কম প্রিমিয়ামেও ৩০% মুনাফা বৃদ্ধি: কম্বোডিয়ার বীমা শিল্পে দক্ষতা-নির্ভর নতুন ধারা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ধীরগতির প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধির মধ্যেও কম্বোডিয়ার বীমা খাতে দ্রুত বাড়ছে লাভজনকতা। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ) দেশটির বীমা শিল্প এমন এক চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে মোট ব্যবসার প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থবির হলেও আন্ডাররাইটিং মুনাফায় শক্তিশালী উত্থান দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, খাতটি এখন আর শুধু নতুন প্রিমিয়াম বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করছে না। বরং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ আয়ের দক্ষ ব্যবহারের দিকে এটি দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
প্রিমিয়াম স্থির, কিন্তু মুনাফায় জোরালো উত্থান
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ার মোট বীমা প্রিমিয়াম আগের বছরের তুলনায় মাত্র ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলারে। একই সময়ে আন্ডাররাইটিং মুনাফা ৩০ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ২৬ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।
এই ব্যবধান স্পষ্ট করে যে, নতুন ব্যবসার প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকলেও অপারেশনাল দক্ষতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় উন্নতির মাধ্যমে খাতটি আরও বেশি লাভজনক হয়ে উঠছে।
লাইফ ও নন-লাইফ খাতে ভিন্ন গতি
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, লাইফ বীমা প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে। এই খাতে প্রিমিয়াম সামান্য ০.০৫ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৩৪ লাখ ডলারে নেমেছে।
অন্যদিকে নন-লাইফ বীমা তুলনামূলকভাবে ভালো পারফর্ম করেছে। স্বাস্থ্য, মোটর, দুর্ঘটনা এবং মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্সের বাড়তি চাহিদার কারণে এই খাতে প্রিমিয়াম ২ শতাংশ বেড়ে ৪ কোটি ৯৬ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।
নিট প্রিমিয়ামে চাপ, কিন্তু কাঠামোগত ভারসাম্য
নিট অর্জিত প্রিমিয়াম ১ শতাংশ কমে ৬ কোটি ৭৬ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। লাইফ বীমায় ৩ শতাংশ পতন থাকলেও নন-লাইফ খাতে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
এটি ইঙ্গিত দেয়, খাতে গ্রাহকের চাহিদা ধীরে ধীরে সুরক্ষা-কেন্দ্রিক এবং স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি কাভারেজের দিকে সরে যাচ্ছে।
দাবি হ্রাসই মুনাফা বৃদ্ধির মূল কারণ
প্রথম প্রান্তিকে মোট দাবি ব্যয় ১২ শতাংশ কমে ১ কোটি ৯৬ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। বিশেষ করে নন-লাইফ বীমায় দাবি ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এই পতনই মূলত মুনাফা বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। উন্নত আন্ডাররাইটিং শৃঙ্খলা, ঝুঁকি যাচাইয়ে কঠোরতা এবং তুলনামূলক কম ক্ষয়ক্ষতির পরিবেশ এতে ভূমিকা রেখেছে।
ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ আয়: দ্বিতীয় স্তরের শক্তি
একই সময়ে পরিচালন ব্যয় ৮ শতাংশ কমেছে এবং আর্থিক বিনিয়োগ আয় ৬ শতাংশ বেড়েছে। ফলে খাতটির সামগ্রিক লাভজনকতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, কোম্পানিগুলো এখন শুধু নতুন ব্যবসা বাড়ানোর দিকে নয়; বরং বিদ্যমান পোর্টফোলিও থেকে দক্ষভাবে মুনাফা বাড়ানোর কৌশলে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
নন-লাইফ ও মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্সের দ্রুত বিস্তার
স্বাস্থ্য, মোটর, দুর্ঘটনা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা-কেন্দ্রিক ঝুঁকি কাভারেজের চাহিদা বাড়ায় নন-লাইফ বীমা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য কম প্রিমিয়ামে সহজ সুরক্ষা দেয়ায় মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্সের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।
এটি কেবল পণ্যের পরিবর্তন নয়; বরং বাস্তব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চাহিদার প্রতিফলন।
আঞ্চলিক তুলনায় কম বিকশিত বীমা খাত
কম্বোডিয়া এখনও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম বীমা-প্রবেশযোগ্য খাত। দেশটিতে বীমা ব্যয় জিডিপির প্রায় ১.১৭ শতাংশ এবং মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ২২ মার্কিন ডলার।
ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার তুলনায় এটি অনেক পিছিয়ে, যা ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি করছে।
ডিজিটাল রূপান্তর ও নতুন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা
কম্বোডিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থা আগামী দিনে বীমা প্রবেশযোগ্যতা বাড়াতে ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন, ইন্স্যুরটেক, ব্যাংক-বীমা অংশীদারিত্ব এবং মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্স সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু ঝুঁকি, স্বাস্থ্য ব্যয় এবং দুর্যোগজনিত আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে বীমা খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কম্বোডিয়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, ধীর প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধির মধ্যেও সঠিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষ আন্ডাররাইটিংয়ের মাধ্যমে লাভজনকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান খাতেও ইন্স্যুরটেক, ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন এবং মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্স সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে বীমা খাতকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করতে পারে।



