টিকটক শপে বীমা সুবিধা, বিক্রেতাদের জন্য নতুন সুযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: অনলাইন ব্যবসার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে ব্যবসায়িক ঝুঁকিও। পণ্যের ত্রুটি, গ্রাহকের অভিযোগ, কর্মচারীর দুর্ঘটনা কিংবা সাইবার হামলার মতো ঘটনা যেকোনো সময় ঘটতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় টিকটক শপ তাদের বিক্রেতাদের জন্য ব্যবসায়িক বীমা সুবিধা চালু করেছে।
নতুন এই ব্যবস্থার ফলে বিক্রেতারা টিকটক শপের ভেতর থেকেই বীমা কিনতে পারবেন। কোটেশন নেয়া, কভারেজ নির্বাচন এবং পলিসি গ্রহণের কাজও একই প্ল্যাটফর্মে করা যাবে। এতে সময় ও ঝামেলা দুটোই কমবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে টিকটক অংশীদার হয়েছে এরগো নেক্সট ইন্স্যুরেন্সের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটি আগে নেক্সট ইন্স্যুরেন্স নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এটি এরগো গ্রুপ ও মিউনিখ রি-এর সমর্থনপুষ্ট একটি ডিজিটাল ইন্স্যুরটেক প্রতিষ্ঠান।
নতুন সুবিধার আওতায় সাধারণ দায়বদ্ধতা বীমা, পেশাগত দায়বদ্ধতা বীমা, শ্রমিক ক্ষতিপূরণ বীমা এবং সাইবার বীমা পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক ক্ষতি, কর্মচারীর দুর্ঘটনা এবং তথ্য ফাঁসের মতো ঝুঁকির বিরুদ্ধে আর্থিক সুরক্ষা মিলবে।
বিশেষ করে সৌন্দর্যপণ্য, খাদ্য-পরিপূরক এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বিক্রেতাদের জন্য এই বীমা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যবসার জন্য বীমা সনদও প্রয়োজন হয়।
বীমা খাতে এ ধরনের সেবাকে ‘এমবেডেড ইন্স্যুরেন্স’ বলা হয়। অর্থাৎ কোনো পণ্য বা সেবার সঙ্গে বীমা সুবিধাও যুক্ত থাকে। ফলে গ্রাহক বা ব্যবসায়ীকে আলাদা করে বীমা খুঁজতে হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য বীমা নেয়ার প্রক্রিয়া অনেক সময় জটিল হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এবং প্রয়োজন হয় নানা কাগজপত্রের। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক উদ্যোক্তা বীমা সুরক্ষার বাইরে থেকে যান।
টিকটক শপের নতুন উদ্যোগ সেই বাধা কমানোর চেষ্টা করছে। ব্যবসা পরিচালনার সময়ই বিক্রেতারা প্রয়োজনীয় বীমা নিতে পারবেন। এতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও সহজ ও দ্রুত হতে পারে।
গ্লোবালডাটার ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৯ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা কোনো না কোনো মার্কেটপ্লেস থেকে বীমা প্রস্তাব পেয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৪৯ শতাংশ সেই বীমা কিনেছে। এটি দেখায়, সহজে পাওয়া গেলে উদ্যোক্তারা বীমা নিতে আগ্রহী হন।
বিশ্লেষকদের মতে, এমবেডেড ইন্স্যুরেন্স বীমা কোম্পানিগুলোকে নতুন গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে বিক্রয় ব্যয় কমায় এবং তুলনামূলক কম প্রিমিয়ামে সেবা দেয়ার সুযোগ তৈরি করে।
বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক বীমা সেবার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। আগে এটি মূলত ভ্রমণ বা গ্যাজেট বীমায় সীমাবদ্ধ ছিল। এখন বাণিজ্যিক বীমা খাতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে অনলাইন ব্যবসায় পণ্যের দায়, সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা এবং সাইবার ঝুঁকি বাড়ায় বিক্রেতাদের জন্য নতুন ধরনের বীমা সমাধানের চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
ডিমান্ড সেইজের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, টিকটকের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১.৯৯ থেকে ২ বিলিয়ন। বাংলাদেশেও প্ল্যাটফর্মটির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ডেটারিপোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী টিকটক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ কোটি ৬২ লাখ। ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় টিকটক বাজার হিসেবে বিবেচিত হয়।
টিকটক এখন শুধু বিনোদন বা সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল বাণিজ্য ইকোসিস্টেমে পরিণত হচ্ছে। টিকটক শপ, লাইভ কমার্স এবং কনটেন্টভিত্তিক বিক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে লাখো উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে। ফলে এই প্ল্যাটফর্মে ব্যবসায়িক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
বাংলাদেশে ই-কমার্স, সোশ্যাল কমার্স এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাভিত্তিক অনলাইন ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও ব্যবসায়িক বীমার ব্যবহার এখনো তুলনামূলক সীমিত। অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পণ্যের দায়, সাইবার ঝুঁকি বা ব্যবসা ব্যাহত হওয়ার মতো ঝুঁকির বিরুদ্ধে কোনো বীমা সুরক্ষার আওতায় নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকটক শপের মতো প্ল্যাটফর্মভিত্তিক বীমা সেবা বাংলাদেশের বীমা শিল্পের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে স্থানীয় ই-কমার্স, ডিজিটাল পেমেন্ট ও ফিনটেক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে বীমা সেবা যুক্ত হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে বীমা পৌঁছানো আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে বীমা কোম্পানিগুলোও নতুন গ্রাহকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কাস্টমাইজড কভারেজের প্রয়োজন অনুভব করে। সে ক্ষেত্রে প্রচলিত বীমা ব্যবস্থাই এখনো বেশি কার্যকর হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন ব্যবসার ঝুঁকি যত বাড়বে, প্ল্যাটফর্মভিত্তিক বীমা সেবার চাহিদাও তত বাড়বে। টিকটকের এই পদক্ষেপ সেই ভবিষ্যতেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-কমার্স, ফিনটেক এবং বীমা খাতের ক্রমবর্ধমান সমন্বয়ের ফলে ভবিষ্যতে একজন ব্যবসায়ী একই প্ল্যাটফর্মে পণ্য বিক্রি, পেমেন্ট গ্রহণ, ঋণ সুবিধা এবং বীমা সুরক্ষা- সবকিছুই পেতে পারেন।



