উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে লাইফ বীমা খাত, পলিসি ল্যাপসে লাইফ ফান্ডে তারল্য সংকট
.jpg)
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে ধারাবাহিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি লাইফ বীমা খাতে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করছে। বাস্তব আয় কমে যাওয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদি লাইফ বীমা পলিসি ধরে রাখা অনেক গ্রাহকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে পলিসি বাতিল ও ল্যাপসের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা লাইফ ফান্ডের ওপর নগদ চাপ তৈরি করছে এবং খাতটির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের হার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সময়কালে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। একই সময়ে খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি।
ফলে পরিবারের প্রকৃত আয় সংকুচিত হয়েছে এবং ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে লাইফ বীমার মতো দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও সুরক্ষা পণ্য অনেক পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেক গ্রাহক নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ চালিয়ে যেতে না পেরে পলিসি বন্ধ করছেন বা মাঝপথে বাতিল করছেন।
শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের লাইফ বীমা খাতে ৩০টিরও বেশি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। তবে নতুন পলিসি প্রবাহের তুলনায় টিকে থাকা পলিসির সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পলিসির প্রথম ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যে ল্যাপসের হার অনেক ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায় বলে শিল্প সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
এই প্রবণতা খাতটির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের গ্রাহকেরাই বেশি প্রভাবিত হচ্ছেন, কারণ তাদের আয় অনিশ্চয়তা তুলনামূলকভাবে বেশি।
বাংলাদেশের লাইফ বীমা খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। মোট জনসংখ্যার তুলনায় দেশে বীমা কভারেজ এখনো খুবই সীমিত। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, দেশে বীমা প্রবেশহার ১ শতাংশেরও নিচে। ২০১৯ সালে লাইফ বীমা প্রিমিয়ামের জিডিপি অনুপাত ছিল প্রায় ০.৩৭৮ শতাংশ।
এই দুর্বল ভিত্তির ওপর উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ খাতটির ওপর আরও গভীর প্রভাব ফেলছে।
জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম নুরুজ্জামান বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে লাইফ বীমা খাত কঠিন সময় পার করছে। মানুষের অগ্রাধিকার এখন খাদ্য, বাসস্থান এবং দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত থেকে প্রত্যাশিত অর্থায়ন পাওয়া যাচ্ছে না। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল। রিয়েল এস্টেট খাতেও স্থবিরতা রয়েছে। এসব কারণে সামগ্রিকভাবে বীমা খাতে মন্দাভাব তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের লাইফ বীমার প্রতি আগ্রহ কমছে এবং পলিসি বাতিলের হারও বেড়েছে। চলতি বছরে এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পলিসি বাতিল বৃদ্ধি পেলে কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকদের নির্ধারিত নগদ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এতে হঠাৎ করে বড় অঙ্কের নগদ বহিঃপ্রবাহ তৈরি হয়, যা লাইফ ফান্ডের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে।
এর ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সম্পদ ও দায়ের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে অ্যাকচুয়ারিয়াল রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। এতে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পণ্য থেকে সরে এসে স্বল্পমেয়াদি ও নগদভিত্তিক সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিটসহ (যা বর্তমানে ব্যাংকভেদে প্রায় ১১-১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদের হার পর্যন্ত পৌঁছেছে) অন্যান্য লিকুইড সেভিংস পণ্যের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া বাংলাদেশের লাইফ বীমা খাতে আস্থার সংকটও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক গ্রাহক বীমাকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা পণ্য না ভেবে সঞ্চয় স্কিম হিসেবে বিবেচনা করেন। কিছু ক্ষেত্রে ভুল বিক্রয় প্রক্রিয়া এবং প্রত্যাশিত রিটার্ন ও বাস্তব ফলাফলের পার্থক্যও আস্থার ঘাটতি তৈরি করছে।
এজেন্ট-নির্ভর বিক্রয় কাঠামোর কারণে গ্রাহকের বোঝাপড়ায় ঘাটতি থাকে, যা পরবর্তীতে পলিসি ভাঙার প্রবণতা বাড়ায়।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, লাইফ বীমা খাত বর্তমানে এক ধরনের চাপযুক্ত ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে। একদিকে প্রিমিয়াম প্রবাহ, অন্যদিকে বাতিল ও ল্যাপসের কারণে নগদ বহিঃপ্রবাহ। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে লাইফ ফান্ডে তারল্য সংকট তৈরি হয় এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের লাইফ বীমা খাত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাস্তব আয় সংকোচন, পলিসি ল্যাপস বৃদ্ধি এবং আস্থার সংকট-এই চারটি বড় চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে একটি জটিল পরিবর্তনকাল অতিক্রম করছে।



