সিঙ্গাপুরে প্লাস্টিক বর্জ্য কমাতে বীমা খাতের নতুন মডেল ‘ইকো ডাবাও’

আন্তর্জাতিক সংবাদ ডেস্ক: নগরজীবনের ব্যস্ততার সঙ্গে তাল মিলিয়ে টেকসই জীবনধারা গড়ে তোলা এখন বিশ্বের বড় শহরগুলোর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় ইনকাম ইন্স্যুরেন্স এবং ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার সিঙ্গাপুর যৌথভাবে চালু করেছে ‘ইকো ডাবাও’- সিঙ্গাপুরের প্রথম পাবলিক রিটার্ন-অ্যান্ড-রিইউজ টেকঅ্যাওয়ে সিস্টেম। উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য হলো একবার ব্যবহারযোগ্য খাবারের প্যাকেজিং বর্জ্য কমানো এবং পুনর্ব্যবহারকে নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত করা।
শক্তিশালী অর্থনীতি, টেকসই লক্ষ্য
সিঙ্গাপুর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির জিডিপি প্রায় ৫১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ফাইন্যান্স, শিপিং, প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সার্ভিস খাতের ওপর ভিত্তি করেই দেশটির অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষ করে ব্যাংকিং, বীমা ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট খাত সিঙ্গাপুরকে এশিয়ার অন্যতম প্রধান ফাইন্যান্সিয়াল হাবে পরিণত করেছে, যেখানে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আঞ্চলিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
নগরায়ন ও বর্জ্যের চাপ
সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৫.৯ থেকে ৬ মিলিয়ন, যার বড় অংশ কর্মক্ষম ও শহরকেন্দ্রিক। এই দ্রুতগতির নগরজীবনে টেকঅ্যাওয়ে খাবারের ব্যবহার অত্যন্ত বেশি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় ৯ লাখ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার মাত্র ৫-৬% পুনর্ব্যবহার করা হয়। ফলে পরিবেশের ওপর চাপ কমাতে টেকসই সমাধানের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে- যেখানে ‘ইকো ডাবাও’ একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে।
বীমা খাত: শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রিত
সিঙ্গাপুরের বীমা শিল্প অত্যন্ত উন্নত এবং সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা (এমএএস) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
দেশটিতে বর্তমানে লাইফ, নন-লাইফ ও রিইন্স্যুরেন্স মিলিয়ে ১৫০টির বেশি বীমা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মধ্যে ৮০টির বেশি ডিরেক্ট ইন্স্যুরার রয়েছে।
সাম্প্রতিক শিল্প পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরের জেনারেল ইন্স্যুরেন্স খাতের গ্রস রিটেন প্রিমিয়াম প্রায় ১১.২ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। লাইফ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন ব্যবসায়িক প্রিমিয়ামে ৭.৭% প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং মোট ওজনভিত্তিক নতুন প্রিমিয়াম প্রায় ২.৯৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে পৌঁছেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক অংশগ্রহণ
সিঙ্গাপুরের বীমা খাতে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক উপস্থিতি রয়েছে। এআইএ, অ্যালিয়াঞ্জ, প্রুডেনশিয়াল, টোকিও মেরিন এবং গ্রেট ইস্টার্ন-এর মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখানে সক্রিয়ভাবে ব্যবসা করছে।
এসব কোম্পানি শুধু মূলধন বিনিয়োগই নয়, বরং ডিজিটাল ইন্স্যুরেন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রিস্ক অ্যানালিটিক্স এবং ইএসজি (পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন) কৌশল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
‘ইকো ডাবাও’: প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই সমাধান
এই প্রেক্ষাপটে ‘ইকো ডাবাও’ উদ্যোগটি বীমা খাতের ইএসজি কৌশলের একটি বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে সামনে এসেছে। প্রকল্পটির আওতায় ব্যবহারকারীরা কোনো অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই পুনর্ব্যবহারযোগ্য কনটেইনার ও কাপ ব্যবহার করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট স্মার্ট স্টেশনে তা ফেরত দিতে পারেন।
এই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক সহায়তা দিচ্ছে মিউজ। তাদের তৈরি কনটেইনারগুলো ফুড-গ্রেড পলিপ্রোপিলিন দিয়ে তৈরি এবং প্রায় ১,০০০ বার পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য।
স্মার্ট স্টেশনগুলো রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ ও পরিষ্কার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে। পাশাপাশি হালাল কমপ্লায়েন্স বজায় রাখতে পৃথক প্রসেসিং ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আচরণ পরিবর্তনে প্রণোদনা
ব্যবহারকারীদের উৎসাহিত করতে কিউআর কোডভিত্তিক রিওয়ার্ড সিস্টেম চালু করা হয়েছে। কনটেইনার ফেরত দিলে ব্যবহারকারীরা এস$২ ভাউচার, কফি ডিসকাউন্ট এবং ফুড ডেলিভারি সুবিধা পাচ্ছেন।
বর্তমানে প্রায় ৮-৯টি খাদ্য ও পানীয় ব্র্যান্ড এই উদ্যোগে যুক্ত রয়েছে, যা জুলাই ২০২৬ নাগাদ ১৫টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বীমা খাতের ইএসজি নেতৃত্ব
এই উদ্যোগে প্রধান অর্থায়নকারী হিসেবে কাজ করছে ইনকাম ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটি তাদের বার্ষিক ‘ইনকাম ইকো রান’-এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন করে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য নির্বাহী অ্যান্ড্রু ইয়িও বলেন, “মানুষ পরিবেশ নিয়ে সচেতন হলেও সেই সচেতনতাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে রূপ দেয়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ‘ইকো ডাবাও’ সেই পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।”
জাতীয় লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
সিঙ্গাপুর সরকার ইতোমধ্যে ‘জিরো ওয়েস্ট মাস্টারপ্ল্যান’ এবং ‘গ্রীন প্ল্যান ২০৩০’-এর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
এই পাইলট প্রকল্পের লক্ষ্য ১০,০০০টির বেশি একবার ব্যবহারযোগ্য কনটেইনার কমানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন বিপুল টেকঅ্যাওয়ে প্যাকেজিং ব্যবহারের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের উদ্যোগ সফল হলে তা বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের জন্যও একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে।
‘ইকো ডাবাও’ শুধু একটি পরিবেশবান্ধব প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের নগর ব্যবস্থাপনা, বীমা খাতের ইএসজি বিনিয়োগ এবং নাগরিক আচরণ পরিবর্তনের একটি সমন্বিত মডেল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ইকো ডাবাও’ দেখিয়ে দিচ্ছে- বীমা খাত শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাতেই নয়, টেকসই উন্নয়ন ও নাগরিক আচরণ পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতের অর্থনীতি তাই আরও বেশি দায়িত্বশীল, টেকসই এবং ইএসজি-নির্ভর হওয়ার দিকেই এগোচ্ছে।



