আইসল্যান্ডে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে বদলাচ্ছে বীমা পণ্য

সংবাদ ডেস্ক: আইসল্যান্ডের বীমা খাত দেশটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও কল্যাণভিত্তিক সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে মিল রেখে গড়ে উঠেছে। ছোট হলেও দেশটির বীমা বাজার স্থিতিশীল। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৬ সালে আইসল্যান্ডের মোট গ্রস রিটেন প্রিমিয়াম প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ১.৩ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ধরে ২০২৮ সালে তা বেড়ে প্রায় ৬৭৩ মিলিয়ন ডলারে উঠতে পারে।

আইসল্যান্ডের বীমা বাজারে নন-লাইফ বা সাধারণ বীমা পণ্যের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি। এর প্রধান কারণ দেশটি নিয়মিতভাবে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প, বন্যা, তুষারধস এবং ভূমিধসের মতো ঝুঁকির মুখে থাকে। ফলে ব্যক্তি ও ব্যবসা- উভয় পর্যায়েই সম্পদ সুরক্ষায় বীমার চাহিদা শক্তিশালী রয়েছে।

মোটর বীমা দেশটির সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বীমা পণ্যের একটি। সব যানবাহনের জন্য তৃতীয় পক্ষ মোটর দায়বদ্ধতা বীমা বাধ্যতামূলক। এই কভারেজের আওতায় অন্য ব্যক্তি বা সম্পত্তির ক্ষতি হলে তার আর্থিক দায় বহন করা হয়। একই সঙ্গে বহু গাড়ির মালিক নিজেদের যানবাহন সুরক্ষায় সমন্বিত বা কমপ্রিহেনসিভ বীমা নেন। এতে সংঘর্ষ, চুরি এবং পরিবেশগত ক্ষতির মতো ঝুঁকিও অন্তর্ভুক্ত থাকে। সাধারণভাবে মোটর বীমার বার্ষিক প্রিমিয়াম ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ আইসল্যান্ডিক ক্রোনা পর্যন্ত হতে পারে। তবে গাড়ির ধরন, চালকের বয়স, অবস্থান এবং পূর্বের দাবি ইতিহাসের ওপর এই প্রিমিয়াম নির্ভর করে। ২৫ বছরের কম বয়সী চালকদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঝুঁকি বেশি হওয়ায় প্রিমিয়ামও তুলনামূলক বেশি হয়।

সম্পত্তি বীমাও আইসল্যান্ডের বাজারে একটি প্রধান পণ্য। এটি বাড়ি ও বাণিজ্যিক ভবনকে আগুন, পানিজনিত ক্ষতি এবং চুরির মতো ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে আইসল্যান্ডের ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতায় সম্পত্তি বীমার সঙ্গে জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বীমা ব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই ব্যবস্থার অধীনে অগ্নিবীমাকৃত সম্পত্তির মূল্যের ওপর ০.০২৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম আরোপ করা হয়। এই তহবিল ব্যবহার করে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, তুষারধস, ভূমিধস এবং বন্যার মতো বিপর্যয়ের ক্ষতি কভার করা হয়। শুধু ভবন নয়, অস্থাবর সম্পদও এই সুরক্ষার আওতায় পড়ে।

জীবন বীমা খাতও আইসল্যান্ডের আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মৃত্যু, অক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার আর্থিক ঝুঁকি কমাতে এই পণ্যগুলো ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে সঞ্চয় ও অবসর পরিকল্পনাতেও জীবন বীমা ভূমিকা রাখে। টার্ম লাইফ, হোল লাইফ এবং এনডাওমেন্ট- এই তিন ধরনের পণ্য বেশি প্রচলিত। দেশটির পেশাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থার সঙ্গে বহু জীবন বীমা পণ্য যুক্ত থাকায় অবসরকালীন সুরক্ষায় এগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রিমিয়াম নির্ধারণে সাধারণত গ্রাহকের বয়স, স্বাস্থ্য, কভারেজের মেয়াদ এবং বীমা অঙ্ক বিবেচনায় নেয়া হয়।

স্বাস্থ্য বীমার ক্ষেত্রে আইসল্যান্ডে মূল ভরসা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। এটি আইসল্যান্ডিক হেলথ ইন্স্যুরেন্স-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সাধারণত বৈধভাবে ছয় মাস বসবাসের পর বাসিন্দারা এই সুবিধার জন্য যোগ্য হন। বেসরকারি স্বাস্থ্য বীমা এখানে প্রধানত সম্পূরক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো বা অতিরিক্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য অনেকেই এ ধরনের কভারেজ নেন। বেসরকারি স্বাস্থ্য সম্পূরক বীমার বার্ষিক প্রিমিয়াম সাধারণত ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার আইসল্যান্ডিক ক্রোনার মধ্যে থাকে।

ভ্রমণ বীমাও আইসল্যান্ডের নাগরিকদের মধ্যে জনপ্রিয়, বিশেষ করে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে। এসব পলিসিতে সাধারণত বিদেশে জরুরি চিকিৎসা, ভ্রমণ বাতিল, লাগেজ হারানো এবং যাত্রা বিঘ্নের মতো ঝুঁকি কভার করা হয়।

এ ছাড়া ব্যক্তি ও ব্যবসা- উভয়ের জন্য দায়বদ্ধতা বীমা পণ্যও বাজারে রয়েছে। তৃতীয় পক্ষের ক্ষতি বা আঘাত সংক্রান্ত দাবির বিরুদ্ধে এই কভারেজ সুরক্ষা দেয়। বিশেষ করে পেশাজীবী, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমে যুক্ত ব্যবসার জন্য পেশাগত দায়বদ্ধতা বীমা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

দাবির পরিমাণও পণ্যের ধরন ও ঘটনার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বড় ধরনের পার্থক্য দেখায়। ছোট মোটর বা চুরি-সংক্রান্ত দাবির পরিমাণ ২০ হাজার আইসল্যান্ডিক ক্রোনার নিচে থাকতে পারে। টায়ার ক্ষতির দাবি সাধারণত ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ক্রোনার মধ্যে থাকে। উইন্ডশিল্ড মেরামত বা পরিবর্তনের দাবি ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ক্রোনা পর্যন্ত হতে পারে। তবে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে মোট বীমা ক্ষতির পরিমাণ ১ বিলিয়ন আইসল্যান্ডিক ক্রোনারও বেশি হয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে আইসল্যান্ডের বীমা খাত তদারকি করে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজারে সক্রিয় বীমা কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ১২টি। এর মধ্যে সিওভা, টিএম, ভিআইএস এবং ভারদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৭ সালে যেখানে বীমা কোম্পানির সংখ্যা ছিল ২৯ টি, সেখানে এখন তা কমে এসেছে। এতে স্পষ্ট, বাজারে একীভবন বা কনসোলিডেশন বেড়েছে। তারপরও বাধ্যতামূলক কভারেজ এবং বীমা ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার কারণে দেশে বীমা প্রবেশহার ৯০ শতাংশের ওপরে রয়েছে।