১ টাকার বীমা!
.jpg)
সংবাদ ডেস্ক: ডিজিটাল বীমা খাতে গ্রাহক আকর্ষণের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে মানুষকে সরাসরি বড় অঙ্কের বার্ষিক প্রিমিয়ামের পলিসি কিনতে রাজি করানো ছিল প্রধান লক্ষ্য, এখন সেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে ছোট, সহজ এবং কম খরচের বীমা পণ্য। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলোর একটি হলো ১ টাকার ট্রিপ ইন্স্যুরেন্স। খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, খুব কম দামের এই ধরনের মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্স পণ্য শুধু একটি স্বল্পমূল্যের কভার নয়, বরং নতুন গ্রাহক তৈরি, আস্থা গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতে বড় প্রিমিয়ামের পণ্য বিক্রির একটি কার্যকর প্রবেশদ্বার।
ভারতের ডিজিটাল ইন্স্যুরার আকো এই কৌশলকে বাস্তব ব্যবসায়িক সাফল্যে রূপ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি রাইড-হেইলিং প্ল্যাটফর্ম ওলার সঙ্গে অংশীদারিত্ব করে যাত্রীদের জন্য অতি স্বল্পমূল্যের ট্রিপ ইন্স্যুরেন্স চালু করে। শহরের ভেতরের যাত্রায় এই কভারের প্রিমিয়াম ছিল মাত্র ১ রুপি। অন্যদিকে, ওলা রেন্টালসের জন্য ১০ রুপি এবং ওলা আউটস্টেশনের জন্য ১৫ রুপি প্রিমিয়ামে আলাদা কভার রাখা হয়। অর্থাৎ, যাত্রার ধরন অনুযায়ী বীমা পণ্যকে ছোট ছোট ভাগে সাজিয়ে আরও ব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে। এই মডেল দেখিয়েছে, গ্রাহককে শুরুতেই বড় অঙ্কের পলিসি বিক্রি করার চেয়ে দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছোট কভার দিয়ে তাকে বীমার জগতে আনা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
এই বীমা কভার কেবল প্রতীকী ছিল না; এর বাস্তব উপযোগিতাও ছিল স্পষ্ট। ১ রুপির ইন-ট্রিপ কভারের আওতায় গ্রাহক ৫ লাখ রুপি পর্যন্ত সুরক্ষা পেতে পারতেন। এর মধ্যে ছিল দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা ব্যয়, ব্যাগেজ বা ল্যাপটপ হারানোর ক্ষতিপূরণ, ফ্লাইট মিস করলে আর্থিক সহায়তা, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা এবং জরুরি অবস্থায় হোটেল সুবিধার মতো সেবা। এত কম দামের একটি পণ্যে বাস্তব জীবনের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক কভার যুক্ত থাকায় এটি ব্যবহারকারীদের কাছে দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে গ্রাহক বুঝতে পারেন যে বীমা শুধু দীর্ঘমেয়াদি বা জটিল আর্থিক পণ্য নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ঝুঁকিতেও তা কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে।
এই মডেলের সাফল্যের বড় কারণ ছিল এর সহজতা। সাধারণত বীমা কেনা বা ক্লেইম করার প্রক্রিয়াকে অনেকেই ঝামেলাপূর্ণ মনে করেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে বীমা নেয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি যাত্রার বুকিং অভিজ্ঞতার মধ্যেই যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, রাইড বুক করার সময় খুব সহজে একটি অপশন নির্বাচন করেই বীমা যুক্ত করা যেত। আলাদা কোনো জটিল কাগজপত্র বা দীর্ঘ ফর্ম পূরণের প্রয়োজন ছিল না। শুধু তাই নয়, ক্লেইম প্রক্রিয়াটিও ডিজিটাল করা হয়। তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহক অ্যাপের মধ্যেই প্রায় দুই মিনিটে ক্লেইম দাখিল করতে পারতেন এবং ক্লেইম নিষ্পত্তির সময় ছিল সাধারণত ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা। এই দ্রুততা ও সরলতা ব্যবহারকারীর আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংখ্যার দিক থেকেও এই কৌশল উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, চালুর প্রথম ৯ মাসেই ২৫০ মিলিয়নের বেশি পলিসি বিক্রি হয়েছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই পণ্যের অ্যাটাচ রেট ছিল ৫০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ, প্ল্যাটফর্মে হওয়া মোট যাত্রার অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে গ্রাহক এই বীমা অপশনটি গ্রহণ করেছেন। ডিজিটাল বীমা শিল্পে এটি একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত যে সঠিকভাবে ডিজাইন করা ছোট পণ্য গ্রাহকের আচরণে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রেও এই মডেল শক্ত অবস্থান দেখিয়েছে; সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার টেক আপটাইম ছিল ৯৯.৯৯ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায়, স্বল্পমূল্যের পণ্য হলেও এর পেছনের প্রযুক্তি ও সেবা কাঠামো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
এই মডেলের আরেকটি বড় শক্তি হলো ডিস্ট্রিবিউশন বা বাজারে পৌঁছানোর কৌশল। প্রচলিত বীমা কোম্পানিগুলোকে সাধারণত এজেন্ট, শাখা বা বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে যেতে হয়। এতে খরচ বাড়ে, সময় লাগে এবং গ্রাহকের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আকোর মতো ইন্স্যুরটেক কোম্পানিগুলো সেই গ্রাহকদের কাছেও পৌঁছে গেছে, যারা আগে কখনো সরাসরি বীমা কেনার কথা ভাবেননি। ওলার মতো উচ্চ-ব্যবহারকারী প্ল্যাটফর্মে একটি সাধারণ ট্রিপ অপশনের সঙ্গে বীমা যোগ হওয়ায়, গ্রাহকের কাছে পণ্যটি আলাদাভাবে বিক্রি করতে হয়নি; বরং তার স্বাভাবিক ডিজিটাল অভিজ্ঞতার মধ্যেই বীমা পৌঁছে গেছে। এভাবে গ্রাহক অর্জনের খরচ কমেছে, আবার দ্রুত বড় পরিসরে ব্যবসাও বিস্তার লাভ করেছে।
আকোর এই সাফল্য শুধু ওলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের অংশীদারিত্বের তালিকায় রেডবাস, জোম্যাটো, গোআইবিবো ও ডানজোর মতো প্ল্যাটফর্মের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে: ভবিষ্যতের বীমা শুধু বীমা কোম্পানির নিজস্ব চ্যানেলে বিক্রি হবে না, বরং মানুষ যেখানে প্রতিদিন সক্রিয়- যেমন যাতায়াত, ভ্রমণ, খাবার অর্ডার বা অনলাইন সেবা- সেই প্ল্যাটফর্মগুলোর ভেতরেই বীমা সংযুক্ত হয়ে যাবে। এই মডেলকে এখন অনেকেই এমবেডেড ইন্স্যুরেন্সের সফল উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। এর বড় সুবিধা হলো, গ্রাহককে আলাদাভাবে বীমা কেনার সিদ্ধান্ত নিতে হয় না; তিনি যখন একটি প্রয়োজনীয় সেবা ব্যবহার করছেন, তখনই একটি প্রাসঙ্গিক, কমদামি এবং সহজবোধ্য বীমা পণ্য তার সামনে চলে আসে।
বীমা শিল্পের জন্য এই মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, বাজারে প্রবেশের কার্যকর পথ সবসময় বড় পণ্য নয়। অনেক সময় ছোট, সহজ এবং তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায়- এমন একটি পণ্যই গ্রাহকের আস্থা অর্জনের সবচেয়ে ভালো উপায়। ১ টাকার ট্রিপ ইন্স্যুরেন্স তারই উদাহরণ। একজন গ্রাহক যখন প্রথমবার খুব সামান্য প্রিমিয়ামে বীমা নেন এবং পরে দেখেন যে প্রয়োজনের সময় সেটি কাজ করছে, তখন তার কাছে বীমা একটি বাস্তব ও দরকারি পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এরপর সেই একই গ্রাহক স্বাস্থ্যবীমা, মোটরবীমা, ভ্রমণবীমা বা আরও বড় প্রিমিয়ামের পণ্যের দিকেও আগ্রহী হতে পারেন। অর্থাৎ, ছোট ট্রিপের বীমাই বড় প্রিমিয়ামের ভবিষ্যৎ বাজার গড়ে তোলার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোর জন্যও এই মডেল বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই অঞ্চলে এখনো বীমা অনুপ্রবেশ কম এবং অনেক মানুষ বীমাকে প্রয়োজনের চেয়ে বিলাসিতা বা অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখেন। সেখানে রাইড-শেয়ারিং, মোবাইল ফিন্যান্স, ই-কমার্স, টিকিটিং বা অনলাইন সেবার সঙ্গে যুক্ত ছোট অঙ্কের বীমা পণ্য চালু করা গেলে নতুন গ্রাহকভিত্তি তৈরি করা সহজ হতে পারে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দ্রুত বিস্তার এবং স্মার্টফোননির্ভর সেবার ব্যবহার বাড়ার ফলে এমবেডেড মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্স এই অঞ্চলে বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এতে শুধু বীমা কোম্পানি নয়, গ্রাহকরাও উপকৃত হবেন, কারণ তারা নিজেদের দৈনন্দিন ঝুঁকির জন্য সহজে এবং কম খরচে সুরক্ষা পাবেন।



