বীমা পেশায় দ্রুত সাফল্যের চাবিকাঠি: বিশ্ববাজারের তুলনায় কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ব অর্থনীতিতে বীমা খাত এখন শুধু আর্থিক নিরাপত্তার মাধ্যম নয়, বরং এটি কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার বিস্তার, স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক ব্যবসা সম্প্রসারণের কারণে বিশ্বজুড়ে বীমা শিল্পের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান সুইস রি ইনস্টিটিউটের ২০২৪ সালের সিগমা রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈশ্বিক বীমা প্রিমিয়ামের পরিমাণ প্রায় ৭.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী গড় বীমা পেনিট্রেশন প্রায় ৭.২ শতাংশে অবস্থান করছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় বীমা খাত যুক্তরাষ্ট্র। ইন্স্যুরেন্স ইনফরমেশন ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক বীমা বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। দেশটিতে বীমা শিল্পে প্রায় ২৯ লাখ সরাসরি এবং ৫ লাখের বেশি পরোক্ষ কর্মসংস্থান রয়েছে। মার্কিন শ্রমবাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিজ্ঞ আন্ডাররাইটার ও রিস্ক ম্যানেজারদের বার্ষিক আয় সাধারণত ৬৭ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের মধ্যে হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে বীমা পেনিট্রেশন জিডিপির প্রায় ১১.৪ শতাংশ। এখানে রিটায়ারমেন্ট পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য বীমা এবং সাইবার রিস্ক ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারিত খাত।

যুক্তরাজ্যও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বীমা খাত। ব্রিটিশ বীমা সংস্থা এবিআই-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশটির বীমা শিল্প বছরে শত শত বিলিয়ন পাউন্ডের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। যুক্তরাজ্যে বীমা পেনিট্রেশন জিডিপির প্রায় ১২.৫ শতাংশ। অভিজ্ঞ বীমা পেশাজীবীদের বার্ষিক আয় সাধারণত ৪০ হাজার থেকে ৯০ হাজার পাউন্ডের মধ্যে হয়ে থাকে। প্রপার্টি, মোটর ও লায়াবিলিটি বীমা সেখানে সবচেয়ে বড় বাজার।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বীমা সচেতনতা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ওইসিডি ইন্স্যুরেন্স স্ট্যাটিস্টিক অনুযায়ী, জাপান এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বীমা খাত। স্ট্যাটিস্টা-এর পরিসংখ্যান বলছে, জাপানে মাথাপিছু বার্ষিক বীমা প্রিমিয়াম প্রায় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মার্কিন ডলার। দেশটিতে বীমা পেনিট্রেশন প্রায় ৮ থেকে ৯ শতাংশ। লাইফ বীমা, অবসর পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাভিত্তিক বীমার চাহিদা সেখানে সবচেয়ে বেশি। দক্ষিণ কোরিয়ায় বীমা পেনিট্রেশন ১১ শতাংশের বেশি এবং দেশটি ডিজিটাল বীমা সেবায় এশিয়ার অন্যতম অগ্রসর বাজার হিসেবে পরিচিত।

ভারতের বীমা শিল্প বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল খাতগুলোর একটি। ভারতের বীমা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির বীমা খাত বার্ষিক প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ২৫ লাখ লাইফ ইন্স্যুরেন্স এজেন্ট রয়েছে। দেশটির বীমা পেনিট্রেশন জিডিপির প্রায় ৪.২ শতাংশ। একজন বীমা পেশাজীবীর বার্ষিক আয় অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী প্রায় ৩ লাখ থেকে ১৫ লাখ ভারতীয় রুপির মধ্যে হতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠান লাইফ ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন অব ইন্ডিয়ার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৃণমূল পর্যায়ে বীমা সচেতনতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

চীনের বীমা বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। চীনের ব্যাংকিং ও বীমা নিয়ন্ত্রক কমিশনের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে ডিজিটাল স্বাস্থ্য বীমা ও অনলাইনভিত্তিক আর্থিক সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে চীনের বীমা খাত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার হিসেবে বিবেচিত।

জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে বীমা শিল্প অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর। জার্মানিভিত্তিক বৈশ্বিক বীমা প্রতিষ্ঠান আলিয়াঞ্জ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল আন্ডাররাইটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈশ্বিক বীমা শিল্পে নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। জার্মানিতে বীমা পেনিট্রেশন ৬ শতাংশের বেশি এবং সেখানে শিল্পভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত উন্নত।

দক্ষিণ আফ্রিকার বীমা খাতকে আফ্রিকার সবচেয়ে শক্তিশালী খাতগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। সুইস রি সিগমা রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশটির বীমা পেনিট্রেশন প্রায় ১২.২ শতাংশ, যা আফ্রিকার মধ্যে সর্বোচ্চ। লাইফ বীমা ও অবসরভিত্তিক আর্থিক পরিকল্পনা দেশটির বীমা শিল্পের প্রধান ভিত্তি।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও বীমা শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে স্বাস্থ্য বীমা, নির্মাণ বীমা এবং করপোরেট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে বীমা শিল্প এখনও সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বীমা পেনিট্রেশন এখনও জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মাথাপিছু বীমা প্রিমিয়াম ১০ মার্কিন ডলারেরও নিচে। তবে দেশে বর্তমানে জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে ৮০টির বেশি বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশে বীমা পেশাজীবীদের গড় বার্ষিক আয় অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। লাইফ ও সাধারণ বীমা খাত বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় কর্মসংস্থান খাত।

বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল রূপান্তরের কারণে বীমা শিল্পে ইনসিওরটেক, ডেটা বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসি অ্যান্ড কোম্পানি এবং পিডব্লিউসি-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক বৈশ্বিক বীমা কোম্পানি এখন তাদের মোট ব্যবসার প্রায় ২০ শতাংশ ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালনা করছে।

অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্স বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম উচ্চ আয়ের পেশা হিসেবে বিবেচিত। অ্যাকচুয়ারিদের পেশাগত সংস্থা এসওএ-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত দেশগুলোতে দক্ষ অ্যাকচুয়ারিদের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশে এই খাতে দক্ষ জনবলের সংখ্যা এখনও সীমিত হলেও চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বীমা পেশায় সফল হতে হলে শুধু পলিসি বিক্রি নয়; বরং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পরিকল্পনা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং ইনসিওরটেক সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে বীমা পেশাজীবীরা কেবল পণ্য বিক্রি করেন না, বরং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।

বাংলাদেশ যখন এলডিসি উত্তরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অবকাঠামো খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনও বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ বাস্তবতায় দক্ষ বীমা বিশেষজ্ঞ, ঝুঁকি বিশ্লেষক এবং আর্থিক পরিকল্পনাকারীদের চাহিদা আগামী বছরগুলোতে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সুশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া গেলে বাংলাদেশের বীমা খাত আগামী দশকে অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে।