ইউরোপের বীমা মডেল যেভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বদলে দিতে পারে

সংবাদ ডেস্ক: ইউরোপের দেশগুলোতে বীমা শুধু আর্থিক নিরাপত্তার একটি উপায় নয়; এটি নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী ও সুসংগঠিত এই বীমা কাঠামো ইউরোপের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে- যা বাংলাদেশের জন্যও কার্যকর অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে।
আন্তর্জাতিক শিল্প বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ সময়ে ইউরোপের বীমা বাজারের আকার প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। খাতটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধিও প্রায় ৪ শতাংশের ঘরে স্থিতিশীল রয়েছে। সুইস রি ও ইন্স্যুরেন্স ইউরোপের তথ্য অনুযায়ী, কঠোর আইনি কাঠামো ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে ইউরোপে বীমা ছাড়া দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালে পশ্চিম ইউরোপে বীমা প্রিমিয়াম সংগ্রহে প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও লাইফ বীমা খাতে গ্রাহকদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। লাইফ বীমা খাতে প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় আরও ত্বরান্বিত হয়েছে, যা খাতটির প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে পিডব্লিউসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপে বীমা খাতে করপোরেট লেনদেন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা বাজারের গভীরতা ও পরিপক্বতার প্রতিফলন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে ইউরোপের বীমা খাত দ্রুত আধুনিক হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সেবার বিস্তার গ্রাহকসেবাকে আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করেছে। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছরগুলোতে ডিজিটাল বীমা সেবার ব্যবহার আরও বাড়বে।
ওইসিডি’র তথ্য অনুযায়ী, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে বীমা পেনিট্রেশনের হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ইউরোপের অনেক দেশে তা বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও বেশি। যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশে অনলাইন বীমা সেবায় ব্যক্তিগত গ্রাহকদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য, যা ডিজিটাল রূপান্তরের সফলতার প্রতিফলন।
ইউরোপে বীমাকে প্রায়ই একটি ‘অদৃশ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা’ হিসেবে দেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি চালানো, বাড়ি ভাড়া নেয়া বা আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য বীমা বাধ্যতামূলক। স্বাস্থ্য খাতেও বীমা উন্নত চিকিৎসাসেবা গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৃতীয় পক্ষের ক্ষতির ক্ষেত্রে লায়াবিলিটি বীমা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি কমাতে কার্যকর সহায়তা দেয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে বীমা খাত এখনও তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশে বীমার অবদান জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ, যেখানে ইউরোপের অনেক দেশে এটি ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ধীর দাবি নিষ্পত্তি, সীমিত জনসচেতনতা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা এ খাতের বিকাশে প্রধান বাধা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাধ্যতামূলক বীমা নীতি প্রবর্তন, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং দ্রুত ও স্বচ্ছ দাবি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশেও বীমা খাত অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। এতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার হবে এবং সাধারণ মানুষের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।



