কোরবানির পশু পরিবহনে ট্রানজিট বীমায় কমবে ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে কোরবানির পশুর সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর মোট সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সেই হিসাবে এ বছর প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
গত বছরের চিত্রও একই ধরনের। ২০২৫ সালে দেশে কোরবানি হয়েছিল ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু। একই বছরে প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু অবিক্রীত বা উদ্বৃত্ত ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে পশু উৎপাদন ও কোরবানির বাজার এখন হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে।
পরিবহন ঝুঁকি ও ক্ষতির বাস্তব চিত্র
এই খাতের বড় অংশ নির্ভর করছে পশু পরিবহনের ওপর। উত্তরবঙ্গ, কুষ্টিয়া, যশোর, রাজশাহী ও জামালপুর অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার পশু ট্রাকে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহরের হাটে আনা হচ্ছে।
তবে এই পরিবহন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ঝুঁকি রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত গাদাগাদি, দীর্ঘ যানজট এবং তীব্র গরমে হিট স্ট্রোকের কারণে প্রতিবছরই বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। পথে চাঁদাবাজিও একটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
একটি ট্রাক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে কয়েকটি গরু মারা যেতে পারে বা গুরুতর আহত হতে পারে। এতে খামারি ও ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
বিকল্প ব্যবস্থা: ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন
এই ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ রেলওয়ে এবারও বিশেষ ‘ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন’ চালু করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বগির ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা। প্রতি বগিতে প্রায় ১৬টি গরু পরিবহনের সুযোগ রয়েছে।
এতে প্রতি গরুর পরিবহন খরচ প্রায় ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। তবে সীমিত ধারণক্ষমতার কারণে দেশের অধিকাংশ পশুই এখনো সড়কপথের ট্রাকের ওপর নির্ভরশীল।
ট্রানজিট বীমা: কী কভার করে
এই বাস্তবতায় গুরুত্ব পাচ্ছে ‘লাইভস্টক ট্রানজিট বীমা’ বা পশু পরিবহন বীমা। দেশে ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, নিটল ইন্স্যুরেন্স পিএলসি এবং গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সসহ বেশ কয়েকটি নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠান এই সেবা দিচ্ছে।
এসব পলিসির আওতায় চলন্ত ট্রাক থেকে পশু পড়ে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা আহত হওয়া, বজ্রপাত, ঝড়, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড এবং বিষাক্ত প্রাণীর কামড় কভার করা হয়। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হিট স্ট্রোকজনিত ক্ষতিও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শে জরুরি জবাই করতে হলে তারও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি
বীমা কোম্পানিগুলো এখন প্রযুক্তিনির্ভর সেবার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, আইওটি ডিভাইস ও বায়োসেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করে পশুর অবস্থান ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এর ফলে দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত তথ্য যাচাই করে অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রিমিয়াম কত, সুবিধা কী
এই বীমার প্রিমিয়াম তুলনামূলক সাশ্রয়ী। পশুর মোট মূল্যের ওপর ভিত্তি করে বার্ষিক প্রিমিয়াম ২.৭৫ শতাংশ থেকে ৫.৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।
তবে শুধু কোরবানির মৌসুম বা ট্রানজিটের জন্য নেয়া স্বল্পমেয়াদি পলিসির ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম আরও কম হয়। ছোট প্রিমিয়ামের বিপরীতে বড় আর্থিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাওয়ায় এই বীমা ধীরে ধীরে ব্যবসায়ীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্লেইম পাওয়ার প্রক্রিয়া
ক্লেইম বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়াও এখন আগের তুলনায় সহজ করা হয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা বা পশুর মৃত্যু হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানিকে দ্রুত জানাতে হয়।
এরপর পরিবহন সংক্রান্ত কাগজপত্র, পশু ক্রয়ের রসিদ, ট্রানজিট ডকুমেন্ট এবং ঘটনার ছবি বা ভিডিও জমা দিতে হয়। পশু অসুস্থ হয়ে মারা গেলে নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সনদ প্রয়োজন হয়।
অনেক ক্ষেত্রে প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টও জমা দিতে হয়। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন বা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরিবহন চালকের বিবরণও চাওয়া হতে পারে।
বর্তমানে অনেক কোম্পানি মোবাইল অ্যাপ বা অনলাইনের মাধ্যমে প্রাথমিক ক্লেইম গ্রহণ করছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক থাকলে কয়েক কার্যদিবসের মধ্যেই ক্ষতিপূরণের অর্থ সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে।
হাট ব্যবস্থাপনা ও সরকারি প্রস্তুতি
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় ২৭টি অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। সারাদেশে মোট ৩ হাজার ৬৭৮টি পশুর হাট পরিচালিত হবে।
এসব হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম ও ২টি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করবে। অনলাইনেও পশু বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে এবং সেখানে কোনো খাজনা নেয়া হবে না বলে জানিয়েছে সরকার।
সচেতনতার ঘাটতি এখনো চ্যালেঞ্জ
তবে এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও দেশের অধিকাংশ প্রান্তিক খামারি ও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের মধ্যে ট্রানজিট বীমা নিয়ে সচেতনতা এখনো সীমিত।
একজন বীমা বিশেষজ্ঞ বলেন, “হাইওয়ে প্রবেশপথ, পশুর হাট ও ফেরিঘাট এলাকায় তাৎক্ষণিক ট্রানজিট বীমা বুথ চালু করা গেলে মৌসুমভিত্তিক ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।”
অর্থনীতিতে বাড়ছে গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে কোরবানির পশুর বাজার এখন শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি একটি বড় অর্থনৈতিক খাত।
এই খাতকে আরও নিরাপদ ও টেকসই করতে ট্রানজিট বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিক নীতিমালা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে খামারি ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।



