ডিপফেক প্রযুক্তিতে বাড়ছে বীমা জালিয়াতি, নতুন ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক বীমা খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে বীমা শিল্পে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির বিস্তার এখন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আগে ডিপফেক মূলত ভুয়া ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট বা রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহৃত হলেও এখন এটি সরাসরি আর্থিক খাত ও বীমা জালিয়াতির হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের ভাষ্য, জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় প্রতারকরা এখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাস্তবসম্মত ছবি, ভিডিও, ভয়েস, পরিচয়পত্র ও নথি তৈরি করতে পারছে। ফলে মোটর, স্বাস্থ্য, সম্পত্তি ও লাইফ বীমাসহ প্রায় সব ধরনের দাবিতেই জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়ছে। বীমা খাতে দীর্ঘদিনের কাগজভিত্তিক প্রতারণা এখন প্রযুক্তিনির্ভর সাইবার জালিয়াতিতে রূপ নিচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে জাল দাবি বেড়েছে ৭১ শতাংশ
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বীমা প্রতিষ্ঠান অ্যাডমিরালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তারা প্রায় ৮৬.৮ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের প্রতারণামূলক দাবি শনাক্ত করেছে। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ৫০.৯ মিলিয়ন পাউন্ড। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জাল দাবির পরিমাণ বেড়েছে ৭১ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এআই ব্যবহার করে গাড়ির ক্ষতির ছবি পরিবর্তন, নকল নম্বরপ্লেট তৈরি, দামী ঘড়ি বা ইলেকট্রনিক পণ্যের ভুয়া ক্ষয়ক্ষতির ছবি বানানো এবং ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত ছবি ব্যবহার করে মিথ্যা দাবি জমা দেওয়ার ঘটনা দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে একই গাড়ির ছবি ভিন্ন নম্বরপ্লেট ব্যবহার করে একাধিকবার ক্লেইম করার ঘটনাও ধরা পড়েছে।
জার্মান বীমা প্রতিষ্ঠান অ্যালিয়াঞ্জ বলছে, ২০২১-২২ থেকে ২০২২-২৩ সময়ের মধ্যে ছবি, ভিডিও ও নথি বিকৃত করে জালিয়াতির ঘটনা ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ‘শ্যালোফেক’ ও ডিপফেক প্রযুক্তি এখন মোটর বীমা প্রতারণার সবচেয়ে দ্রুত বিস্তারমান ঝুঁকিগুলোর একটি।
৩৬ শতাংশ গ্রাহক ছবি পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স ক্রাইম ব্যুরো (এনআইসিবি) এবং ভেরিস্ক-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৬ শতাংশ ভোক্তা দাবি জোরদার করতে ছবি বা নথি ডিজিটালি পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করতে পারে, যদিও তা বীমা কোম্পানির নীতিমালার পরিপন্থী।
একই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ৯৮ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান মনে করে এআই-বেইজড এডিটিং টুলস ডিজিটাল বীমা জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
স্প্রাউট.এআই-এর এক জরিপে ২০০ জন যুক্তরাজ্যভিত্তিক ক্লেইমস হ্যান্ডলারের মতামতের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে অন্তত ৮৩ শতাংশ ক্লেইমস কর্মকর্তা মনে করেন, ৫ শতাংশ বা তার বেশি বীমা দাবিতে এখন এআই-ভিত্তিক জালিয়াতির উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ কর্মকর্তা মনে করেন, ১১ থেকে ২৫ শতাংশ দাবিতেই জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভয়েস ক্লোনিং ও ভিডিও কল প্রতারণা নতুন হুমকি
বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিপফেক ঝুঁকি এখন শুধু ছবি বা নথির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভয়েস ক্লোনিং ও ডিপফেক ভিডিও কল ব্যবহার করেও প্রতারণা বাড়ছে। প্রতারকরা বীমা গ্রাহক, কর্মকর্তা বা সুবিধাভোগীর পরিচয়ে ফোন বা ভিডিও কলে যোগাযোগ করে অর্থ স্থানান্তর, পলিসির তথ্য পরিবর্তন কিংবা গোপন তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
এ ধরনের প্রতারণার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ঘটে হংকংয়ে। সেখানে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান আরাপ প্রায় ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২০০ মিলিয়ন হংকং ডলার হারায়। ভিডিও কনফারেন্সে কৃত্রিম কণ্ঠস্বর ও ভুয়া ভিডিও ব্যবহার করে প্রতারকরা কর্মকর্তাদের পরিচয় দেয়। পরে একাধিক ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেয়।
যদিও ঘটনাটি সরাসরি বীমা খাতে ঘটেনি, তবে এটি দেখিয়েছে যে ডিপফেক প্রযুক্তি কীভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত যাচাই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বাংলাদেশেও বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশে এখনো ডিপফেক ব্যবহার করে বীমা জালিয়াতির নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবা ও অনলাইন ক্লেইম ব্যবস্থার বিস্তারের কারণে ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে এআই-জেনারেটেড ভিডিও ও ডিপফেক বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় ১১টি ল্যাপটপ, ৪৭টি স্মার্টফোন এবং ২১টি সিমকার্ড জব্দ করা হয়। ঘটনাটি দেখিয়েছে, দেশে ডিপফেকভিত্তিক প্রতারণা পরিচালনার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ইতোমধ্যে তৈরি হচ্ছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশে মোটর বীমা, স্বাস্থ্য বীমা এবং লাইফ বীমা খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এসব খাতে ধীরে ধীরে ডিজিটাল নথি, অনলাইন ছবি ও মোবাইলভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। ফলে ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট, পরিবর্তিত দুর্ঘটনার ছবি, নকল পরিচয়পত্র বা কৃত্রিম ভয়েস ব্যবহার করে প্রতারণার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আগে থেকেই সংকটে বাংলাদেশের বীমা খাত
বাংলাদেশের বীমা খাত এমনিতেই আস্থাহীনতা ও দাবি নিষ্পত্তি সংকটে রয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লাইফ বীমা দাবির নিষ্পত্তির হার কমে ৬৬.০৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২০ সালে এই হার ছিল প্রায় ৮৫ শতাংশ।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে মোট বকেয়া লাইফ বীমা দাবির পরিমাণ প্রায় ৩,৮৮০ কোটি টাকা। মোট দাবি ছিল প্রায় ৫,৯৮৬ কোটি টাকা। এর বড় অংশ কয়েকটি দুর্বল কোম্পানির কাছে আটকে রয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫-৬টি দুর্বল বীমা কোম্পানির দাবি পরিশোধ সক্ষমতা নেই। এর ফলে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ পলিসিধারী সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ইন্স্যুরেন্স পেনিট্রেশন বর্তমানে প্রায় ০.৩০ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে ২০১০ সালে এটি প্রায় ০.৯০ শতাংশ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির মধ্যে ডিপফেকভিত্তিক জালিয়াতি বাড়লে প্রকৃত গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তি আরও জটিল হয়ে পড়বে। কারণ জাল দাবি শনাক্ত করতে গিয়ে কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই করতে হবে, যা ক্লেইম নিষ্পত্তির সময় ও ব্যয়- দুইই বাড়াবে।
গ্রাহকদের প্রিমিয়ামও বাড়তে পারে
বিশ্বজুড়ে বীমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিপফেক জালিয়াতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর। কারণ প্রতারণাজনিত ক্ষতি বাড়লে বীমা কোম্পানিগুলো শেষ পর্যন্ত প্রিমিয়াম বাড়াতে বাধ্য হতে পারে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রিটিশ ইনস্যুরার্স (এবিআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে শনাক্ত হওয়া বীমা জালিয়াতির কারণে বছরে ১ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ক্ষতি হয়। এছাড়া শনাক্ত না হওয়া প্রতারণার পরিমাণ আরও প্রায় ২ বিলিয়ন পাউন্ড বলে ধারণা করা হয়।
প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ বাড়ছে
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের বড় বড় বীমা কোম্পানি এখন এআইভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, বায়োমেট্রিক যাচাই, মেটাডাটা পরীক্ষা, রিয়েল-টাইম রিস্ক স্কোরিং এবং ভিডিও অথেনটিকেশন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ছে।
এসব প্রযুক্তি ছবি বা ভিডিওর আলো, ছায়া, মুখের নড়াচড়া, সম্পাদনার চিহ্ন এবং ফাইলের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে ডিপফেক শনাক্ত করার চেষ্টা করে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের দাবি নিষ্পত্তিতে মানবীয় যাচাই বা ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশনও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন আইন ও নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ
ডিপফেক ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নতুন আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইইউ এআই অ্যাক্ট’-এ এআই-জেনারেটেড বা ম্যানিপুলেটেড কনটেন্ট-এর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রস্তাবিত ‘প্রিভেন্টিং ডিপ ফেইক স্ক্যামস অ্যাক্ট’ আর্থিক খাতে এআইভিত্তিক প্রতারণা বিশ্লেষণের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করেছে।
বাংলাদেশের জন্য যা করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। বীমা কোম্পানিগুলোকে ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তি, বায়োমেট্রিক যাচাই, ভয়েস অথেনটিকেশন এবং এআইভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার শুরু করতে হবে।
একই সঙ্গে আইডিআরএ’র অধীনে কেন্দ্রীয় ফ্রড মনিটরিং ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তোলারও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া অনলাইন ক্লেইমের ক্ষেত্রে মেটাডাটা যাচাই, ভিডিও ও ছবির ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং উচ্চমূল্যের দাবিতে বাধ্যতামূলক মানবীয় যাচাই চালুর সুপারিশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, ডিপফেক এখন আর ভবিষ্যতের ঝুঁকি নয়; এটি ইতোমধ্যে বৈশ্বিক আর্থিক ও বীমা খাতের বাস্তব হুমকিতে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত প্রস্তুতি নিতে না পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বীমা শিল্পও বড় ধরনের আর্থিক ও আস্থাগত সংকটে পড়তে পারে।



