্সনিউজবিড’কে বলেন, কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠনের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে তথ্য গোপন প্রমাণিত হলে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি ক্রিমিনাল অফেন্সে মামলা হওয়া উচিত। কারণ আর্থিক প্রতিবেদনের সঙ্গে গ্রাহকদের স্বার্থ সরাসরি জড়িত।

তাছাড়া আর্থিক প্রতিবেদন যেহেতু নিরীক্ষিত। তার পরেও তথ্য গোপন যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, কোম্পানিটি সচেতনভাবেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। তাই তথ্য গোপনের দায়ে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে এফআরসি আইনের আওতায় ৪৮ ধারায় ৫ বছরের জেল অথবা ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে।

আর একই আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী কোম্পানিটিকে এক মাসের মধ্যে তথ্য সংশোধন করে পুনরায় তা সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে। কারণ বীমা খাতের কোম্পানিগুলোকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করতে হলে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।