আইআরএফ সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের মতামত

আস্থা বাড়াতে সুশাসন ও ডিজিটাল রূপান্তরের তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বীমা খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাজেট-পরবর্তী এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীর বিজয়নগরের হোটেল একাত্তরে এই সেমিনারের আয়োজন করে ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ)।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইআরএফ সভাপতি গোলাম মওলা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ (এমপি)এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশে বীমা খাতে এখনো পর্যাপ্ত ডিজিটালাইজেশন হয়নি। ফলে গ্রাহক সন্তুষ্টি ও সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির ঘাটতির কারণে এ খাতে আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য বীমা খাতকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার না থাকায় অনেক বীমা কোম্পানি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না। খাতভিত্তিক নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর তিনি জোর দেন।

বিআইএ সভাপতি সাঈদ আহমেদ (এমপি) বলেন, বীমা কমিশনকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও অনিয়ম থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখতে হবে। তিনি মোটরগাড়ি বীমাকে বাধ্যতামূলকভাবে বিস্তৃত করার ওপর জোর দেন এবং নতুন খাতে বীমা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বীমা খাত সংস্কারের জন্য তিনটি মূল ভিত্তি প্রয়োজন।

প্রথমত, গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কাঠামো শক্তিশালী করা। তৃতীয়ত, সক্ষমতা উন্নয়ন।

তিনি জানান, বর্তমানে বীমা খাতে গ্রাহকদের অনিষ্পন্ন দাবি প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। কিছু সমস্যা খাতগত, আবার কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানির কারণে হয়েছে। এসব সমাধানে কাজ চলছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক কোম্পানির সম্পদ বিক্রিতে জটিলতা রয়েছে, যা দ্রুত সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ায় বীমা খাতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। মাইক্রোইন্স্যুরেন্স চালু ও সেবার চ্যানেল উন্নয়নের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্সের ভাইস চেয়ারম্যান নাসির উদ্দীন আহমেদ (পাভেল) বলেন, নন-লাইফ বীমা খাতের প্রধান সমস্যা হলো রিইন্স্যুরেন্স কমিশন ও ভ্যাট সংক্রান্ত জটিলতা, যা আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ২০১৩ সালে একসঙ্গে ১৩টি বীমা কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং ধাপে ধাপে লাইসেন্স দেয়া উচিত ছিল এবং সে সময় নিয়ন্ত্রক তদারকি ও কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

বিআইএফ সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী বলেন, দেশে এমন কিছু বীমা কোম্পানি রয়েছে, যারা মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ক্লেইম নিষ্পত্তি করে থাকে। তবে এসব ইতিবাচক দিক তেমনভাবে আলোচনায় আসে না। তিনি বলেন, যেসব ক্ষেত্রে ক্লেইম প্রদান করা হয় না বা বিলম্ব হয়, সেগুলোই বেশি আলোচিত ও সমালোচিত হয়। ফলে বীমা খাতের ভালো কাজগুলোও জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।

জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এমডি এস এম নুরুজ্জামান বলেন, লাইফ বীমা খাতে সমস্যার মাত্রা নন-লাইফ বীমার তুলনায় বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রিতে জটিলতা রয়েছে। ব্যাংক ঋণ সহায়তা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সহজ করলে সংকট কমবে বলে তিনি মত দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বীমা খাত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি এখনো অবহেলিত। বীমা প্রবেশযোগ্যতা খুবই কম, যা দ্রুত বাড়ানো দরকার।

তিনি বলেন, দুর্বল নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, স্বল্পমেয়াদি লাভের চিন্তা এবং টেকসই পরিকল্পনার অভাব এ খাতের প্রধান সমস্যা। জলবায়ু ঝুঁকি ও কৃষি খাতে বীমার ভূমিকা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি আরও যোগ করেন, আর্থিক খাতে নৈতিক ঝুঁকি ও সুশাসনের ঘাটতি দূর করতে না পারলে বীমা খাতও শক্তিশালী হবে না।

সেমিনারের বক্তারা একমত হন যে, বীমা খাতকে এগিয়ে নিতে হলে আস্থা বৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিতকরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও খাত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।