ভুল চিকিৎসায় রোগীর সুরক্ষা: বাংলাদেশে ম্যালপ্র্যাকটিস বীমা কেন জরুরি

রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ বাড়ছে। কিন্তু রোগীর ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসকের দায়বদ্ধতা এবং হাসপাতালের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এখনো বড় শূন্যতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মেডিকেল ম্যালপ্র্যাকটিস বীমা গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে সামনে আসছে।

বাংলাদেশে ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ বাড়ছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত রোগী বা পরিবারের সুরক্ষায় কার্যকর আইন ও বীমা ব্যবস্থা এখনো শক্তিশালী নয়। ফলে চিকিৎসাজনিত ক্ষতির পর অনেক পরিবার আর্থিক, মানসিক ও সামাজিক সংকটে পড়ে।

অভিযোগ বাড়ছে, আস্থা কমছে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছেন। শহরে এ হার প্রায় ৪৪ শতাংশ। গ্রামে ৩৬ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার মান নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন।

এই তথ্য স্বাস্থ্য খাতে আস্থার সংকটকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। অভিযোগ বাড়ছে, কিন্তু দ্রুত বিচার বা ক্ষতিপূরণ মিলছে না। তাই রোগী ও পরিবারের হতাশাও বাড়ছে।

নেই আলাদা মেডিকেল নেগলিজেন্স আইন

বাংলাদেশে এখনো আলাদা কোনো ‘মেডিকেল নেগলিজেন্স আইন’ নেই। তাই ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন আইনের আশ্রয় নিতে হয়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর অধীনে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান আছে। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০৪-এ ধারায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানার সুযোগ আছে। তবে এমন অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে হাইকোর্টে রিট করে ক্ষতিপূরণ চাওয়া যায়। কিন্তু এই পথ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

১৯৯৫ সাল থেকে দেশে ৫০০টির বেশি গুরুতর চিকিৎসা অবহেলার মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়। এতে ভুক্তভোগী পরিবার হতাশ হয়ে পড়ে। অনেক সময় ক্ষোভ থেকে সহিংস ঘটনাও ঘটে। এতে হাসপাতাল, চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক আরও অস্থির হয়।

ম্যালপ্র্যাকটিস বীমা কীভাবে সুরক্ষা দিতে পারে

এই প্রেক্ষাপটে চিকিৎসকদের জন্য পেশাগত দায়বদ্ধতা বীমা বা মেডিকেল ম্যালপ্র্যাকটিস ইনস্যুরেন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে উঠে আসছে।

এই বীমা চিকিৎসকের পেশাগত কাজের ক্ষেত্রে ভুল, বিচ্যুতি বা অবহেলার কারণে রোগীর শারীরিক ক্ষতি বা মৃত্যু হলে তৈরি হওয়া আইনি দায় ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ বহনে সহায়তা করে। মামলার আত্মপক্ষ সমর্থনে আইনজীবীর ফি ও আদালতের খরচও অনেক সময় এই বীমার আওতায় থাকে।

বাংলাদেশে এখনো বাধ্যতামূলক নয়

বাংলাদেশে বর্তমানে কিছু নন-লাইফ বীমা কোম্পানি চিকিৎসকদের জন্য এ ধরনের পলিসি অফার করে। এর মধ্যে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স ও রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানের পেশাগত দায়বদ্ধতা-সংক্রান্ত বীমা পণ্য বা সেবা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য থেকে জানা যায়।

তবে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশে চিকিৎসকদের জন্য এই বীমা এখনো আইনিভাবে বাধ্যতামূলক নয়।

এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। দেশে নির্দিষ্ট কোনো মেডিকেল ম্যালপ্র্যাকটিস আইন নেই। ফলে ক্ষতিপূরণ দাবির প্রক্রিয়া এখনো পরিষ্কার নয়। অনেক চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই বীমার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও পুরোপুরি সচেতন নন। আবার অনেক চিকিৎসক মনে করেন, এ ধরনের বীমা চালু হলে রোগীরা আরও বেশি মামলা করতে উৎসাহিত হতে পারেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক কাঠামো থাকলে এই বীমা রোগী, চিকিৎসক ও হাসপাতাল—তিন পক্ষেরই সুরক্ষা দিতে পারে। ভুল চিকিৎসায় ক্ষতি হলে রোগীর পরিবার ক্ষতিপূরণের একটি নির্ধারিত পথ পাবে। অন্যদিকে চিকিৎসক ও হাসপাতালও অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে।

স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাও বড় কারণ

স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাও এই সংকটকে আরও বাড়াচ্ছে। দেশে মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৬৯ থেকে ৭৩ শতাংশ রোগীরা নিজের পকেট থেকে দেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ সরাসরি রোগীর পকেট থেকে গেলে তা পরিবারকে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের ঝুঁকিতে ফেলে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১৯ বিলিয়ন টাকা। এটি মোট বাজেটের মাত্র ৫.৩ শতাংশ। জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য ব্যয় মাত্র ০.৬৭ থেকে ০.৭৪ শতাংশ। ডব্লিউএইচও-এর সুপারিশ অনুযায়ী এটি ৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে মাথাপিছু সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় মাত্র ১১০ মার্কিন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৪০১ ডলার।

জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতিও বড় বাধা। দেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক আছেন মাত্র ৫.২৬ থেকে ৭ জন। ডব্লিউএইচও-এর মতে, এই সংখ্যা কমপক্ষে ২৩ হওয়া জরুরি। নার্স ও চিকিৎসকের অনুপাত মাত্র ০.৪:১। আদর্শ অনুপাত ৩:১। প্রতি ১,০০০ মানুষের জন্য দেশে বেড আছে মাত্র ০.৯টি। বৈশ্বিক গড় ৩.৩টি। স্বাস্থ্য খাতের অনুমোদিত পদের ৩৪ শতাংশের বেশি এখনো শূন্য।

শিশুস্বাস্থ্যেও চ্যালেঞ্জ আছে। দেশে শিশুদের মধ্যে খর্বকায়ত্বের হার ২৫ শতাংশ। ওজন স্বল্পতার হার ১৩ শতাংশ। মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ থেকে ৯৫ শতাংশ এখন অসংক্রামক রোগের কারণে হচ্ছে। এর মধ্যে আছে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যান্সার। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৫৪।

করণীয় কী

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগী ও চিকিৎসক- দুই পক্ষের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

প্রথমত, একটি আলাদা ও আধুনিক মেডিকেল নেগলিজেন্স আইন প্রয়োজন। এতে চিকিৎসা অবহেলার সংজ্ঞা, অভিযোগ নিষ্পত্তির পথ এবং ক্ষতিপূরণের কাঠামো স্পষ্ট হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চিকিৎসকদের জন্য ম্যালপ্র্যাকটিস বীমা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি নীতিগতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার দ্রুত আর্থিক সহায়তা পেতে পারে। চিকিৎসক ও হাসপাতালও ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে। এতে হাসপাতালভিত্তিক সহিংসতাও কমতে পারে।

তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জনবল নিয়োগ করতে হবে। হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। রোগীর অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।

ইতোমধ্যে ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৪’-এর খসড়া প্রস্তুত হয়েছে। এতে চিকিৎসা অবহেলা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা আছে। এটি কার্যকর হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে রোগীর সুরক্ষা এখন বড় প্রশ্ন। শক্তিশালী আইন, বাধ্যতামূলক ম্যালপ্র্যাকটিস বীমা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া এই সংকট কাটানো কঠিন।

চিকিৎসা মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই এই খাতে জবাবদিহিতা, আর্থিক সুরক্ষা এবং রোগীর অধিকার নিশ্চিত করা এখন আর বিকল্প নয়- সময়োপযোগী বাধ্যবাধকতা।