হরমুজ উত্তেজনায় কঠোর হচ্ছে বীমার শর্ত, বাড়তে পারে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি
.jpg)
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার কারণে সামুদ্রিক বীমা কোম্পানিগুলো জাহাজ চলাচলে আরও কঠোর শর্ত আরোপ করছে। এতে যুদ্ধঝুঁকি বীমার প্রিমিয়াম কয়েক গুণ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু শিপিং ও বীমা খাত নয়, বরং জ্বালানি, খাদ্য, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যেরও এক-পঞ্চমাংশের বেশি এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই পথে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন দেখা দিলে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, খাদ্যমূল্য এবং মূল্যস্ফীতি বিশ্বজুড়ে নতুন করে বেড়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়েছে। বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহেরও ২০ শতাংশের বেশি এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল।
এশিয়া এই নৌপথের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের প্রায় ৮৪ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় ৮৩ শতাংশের গন্তব্য এশিয়ার দেশগুলো। ফলে চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে এই সংকটে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ধরা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে সামুদ্রিক বীমা কোম্পানিগুলো এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজ পৃথকভাবে মূল্যায়ন করছে। কঠোর যুদ্ধঝুঁকি শর্ত, অতিরিক্ত অনুমোদন এবং ভ্রমণভিত্তিক আন্ডাররাইটিং এখন অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারণ করছে কোনো জাহাজ এই পথে চলাচলের অনুমোদন পাবে কি না।
বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অ্যাওন পিএলসির এশিয়া অঞ্চলের শিপিং প্রধান অলিভার মিলোশেভস্কি বলেছেন, পণ্যের চাহিদা কমেনি, কিন্তু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে। তেল, এলএনজি এবং অন্যান্য পণ্যের চাহিদা এখনও স্থিতিশীল থাকলেও সেগুলো পরিবহনের পরিবেশ অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে হরমুজগামী জাহাজের যুদ্ধঝুঁকি বীমার প্রিমিয়াম দ্রুত বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রিমিয়াম জাহাজের মূল্যের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অর্থাৎ ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি তেলবাহী ট্যাংকারের ক্ষেত্রে প্রতিটি যাত্রায় অতিরিক্ত প্রায় ৬ লাখ ২৫ হাজার ডলার থেকে ৭৫ লাখ ডলার পর্যন্ত বীমা ব্যয় যুক্ত হতে পারে।
এই বাড়তি বীমা ব্যয় শেষ পর্যন্ত জ্বালানি, খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে বৈশ্বিক আমদানি খরচ ও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে বীমা কভারেজ আরও সীমিত হলে শত শত জাহাজের চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি শুধু তেল ও গ্যাসের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, বিশেষ করে ইউরিয়া, এই নৌপথের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংকট দেখা দিলে সার, খাদ্য, শিল্প কাঁচামাল এবং ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিভিত্তিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাময়িকভাবে প্রতি ব্যারেল ১১৫ থেকে ১৪০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে পরিবহন, বিদ্যুৎ, খাদ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী নতুন করে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন পরিস্থিতিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থানে থাকলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও মন্থর হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এর প্রভাব শেয়ারবাজার, মুদ্রাবাজার এবং পণ্যবাজারেও পড়তে পারে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ও প্রবৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারত বিকল্প জ্বালানি উৎস ও নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা খুঁজতে শুরু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া থেকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ বাড়িয়েছে। অনেক দেশ বিকল্প বাণিজ্য রুট, জ্বালানি উৎস এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির দিকে ঝুঁকছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা এখনও চলমান রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় অগ্রগতি হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি এবং সামুদ্রিক বীমা ও জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তাও পুরোপুরি কাটেনি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, হরমুজের সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এখন জলবায়ু ঝুঁকির মতোই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক ও বীমা ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে মেরিন ওয়ার রিস্ক ইন্স্যুরেন্স, জ্বালানি বীমা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল-সম্পর্কিত বীমা পণ্যের চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে হরমুজ প্রণালি থেকে দূরে থাকলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় এই সংকটের অর্থনৈতিক অভিঘাত থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন নয়। বর্তমানে দেশটি বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়ে জ্বালানি মূল্য উচ্চ অবস্থানে থাকলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় প্রায় ৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫২ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে কাতারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর বাংলাদেশকে স্বল্পমেয়াদি আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজার থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩ দশমিক ০৮ থেকে ২৮ দশমিক ২৮ ডলার দরে এলএনজি সংগ্রহ করতে হয়েছে, যা বছরের শুরুর দামের দ্বিগুণেরও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, তেল ও এলএনজির দাম আরও বাড়লে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে খাদ্যমূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘ সময় জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় উচ্চ অবস্থানে থাকলে দেশে মূল্যস্ফীতিও আবার দুই অঙ্কের ঘরে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু বীমা বা শিপিং খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং জ্বালানি, খাদ্য, সার, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে এই সংকট বিশ্ব বাণিজ্যকে নতুন রুট, বিকল্প জ্বালানি জোট এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও বীমা ঝুঁকি হিসেবে নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করতে পারে।



