কোস্টা কনকর্ডিয়া: ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেরিন হাল ইন্স্যুরেন্স দাবি

মাসরুক খান: ২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি। ইতালির শান্ত সমুদ্রতীর ইসোলা দেল গিগলিওর কাছে রাত নামছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই রাত হয়ে ওঠে আধুনিক সামুদ্রিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও ব্যয়বহুল দুর্ঘটনাগুলোর একটি। বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ কোস্টা কনকর্ডিয়া পরিকল্পিত রুট থেকে সরে উপকূলের খুব কাছে চলে যায় এবং সমুদ্রের তলদেশে থাকা পাথর বা শিলার সঙ্গে আঘাত করে। মুহূর্তেই উৎসবমুখর ভ্রমণ পরিণত হয় আতঙ্ক, অন্ধকার ও মৃত্যুর মিছিলে।

দুর্ঘটনার সময় জাহাজটিতে ৪,২০০ জনের বেশি যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। আঘাতের পর জাহাজের হালে বড় ধরনের ফাটল তৈরি হয়। পানি ঢুকে পড়ে ইঞ্জিন রুমে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিশাল জাহাজটি ধীরে ধীরে কাত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত পাশ ফিরে পড়ে যায়। এই ভয়াবহ ঘটনায় ৩২ জন যাত্রী ও ক্রু প্রাণ হারান।

তদন্তে উঠে আসে, ক্যাপ্টেন ফ্রান্সেসকো শেত্তিনো জাহাজটিকে নির্ধারিত পথ থেকে সরিয়ে উপকূলের কাছে একটি প্রদর্শনধর্মী ‘সেইল-বাই’ চালাতে চেয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে দেখা হয়। সমুদ্রের নিচে থাকা পাথরে আঘাতের পর জাহাজের হাল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কোস্টা কনকর্ডিয়া দ্রুত নিয়ন্ত্রণ হারায়।

ইন্স্যুরেন্সের দৃষ্টিতে ঘটনাটি ছিল এক বিশাল ধাক্কা। কার্নিভাল কর্পোরেশনের ২০১২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, কোস্টা কনকর্ডিয়ার নেট মূল্য ছিল প্রায় ৪৯০ মিলিয়ন ডলার, আর ইন্স্যুরেন্স কাভার ছিল প্রায় ৫১০ মিলিয়ন ডলার। জাহাজের ক্ষতির ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের অবচয়ন ছিল প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের ব্যক্তিগত আঘাতজনিত দায়ের জন্য আরও প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার অবচয়ন ছিল।

কার্নিভাল কর্পোরেশনের ২০১২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজটির মোট ক্ষতির জন্য হাল অ্যান্ড মেশিনারি ইন্স্যুরেন্স থেকে ৫০৮ মিলিয়ন ডলার পাওয়া যায়।

কিন্তু প্রকৃত আর্থিক চাপ শুধু জাহাজের হাল ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। সবচেয়ে বড় বোঝা পড়ে প্রটেকশন অ্যান্ড ইনডেমনিটি বা পি অ্যান্ড আই ইন্স্যুরেন্সের ওপর। যাত্রী ও ক্রুদের মৃত্যু ও আঘাত, ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ, পরিবেশগত ঝুঁকি, আইনি দাবি এবং ধ্বংসাবশেষ অপসারণ- সব মিলিয়ে দাবির অঙ্ক দ্রুত ফুলে ওঠে। লয়েডস জানায়, বড় জাহাজের ধ্বংসাবশেষ সরানোর খরচ দ্রুত বাড়ছে এবং কোস্টা কনকর্ডিয়া সেই ঝুঁকির সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়।

উদ্ধার অভিযান ছিল এক কথায় অভূতপূর্ব। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পাশে কাত হয়ে থাকা বিশাল জাহাজটিকে সোজা করতে ব্যবহার করা হয় জটিল পারবাকলিং পদ্ধতি। এরপর সেটিকে ভাসিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য। এই কাজের প্রতিটি ধাপে ছিল প্রকৌশলগত ঝুঁকি, পরিবেশগত নজরদারি এবং বিপুল ব্যয়। লয়েডসের বিশ্লেষণে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকি, পরিবেশগত শর্ত এবং জাহাজের বিশাল আকার রেক রিমুভাল খরচ বাড়িয়ে দেয়।

২০১৪ সালের মধ্যে কোস্টা কনকর্ডিয়ার পি অ্যান্ড আই ইনস্যুরড লস প্রায় ১.৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। এর সঙ্গে হাল অ্যান্ড মেশিনারি ক্ষতিপূরণ যোগ করলে মোট ইনস্যুর্ড মেরিন লস প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি দাঁড়ায়।

এই ক্ষতি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়েনি। দাবি ছড়িয়ে পড়ে হাল ইন্স্যুরার, পি অ্যান্ড আই ক্লাব, আন্তর্জাতিক রিইনস্যুরার এবং লয়েডসসহ বৈশ্বিক মেরিন ইন্স্যুরেন্স মার্কেটের বিভিন্ন স্তরে। মিউনিখ রি শুরুতেই জানিয়েছিল, তাদের নিজস্ব দাবি বোঝা মধ্যম মাত্রার ডাবল-ডিজিট মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে।

কোস্টা কনকর্ডিয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি জাহাজডুবি নয়; এটি ছিল আধুনিক মেরিন ইন্স্যুরেন্স বাজারের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। এক রাতের ভুল সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দেয়, বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজের ঝুঁকি কত বড় হতে পারে। একই সঙ্গে এই দুর্ঘটনা প্রমাণ করে, বিপর্যয় যত বড়ই হোক, বৈশ্বিক মেরিন ইন্স্যুরেন্স ও রিইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থা বড় ক্ষতি সামাল দেয়ার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।