হরমুজ সংকটে বেড়েছে তেল পরিবহন খরচ ও বীমা প্রিমিয়াম, উদ্বেগে বৈশ্বিক বাজার

সংবাদ ডেস্ক: হরমুজ প্রণালী ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ভাড়া দ্রুত বেড়েছে, যুদ্ধঝুঁকি বীমার প্রিমিয়াম বাড়ছে এবং অনেক জাহাজ উপসাগরীয় জলসীমায় অপেক্ষায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক জ্বালানি ও ট্রানশিপমেন্ট কেন্দ্র হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে।
তেল পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি
বাজার পর্যবেক্ষক ও শিপব্রোকারদের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় খুব বড় আকারের ক্রুড অয়েল ট্যাঙ্কার (ভিএলসিসি) চার্টার ভাড়া দ্রুত বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ডস্কেল সূচকে ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ওয়ার্ল্ডস্কেল হলো ট্যাঙ্কার ভাড়ার একটি আন্তর্জাতিক সূচক, যার মাধ্যমে তেল পরিবহনের চার্টার রেট নির্ধারণ করা হয়।
শিপিং বাজারের সাম্প্রতিক লেনদেন অনুযায়ী, কিছু ভিএলসিসি চার্টার রেট কয়েকশ’ ওয়ার্ল্ডস্কেল পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি। এর ফলে পূর্ব এশিয়ায় তেল পরিবহনের খরচও দ্রুত বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এই খরচ আরও বাড়তে পারে।
প্রণালীর আশপাশে জাহাজের জট
রয়টার্সসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলার পর অন্তত ১৫০টির বেশি তেল ও এলএনজি ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালীর আশপাশে নোঙর করে অপেক্ষা করছে।
অনেক জাহাজ উপসাগরে প্রবেশ না করে নিরাপদ দূরত্বে অপেক্ষা করছে, আবার কিছু জাহাজ প্রণালীর অপর প্রান্তে অবস্থান করছে। এর ফলে জাহাজ চলাচলে বিলম্ব এবং লজিস্টিক চাপে বৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি। তবে নাবিকদের বাড়তি নিরাপত্তা সতর্কতা, রেডিও যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং নৌ উপস্থিতি বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
যুদ্ধঝুঁকি বীমায় প্রিমিয়াম বৃদ্ধি
উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সামুদ্রিক বীমা বাজারেও। যুদ্ধঝুঁকি বীমা (ওয়ার-রিস্ক ইন্স্যুরেন্স) প্রদানকারী কিছু বীমাদাতা উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য কভার বাতিলের নোটিশ দিয়েছে বা অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দাবি করছে।
বীমা ব্রোকারদের মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বীমা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মার্শ-এর হিসাব অনুযায়ী, আগে উপসাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য বীমা খরচ ছিল জাহাজের পুনঃস্থাপন মূল্যের প্রায় ০.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি জাহাজের ক্ষেত্রে প্রতি ভ্রমণে বীমা খরচ ছিল প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। প্রিমিয়াম ৫০ শতাংশ বাড়লে তা প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বীমা বিশ্লেষকদের মতে, হামলা বা জাহাজ আটক হওয়ার ঝুঁকি বাড়লে আন্ডাররাইটাররা অতিরিক্ত ঝুঁকি বিবেচনায় প্রিমিয়াম সমন্বয় করে।
ইউএইর জন্য বহুমুখী ঝুঁকি
সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেকের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক এবং দেশটির উল্লেখযোগ্য অংশের তেল রপ্তানি হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।
তবে আবুধাবির তেলক্ষেত্র থেকে ফুজাইরাহ বন্দরে প্রতিদিন প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইনের মাধ্যমে, যা হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে যায়।
তবুও ইরাক, কুয়েত এবং কাতারের মতো দেশগুলোর অধিকাংশ জ্বালানি রপ্তানি এখনও এই প্রণালী দিয়েই যায়।
ইউএই আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। দুবাইয়ের জেবেল আলি এবং খোর ফাক্কান বন্দর এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে বড় ট্রানশিপমেন্ট হাব হিসেবে কাজ করে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে কনটেইনার পরিবহনেও বিলম্ব এবং অতিরিক্ত খরচ তৈরি হতে পারে।
শিপিং কোম্পানির সতর্ক অবস্থান
বড় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কিছু কোম্পানি সাময়িকভাবে ট্রানজিট স্থগিত করেছে বা বিকল্প রুট ব্যবহার করছে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যগামী এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা পণ্য পরিবহনে বিলম্ব ও অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্বের সামুদ্রিক তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। ফলে এই জলপথে অস্থিরতা দেখা দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত প্রভাব পড়ে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, যদি প্রণালী দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যত অচল হয়ে পড়ে, তবে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল বৈশ্বিক অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানির প্রায় ১৫ শতাংশ এবং সার বাণিজ্যের বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত। এসব পণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশও হরমুজ হয়ে পরিবাহিত হয়।
দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তেলের দাম, পরিবহন ভাড়া এবং বীমা প্রিমিয়াম আরও বাড়তে পারে। এতে বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউএইর বন্দর, পাইপলাইন এবং বাণিজ্যপথ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে সামনে এসেছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং বীমা ব্যয়ের এই সংকট কতদিন স্থায়ী হবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক বাজারের বড় প্রশ্ন।



