আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শুধু প্রিমিয়াম আয় নয়, একটি বীমা কোম্পানির প্রকৃত সক্ষমতা নির্ভর করে ঝুঁকি মূল্যায়ন, দাবি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর। কিন্তু দাবি পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কার বীমা কোম্পানিগুলো এখন বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে।
২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে দেশটির বীমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত মুনাফা ২৮ শতাংশ কমেছে। স্বাস্থ্য, মোটর ও অন্যান্য সাধারণ বীমায় বাড়তে থাকা দাবির চাপ কোম্পানিগুলোর আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলেছে।
ইন্স্যুরেন্স এশিয়ার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) শ্রীলঙ্কার বীমা কোম্পানিগুলোর দাবি পরিশোধের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। দাবি ব্যয়ের এই দ্রুত বৃদ্ধি কোম্পানিগুলোর মূল বীমা ব্যবসার আয় কমিয়ে দিয়েছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম আয় স্থিতিশীল থাকলেও সামগ্রিক মুনাফা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শ্রীলঙ্কার বীমা খাতে এই চাপ তৈরি হয়েছে মূলত কয়েকটি কারণে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি, চিকিৎসা সেবার ব্যবহার বেড়ে যাওয়া, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও মেরামত খরচ বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষতিপূরণ। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও মোটর বীমায় দাবি মূল্যস্ফীতি এখন কোম্পানিগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীলঙ্কার বীমা খাত এখনো কয়েক বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি এবং মুদ্রার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের প্রভাব এখনো ব্যবসায়িক কার্যক্রমে রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের সময় সাধারণ মানুষের আয় কমে যাওয়ায় নতুন বীমা পলিসি গ্রহণের ক্ষেত্রেও চাপ তৈরি হয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি মূলত পর্যটন, পোশাক শিল্প, কৃষি, রেমিট্যান্স এবং পরিষেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের এই দেশে শ্রমশক্তির আকার প্রায় ৮০ লাখের কাছাকাছি। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হলেও মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আয় বৈষম্য এখনো সাধারণ মানুষের আর্থিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
দেশটির অর্থনীতির আকার দক্ষিণ এশিয়ার মাঝারি পর্যায়ের হলেও বীমা খাত এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। শ্রীলঙ্কায় বীমা গ্রহণের হার এখনো তুলনামূলক কম। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতির তুলনায় বীমা খাতের বিস্তার এখনো সীমিত। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা বীমা খাত সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করছে।
শ্রীলঙ্কার বীমা খাতে লাইফ ও নন-লাইফ মিলিয়ে দুই ডজনের বেশি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে শ্রীলঙ্কা বিমা নিয়ন্ত্রক কমিশন (আইআরসিএসএল)। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বীমা খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ এবং বীমা গ্রহণের হার বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।
তবে দেশটির বীমা খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা সচেতনতার ঘাটতি। অনেক মানুষ লাইফ ও স্বাস্থ্য বীমার প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও নিয়মিত পলিসি গ্রহণ করেন না। এর পেছনে কম আয়, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের সীমিত সুযোগ, বীমা পণ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে দাবি নিষ্পত্তি নিয়ে নেতিবাচক অভিজ্ঞতা ভূমিকা রাখছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে। স্বাস্থ্য ব্যয়ের বৃদ্ধি, অবসরকালীন নিরাপত্তার প্রয়োজন এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলার চিন্তা অনেক মানুষকে বীমার দিকে আকৃষ্ট করছে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সহজে পলিসি কেনা, প্রিমিয়াম পরিশোধ এবং দাবি জমা দেওয়ার সুযোগ বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হচ্ছে।
শ্রীলঙ্কার বীমা খাতে সিলনকো ইন্স্যুরেন্স, শ্রীলঙ্কা ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন, এআইএ ইন্স্যুরেন্স লঙ্কা এবং সফটলজিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এসব প্রতিষ্ঠানের তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বাজার অভিজ্ঞতা, বড় গ্রাহকভিত্তি, বিস্তৃত বিক্রয় নেটওয়ার্ক, শক্তিশালী মূলধন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা।
অন্যদিকে, যেসব কোম্পানি স্বাস্থ্য ও মোটর বীমায় বেশি ঝুঁকি নিয়েছে, তাদের ওপর দাবি বৃদ্ধির চাপ বেশি পড়েছে। পর্যাপ্ত ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়া পলিসি বিক্রি, উচ্চ দাবি অনুপাত এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখতে কোম্পানিগুলো এখন আরও সতর্ক আন্ডাররাইটিং নীতি গ্রহণ করছে।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কার বীমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, প্রযুক্তিনির্ভর দাবি নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করা এবং নতুন ধরনের পণ্য তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বীমা, স্বাস্থ্য বীমা, কৃষি বীমা এবং দুর্যোগ ঝুঁকি বীমার মতো খাতে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
জলবায়ু পরিবর্তনও শ্রীলঙ্কার বীমা খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বন্যা, ভূমিধস, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সম্পদ ও কৃষি খাতে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে দুর্যোগ বীমা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন পণ্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাও বীমাকে দেশের আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, ডিজিটাল বীমা সেবা সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে খাত বড় করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
তবে ২০২৬ সালে শ্রীলঙ্কার বীমা কোম্পানিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে দাবি বৃদ্ধির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা। মুনাফা ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি কমাতে পণ্য বৈচিত্র্য বাড়ানো, উন্নত ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে দাবি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে কিছু কোম্পানি প্রিমিয়াম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য বীমার খরচ বাড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীলঙ্কার বীমা খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কোম্পানিগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং গ্রাহকের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে তার ওপর। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব বীমা ব্যবস্থা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।