শিক্ষা ব্যয় বাড়ছে, ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় গুরুত্ব পাচ্ছে শিক্ষা বীমা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, শহরকেন্দ্রিক মানসম্মত শিক্ষার চাহিদা এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রসার- এই তিনটি কারণে শিক্ষাখরচ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে অনেক পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ পরিবারকেই বহন করতে হয়, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষাখাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক পরিবারকে এখন তাদের মোট আয়ের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শিক্ষার পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। শহরাঞ্চলে এই চাপ আরও বেশি স্পষ্ট। গত এক দশকে পরিবারের মোট ব্যয়ের মধ্যে শিক্ষাখাতের অংশ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৬ থেকে ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ থেকে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) রিপোর্ট এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন এডুকেশন সেক্টর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মোট শিক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৭০ থেকে ৭১ শতাংশ পর্যন্ত পরিবারগুলোকে নিজস্বভাবে বহন করতে হয়। এই উচ্চ ‘আউট-অফ-পকেট’ ব্যয় শিক্ষা খাতে বৈষম্য বাড়ানোর পাশাপাশি নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
এদিকে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, সেখানে শিক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। ফলে বাস্তব আয় বৃদ্ধির তুলনায় শিক্ষা ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাবে পরিবারগুলোর সঞ্চয় কমছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা বীমা একটি কার্যকর আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যেখানে অভিভাবক নিয়মিত প্রিমিয়াম জমা দিয়ে ভবিষ্যতে সন্তানের শিক্ষার জন্য একটি তহবিল গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে যদি অভিভাবকের মৃত্যু বা অক্ষমতা ঘটে, অনেক ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানি বাকি প্রিমিয়াম পরিশোধ করে এবং নির্ধারিত অর্থ প্রদান অব্যাহত রাখে। ফলে সন্তানের শিক্ষাজীবন মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে মেটলাইফ বাংলাদেশ তাদের “মাই চাইল্ডস এডুকেশন প্রোটেকশন প্ল্যান” এর মাধ্যমে শিক্ষা বীমা সেবা দিচ্ছে। পাশাপাশি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড শিক্ষা ব্যয় কাভারের জন্য বিশেষ পণ্য চালু করেছে। এছাড়া ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই খাতে সক্রিয় রয়েছে, যা ধীরে ধীরে বাজারে প্রতিযোগিতা ও সেবার বৈচিত্র্য বাড়াচ্ছে।
তবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশে শিক্ষা বীমার ব্যবহার এখনো সীমিত। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বীমা খাতের অবদান জিডিপির মাত্র ০.৪ থেকে ০.৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে বিশ্ব গড় ৬ শতাংশের বেশি। এই ব্যবধানই দেখায় যে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো বীমা সুরক্ষার বাইরে রয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষা ব্যয়ের বাস্তব চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে মাসিক খরচ ১৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার বেশি হওয়া এখন সাধারণ ঘটনা। এর সঙ্গে ভর্তি ফি, বই, পরিবহন ও কোচিং খরচ যুক্ত হলে মোট ব্যয় আরও ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরে ২ লাখ থেকে ৮ লাখ টাকা খরচ হওয়া এখন স্বাভাবিক, কিছু ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উচ্চ ব্যয় ভবিষ্যতে শিক্ষায় বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই বাড়তি ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে বা ঋণ নিতে হচ্ছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার জরুরি খরচ মেটাতে সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করে এবং শিক্ষা সেই বড় খরচগুলোর একটি। হঠাৎ আয় কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষা খাতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ওপর। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক সংকট বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় ত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ। মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার এখনো প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি এবং নিম্ন আয়ের পরিবারে এই হার আরও বেশি। বিশেষ করে পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তি মারা গেলে বা অক্ষম হয়ে পড়লে সন্তানের শিক্ষাজীবন বড় ঝুঁকির মুখে পড়ে।
অর্থনীতিবিদ ও বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা বীমা শুধু একটি আর্থিক পণ্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। এটি পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং অনিশ্চয়তার সময়েও সন্তানের শিক্ষা নিশ্চিত রাখে। তবে এর বিস্তার বাড়াতে হলে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সহজ ও স্বল্পমূল্যের পণ্য তৈরি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট, শিক্ষা ব্যয় যত বাড়ছে, ততই পরিকল্পিত সঞ্চয় ও আর্থিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা বীমা হতে পারে একটি কার্যকর সমাধান, যা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



