কমপ্লায়েন্স সংকট ও ঝুঁকিতে ট্যানারি শিল্প, সমাধানে বীমা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের চামড়া ও ট্যানারি শিল্প দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত। তৈরি পোশাক শিল্পের পর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এই খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮.৫ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। কিন্তু এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গত এক দশকের বেশি সময় ধরে খাতটির রপ্তানি আয় প্রায় ১ থেকে ১.৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স সংকট, অগ্নিকাণ্ড ও রাসায়নিক ঝুঁকি, শ্রমিক নিরাপত্তার দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত বীমা সুরক্ষার অভাবে শিল্পটি এখনও প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য এবং চামড়ার জুতা খাত থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৯৮৮.০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৫.৯৫ শতাংশ বেশি। তবে দেশের মোট পণ্য রপ্তানির মধ্যে এই খাতের অবদান মাত্র ২.৫১ শতাংশ। অর্থাৎ, সম্ভাবনা থাকলেও খাতটি এখনও তার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেনি।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করছে। অথচ অবকাঠামোগত সমস্যা, কমপ্লায়েন্স ঘাটতি এবং বাজারসংক্রান্ত বাধাগুলো দূর করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত রপ্তানি আয় অর্জন করা সম্ভব। এ কারণেই চামড়া শিল্পকে এখনও দেশের অন্যতম অপূর্ণ সম্ভাবনার খাত হিসেবে দেখা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা উৎপাদন নয়, বরং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা। বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় ক্রেতারা শুধু পণ্যের মান নয়, পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমিক নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দেন। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ট্যানারি শিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর ১৪০টির বেশি সক্রিয় ট্যানারির মধ্যে মাত্র ৮টি প্রতিষ্ঠান এই সনদ অর্জন করতে পেরেছে। এর প্রধান কারণ কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা। ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার উচ্চমূল্যের বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসার সুযোগ হারাতে হচ্ছে। ফলে দেশীয় উৎপাদকরা তাদের পণ্যের প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সম্ভাব্য রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ হারিয়ে যাচ্ছে।
এর পাশাপাশি শিল্পটি প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার সময় ক্রোমিয়াম, ফরমালডিহাইড, সালফিউরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে দীর্ঘদিন কাজ করলে শ্রমিকদের চর্মরোগ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ, রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়া এবং যন্ত্রপাতিজনিত দুর্ঘটনাও বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়েছে।
অনেক ট্যানারি কারখানায় এখনও পুরোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক জায়গায় নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। ফলে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তা শুধু শ্রমিকদের জন্য নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্যও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে প্রায়ই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যায়। এসব দুর্যোগ ট্যানারি শিল্পের জন্যও বড় ঝুঁকি। এতে কারখানা, গুদাম, যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামালের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বেশিরভাগ ট্যানারি এখনও অগ্নি বীমা, সম্পদ বীমা, দায়বদ্ধতা বীমা কিংবা ব্যবসা-বিচ্ছিন্নতা বীমার আওতায় নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ কারণেই ট্যানারি শিল্পে বীমা শুধু একটি আর্থিক পণ্য নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক প্রয়োজন। কোনো দুর্ঘটনা বা দুর্যোগের পর দ্রুত ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা, উৎপাদন চালু রাখা এবং আর্থিক চাপ সামাল দিতে বীমা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি ব্যাংক, বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।
আন্তর্জাতিক অনেক ক্রেতা এখন কারখানার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা মূল্যায়নের সময় বীমা কভারেজ, অগ্নি নিরাপত্তা এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দেন। ফলে পর্যাপ্ত বীমা সুরক্ষা শুধু আর্থিক নিরাপত্তাই দেয় না, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়তেও সহায়তা করে।
বীমা খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্যানারি শিল্পে শুধু অগ্নি বীমা যথেষ্ট নয়। পরিবেশগত দায়বদ্ধতা বীমা, ব্যবসা-বিচ্ছিন্নতা বীমা, পণ্য দায়বদ্ধতা বীমা এবং শ্রমিক স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বীমাসহ সমন্বিত সুরক্ষা প্রয়োজন। কারণ একটি বড় অগ্নিকাণ্ড, রাসায়নিক দুর্ঘটনা বা পরিবেশগত ক্ষতির ঘটনা কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কোটি কোটি টাকার আর্থিক দায় তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪২৩ মিলিয়ন জোড়া জুতা উৎপাদিত হয়। এর একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়। অর্থাৎ দেশের উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট ভালো হলেও রপ্তানি সম্ভাবনার বড় অংশ এখনও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা গেলে এ খাতের প্রবৃদ্ধি আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
চামড়া শিল্পের জন্য কোরবানির ঈদ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। দেশের মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এই সময় সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সংরক্ষণের দুর্বলতা, অতিরিক্ত সরবরাহ, লবণের সংকট এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। এ ধরনের মৌসুমি ঝুঁকির বিপরীতে বীমা সুরক্ষা থাকলে আড়তদার, ব্যবসায়ী এবং ট্যানারি মালিকদের আর্থিক ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কমপ্লায়েন্স সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের গুণগত মান নয়, শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং আর্থিক সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে যথাযথ বীমা কভারেজ একটি প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্যানারি শিল্পের জন্য বিশেষায়িত বীমা প্যাকেজ চালু করা প্রয়োজন। এর আওতায় অগ্নিকাণ্ড, রাসায়নিক দুর্ঘটনা, পরিবেশ দূষণ, সম্পদের ক্ষতি, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া, শ্রমিক দুর্ঘটনা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি একসঙ্গে কভার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ৮.৫ লাখ শ্রমিকের জন্য গ্রুপ স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বীমা চালু করা গেলে সামাজিক সুরক্ষাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বিভিন্ন শিল্প বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প প্রতি বছর বিপুল সম্ভাব্য রপ্তানি আয় হারাচ্ছে। এটি শুধু একটি শিল্পের সমস্যা নয়; দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সাভারের সিইটিপি আধুনিকায়ন, এলডব্লিউজি সনদ অর্জনের হার বৃদ্ধি এবং বীমা সুরক্ষার বিস্তার- এই তিনটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প নতুন গতি পাবে। এতে কম দামে আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির পরিবর্তে উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হবে।



