দুর্যোগে কৃষকের সুরক্ষা জাল কি কৃষি বীমা?
.jpg)
রাজ কিরণ দাস: প্রতিবছর বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে হাজারো কৃষকের ফসল নষ্ট হয়। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করেন। দুর্যোগের পর মাঠে ফসল থাকে না, কিন্তু ব্যাংক বা এনজিওর কিস্তি থেমে থাকে না। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে- কৃষকের জন্য কি কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে? কৃষি বীমা কি সেই 'সুরক্ষা জাল' হয়ে উঠতে পারে?
বাংলাদেশে কৃষি বীমা একেবারে অনুপস্থিত নয়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্য বীমা নিয়ে বিভিন্ন পাইলট প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। সাধারণ বীমা কর্পোরেশন ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অংশীদারিত্বে এসব উদ্যোগ শুরু হয়। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কৃষি ও গবাদিপশু বীমা পণ্যও চালু করেছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এসব বীমা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং দাবি পরিশোধের ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ কৃষি বীমা কেবল তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বাস্তবেও এর প্রয়োগ হয়েছে।
তবে সমস্যাটি কভারেজে। প্রকল্প যেখানে আছে, সুবিধা সেখানেই সীমাবদ্ধ। দেশের বিপুলসংখ্যক প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক এখনো বীমা সুরক্ষার বাইরে। ফলে এটি জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর সুরক্ষা জালে রূপ নিতে পারেনি।
কৃষি অর্থনীতিতে ঝুঁকি স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই ঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে। একটি মৌসুমের ক্ষতি মানে অনেক কৃষকের জন্য বহু বছরের সঞ্চয় হারানো। এ অবস্থায় কৃষি বীমা ঝুঁকি ভাগাভাগির একটি প্রাতিষ্ঠানিক উপায় হতে পারে। দুর্যোগের পর দ্রুত ক্ষতিপূরণ পেলে কৃষক নতুন করে চাষ শুরু করার সক্ষমতা ফিরে পান।
আবহাওয়া সূচকভিত্তিক বীমার একটি বড় সুবিধা হলো দ্রুত পেআউটের সম্ভাবনা। নির্দিষ্ট বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বা আবহাওয়া সূচক নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়। এতে দীর্ঘ মাঠ যাচাইয়ের প্রয়োজন কমে এবং প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস পায়। তবে এখানে ‘বেসিস রিস্ক’ রয়েছে- কোনো কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি সূচকের সঙ্গে পুরোপুরি না মিললে তিনি ক্ষতিপূরণ নাও পেতে পারেন। এতে আস্থার সংকট তৈরি হয়।
প্রিমিয়াম কাঠামোও বড় চ্যালেঞ্জ। প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে নিয়মিত প্রিমিয়াম দেওয়া সহজ নয়। বিশ্বের বহু দেশে কৃষি বীমা সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে এখনো সমন্বিত ও সুস্পষ্ট ভর্তুকি কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ টেকসই জাতীয় কর্মসূচিতে রূপ নিচ্ছে না।
নীতিগতভাবে কৃষি বীমাকে কার্যকর করতে কয়েকটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, প্রিমিয়ামে আংশিক সরকারি ভর্তুকি ও ঝুঁকি ভাগাভাগির স্পষ্ট কাঠামো। দ্বিতীয়ত, নির্ভরযোগ্য ও ডিজিটাল আবহাওয়া ডেটা অবকাঠামো, যাতে সূচক নির্ধারণ স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হয়। তৃতীয়ত, ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ও কৃষি সম্প্রসারণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সহজ বিতরণ ব্যবস্থা। পাশাপাশি দ্রুত ও স্বচ্ছ দাবি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের আস্থা বাড়বে।
বাংলাদেশে কৃষি বীমার সম্ভাবনা বাস্তব। পাইলট প্রকল্পগুলো প্রমাণ করেছে- সঠিক নকশা ও অংশীদারিত্ব থাকলে এটি কাজ করতে পারে। কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশের জন্য এটি আর সীমিত পরীক্ষামূলক উদ্যোগে আটকে থাকলে চলবে না। টেকসই অর্থায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত সমর্থন নিশ্চিত করা গেলে কৃষি বীমা সত্যিই দুর্যোগে কৃষকের সুরক্ষা জাল হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় এটি কেবল প্রকল্প হিসেবেই থেকে যাবে, কৃষকের জীবনে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা আনতে পারবে না।



