ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: বীমা কভারেজ সংকটে কোটি ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভেনেজুয়েলায় বুধবার (২৪ জুন) পরপর দুইটি শক্তিশালী ভূমিকম্প (মাত্রা ৭.২ এবং ৭.৫) আঘাত হেনেছে। এতে দেশটির দুর্বল বীমা খাত বড় চাপের মুখে পড়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে হওয়া এই দুই ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি, সম্পদহানি এবং অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে জীবন, সম্পত্তি ও দুর্ঘটনা বীমা দাবির বড় ঢেউ তৈরি হয়েছে।

সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যু এবং ৭০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছে। তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে এমনকি কয়েক লাখ পর্যন্ত যেতে পারে। কারণ ধসে পড়া ভবনের নিচে এখনো অনেক মানুষ আটকে আছেন এবং উদ্ধার কাজ চলছে।

এই ভূমিকম্পে রাজধানীসহ উপকূলীয় এলাকার অনেক ঘনবসতিপূর্ণ জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক আবাসিক ভবন ধসে পড়েছে। হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবহন ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়েছে। কিছু এলাকায় বিমান চলাচল আংশিকভাবে বন্ধ এবং কয়েকটি শহরে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২.৮ থেকে ২.৯ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৮৮ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে। নারী ও পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। তবে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গেছে। ফলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখন বিদেশে রয়েছে। কর্মক্ষম জনসংখ্যা প্রায় ৬৫ শতাংশ, যা দেশের শ্রমবাজারের প্রধান ভিত্তি। এই ঘনবসতি এবং শহরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়িয়েছে।

দেশটির অর্থনীতি মূলত তেলনির্ভর। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-এর ওপর অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভরশীল। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আসে তেল থেকে। জিডিপির বড় অংশও এই খাতের ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকট বীমা খাতকে দুর্বল করে দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দেশটির বীমা খাতও সীমিত। এখানে প্রায় ২০ থেকে ৩০টি বীমা কোম্পানি আছে। এর মধ্যে লাইফ বীমা কোম্পানি প্রায় ৮ থেকে ১২টি এবং নন-লাইফ বীমা কোম্পানি প্রায় ১৫ থেকে ২০টি। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলো সুডেআসেগ। তবে দেশের মোট জিডিপির তুলনায় বীমার প্রবেশ মাত্র ১ শতাংশেরও নিচে, যা বিশ্বমানের তুলনায় খুবই কম।

ভূমিকম্পের পর বীমা দাবির চাপ দ্রুত বাড়ছে। প্রাথমিক হিসেবে লাইফ বীমা দাবির পরিমাণ ৫০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে। ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং সম্পত্তি ক্ষতির বীমাকৃত অংশ ২০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মোট ক্ষতির প্রায় ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশই বীমার বাইরে। এর ফলে এই ক্ষতির বড় অংশ ব্যক্তি, সরকার এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করবে।

অনেক আবাসিক ভবন ভূমিকম্প বীমার আওতায় নেই, কারণ এই ধরনের বীমা বাধ্যতামূলক নয়। তাই সাধারণ মানুষের বড় ক্ষতি বীমা কাভারেজের বাইরে থেকে যাচ্ছে। তবে তেল, শিল্প এবং বড় কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো বীমা কাভারেজ থাকায় সেখান থেকে কিছু বড় দাবি আসতে পারে।

ভেনেজুয়েলায় বীমা কম হওয়ার প্রধান কারণ হলো অর্থনৈতিক সংকট, কম আয়, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অভাব এবং ধীর ক্লেইম প্রসেসিং। সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন খরচই ঠিকভাবে মেটাতে পারে না। তাই তারা বীমাকে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় খরচ মনে করে।

এই দুর্যোগে আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা কোম্পানিগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা ক্ষতির একটি অংশ বহন করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলা-সম্পর্কিত ঝুঁকির প্রিমিয়াম ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিছু এলাকায় কভারেজও কমে যেতে পারে।

এই ভূমিকম্পের কারণে বীমা খাতে নতুন নীতিগত পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভূমিকম্প বীমা বাড়ানো, ডিজিটাল ক্লেইম প্রসেসিং চালু করা, প্যারামেট্রিক ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থা এবং ক্যাটাস্ট্রোফি বন্ডের মাধ্যমে ঝুঁকি ভাগাভাগি করা।

ভেনেজুয়েলা একটি ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। ১৯৬৭ সালের কারাকাস ভূমিকম্পে প্রায় ৩০০ জন মারা গিয়েছিল। ১৮১২ সালের ভূমিকম্পে প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেই তুলনায় বর্তমান ভূমিকম্পকে আধুনিক যুগের বড় দুর্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফটারশক চলতে থাকলে এবং উদ্ধার কাজ ধীর হলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত যেতে পারে, যা দেশের দুর্বল অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে।

এই পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে ভেনেজুয়েলার বীমা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য তারা প্রস্তুত নয়। ফলে পুনর্গঠনের বড় দায়িত্ব সরকার এবং সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে। এতে দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।