বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে, বীমা কভারেজে বড় ঘাটতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় বজ্রপাত এখন এক ভয়ংকর অথচ নীরব ঘাতক হিসেবে উঠে এসেছে। গত এক দশকে বজ্রপাতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বজ্রপাতে ৩,৪৮৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একক বছর হিসেবে ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪২৭ জন প্রাণ হারান। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ৭২ জনে, যাদের বড় অংশই মাঠে কাজ করা কৃষক।
বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৮০ থেকে ৯০ লাখ বজ্রপাত ঘটে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই এপ্রিল থেকে জুন মাসে সংঘটিত হয়, যা কৃষিকাজের ব্যস্ত মৌসুমের সঙ্গে মিলে যায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গবেষণায় দেখা গেছে, বজ্রপাতে নিহতদের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই কৃষক বা গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ।
বজ্রপাতের ঝুঁকি শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি হাজারো পরিবারের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। আকস্মিক এই দুর্যোগে একজন উপার্জনক্ষম সদস্য হারালে পুরো পরিবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পড়ে যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোতে এমন ঘটনা দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বীমা সুরক্ষার অভাবে এই পরিবারগুলোকে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ একাই বহন করতে হয়, যা তাদের পুনর্বাসনকে আরও কঠিন করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, “বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন বজ্রঝড়ের প্রবণতা বাড়ায়, যার ফলে বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।” আগে গ্রামীণ এলাকায় তালগাছ ও বড় গাছ প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে এখন খোলা মাঠে থাকা মানুষ, বিশেষ করে কৃষকেরা, বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।
ভৌগোলিক অবস্থানও বাংলাদেশের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বজ্রপাতজনিত মৃত্যুহারের দিক থেকে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে মেঘালয় পাহাড়সংলগ্ন হাওর অঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। গবেষণা অনুযায়ী, বায়ুদূষণের ফলে বাতাসে ধূলিকণা ও কার্বনের পরিমাণ বাড়লে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ও তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায়।
এই পরিস্থিতিতে লাইফ বীমা একটি কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা হতে পারে। বাংলাদেশে অধিকাংশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি বজ্রপাতে মৃত্যুকে ‘অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ বেনিফিট (এডিবি)’ হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থাৎ অতিরিক্ত সুবিধা যুক্ত থাকলে মৃত ব্যক্তির পরিবার মূল বীমার পাশাপাশি অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা পেতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, বীমা কভারেজ এখনও সীমিত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে বীমা খাতের আকার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশেরও নিচে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। ফলে দেশের বড় একটি অংশ, বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকেরা, বীমার বাইরে রয়ে গেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে বীমা খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ সক্ষমতা অনুযায়ী সেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে। ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড দেশজুড়ে নেটওয়ার্ক বিস্তারের মাধ্যমে গ্রাহকসেবা বাড়াচ্ছে। ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ক্ষুদ্র বীমা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষের কাছে বীমা পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখছে।
এছাড়া মেটলাইফ বাংলাদেশ প্রযুক্তিনির্ভর সেবার উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড গ্রাহকসেবা সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। পাশাপাশি গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড ডিজিটাল সেবা ও গ্রাহক-কেন্দ্রিক পলিসি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিয়ে বীমা খাতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।
বজ্রপাত এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সহজলভ্য বীমা ব্যবস্থার সমন্বিত প্রয়োগ জরুরি।



